মিরসরাই ট্র্যাজেডি-মায়ের চোখে আজও কান্না... by শারফুদ্দীন কাশ্মীর

খুব সুন্দর করে সাজানো ঘরটি। থরে থরে বই রাখা ছোট পড়ার টেবিলে। পাশে বেশ কিছু খেলনা, খেলার সামগ্রী। টেবিলের নিচে দুই জোড়া জুতো। দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে, কোন কিশোরের পড়ার টেবিল এটা। দেখে মনে হয়, একটু পরে কেউ এসে টেবিলে বসে পড়বে।


গত এক বছর এ রকম সুন্দর করেই সাজানো আছে তাকিব উল্লাহ মাহমুদের পড়ার টেবিলটি। পরিবারের কাছে সাকিব নামে পরিচিত। সাকিব আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ত। ২০১১ সালের ১১ জুলাইয়ে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে ৪৪ জনের সঙ্গে সে-ও মারা যায়। কিন্তু সাকিবের মা পারভিন আক্তার ভাবেন, এখনো ছেলে বেঁচে আছে। যেকোনো সময় এসে টেবিলে বসবে। ‘সাজানো-গোছানো টেবিল না পেলে ও খুব রাগ করে। তার টেবিলের ড্রয়ারে রাখা পৃথিবীর ২০ জন মনীষীর ছবি। ঘরের দেয়ালে ঝুলানো ছবিটাও ওর আঁকা। ছোট ছোট যন্ত্রাংশ দিয়ে ফ্যান বানানোর চেষ্টা করেছিল সাকিব।’
এখনো পারভিন আক্তার ওর একটি টি-শার্ট পাশে নিয়ে রাতে ঘুমাতে যান। ‘টি-শার্ট থাকলে মনে হয় ছেলেটা আমার পাশে ঘুমাচ্ছে। ওর শরীরের গন্ধ পাই।’ তিনি জানান, ২০১১ সালে তাকে চট্টগ্রাম থেকে এনে মিরসরাইয়ের আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় অষ্টম শ্রেণীতে। এর আগে সে থাকত নানা-নানির সঙ্গে, চট্টগ্রামের হালিশহরে। শুধু চোখে চোখে রাখার জন্য সাকিবকে আবুতোরাবে নিয়ে আসা হয়। তা ছাড়া সাকিবের বাবা সদরুল আমিন মাহমুদ আবুতোরাব বাজারে ব্যবসা করেন। তাই আবুতোরাব ছেড়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। দুর্ঘটনার দিন সাকিব অন্য বন্ধুদের সঙ্গে বিদ্যালয় ফাঁকি দিয়ে খেলা দেখতে গিয়েছিল। আর বাড়ি ফিরে আসেনি। চলে গেছে না-ফেরার দেশে। সাকিবের মা বিড়বিড় করে বলতে থাকেন, ‘ছেলেকে কাছে এনে মেরে ফেললাম না তো?’
প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সাকিব খুব সুন্দর ছবি আঁকত। মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলেকে ছবি আঁকা শেখাবেন। ইচ্ছা ছিল ক্রিকেটের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়ারও। স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল।
সাকিব ফল খেতে পছন্দ করত। দুর্ঘটনার দিনও তিনটি আম রাখা হয়েছিল সাকিবের জন্য। সে আম আর খাওয়া হয়নি ওর। বাড়ির কবুতরগুলোও সাকিবের মৃত্যুর পর কোথায় যেন চলে গেছে। এখন পড়ে আছে কবুতরের শূন্য খাঁচা। সাকিবদের ঘরে ঢোকার সময় বাঁ পাশে একটু ওপরে কবুতরের খালি খাঁচা পড়ে আছে।
এ সময় সাকিবের ছোট্ট বোন তাসনিম জাহান আসে বিদ্যালয় থেকে। সে আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। এবার কথা ঘুরে যায়। মা জানান, তাসনিম প্রায়ই সাকিবকে খোঁজে। আবার মা যখন কাঁদেন, তখন মাকে সান্ত্বনা দেয় ভাইয়া ফিরে আসবে বলে।
সাকিবের বাবা সদরুল আমিন জানান, সবাই হয়তো একসময় ভুলে যাবে সাকিবদের কথা। কিন্তু মায়েরা ভুলবেন না। মায়েদের কান্না কখনই থামবে না।
একই দুর্ঘটনা ঘটেছে ধ্রুব নাথের পরিবারেও। আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিল সে। সে-ও হূদয়বিদারক সেই দুর্ঘটনায় মারা যায়। কথা হয় ধ্রুবর মা সুপ্রীতি নাথের সঙ্গে। তিনি স্বাভাবিকভাবে কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলের পড়ালেখার মান অনেক ভালো ছিল। আবুতোরাবে একটি কোচিং সেন্টার আছে। সেখানে তাকে পড়তে বলেছিলাম। ধ্রুব কিছুতেই রাজি হয়নি। পরে দেখা গেল, ধ্রুবর কথাই ঠিক। সে পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল। নিজের পড়া, খেলা—সবই সে করত নিয়ম মেনে।’ তিনি জানান, সেদিন (১১ জুলাই, ২০১১) অনেকটা রাগ করে সে ঘর থেকে বের হয়েছিল। রাগ করেছিল মায়ের সঙ্গে। সুপ্রীতি বলেন, ‘কপাল খারাপ, তাই ছেলের রাগ ভাঙানোর সময়ও পেলাম না। শুধু ছেলের পড়ালেখার কথা চিন্তা করে বিয়ের পর আর শ্বশুরবাড়ি যাওয়া হয়নি।’ আবুতোরাব বিদ্যালয় বাড়ির কাছে হওয়ায় ধ্রুবকে নিয়ে আবুতোরাব মাস্টারপাড়ায় বাবার বাড়িতেই থাকতেন। ধ্রুবর বাবা ধীরেন্দ্র নাথ মিলশ্রমিক। তিনি মাঝেমধ্যে এসে ছেলেকে দেখে যেতেন। ওর ছোট ভাই দুর্জয় নাথ চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। সে দাদাভাই বলে ডাকত ধ্রুবকে। এখন দাদাভাইয়ের কথা মনে করে প্রায়ই কাঁদে। কারণ, তাকে পড়ালেখা দেখিয়ে দিত তার দাদাভাই।
সুপ্রীতি অনেকগুলো সনদপত্র দেখিয়ে বলেন, এগুলো সব ধ্রুবর মেধার স্বীকৃতি। সে পঞ্চম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল। আশা ছিল অষ্টম শ্রেণীতেও পাবে। তিনি বলেন, ‘এমন সোনার টুকরা ছেলের কথা ভুলে থাকা যায়?’ শুধু মা নয়, ধ্রুবর বন্ধু রূপশ বড়ুয়া, এমরান হোসেনেরা এখনো কাঁদে ধ্রুবর কথা মনে করে। তারা জানায়, ক্লাসে পড়া না পারলে সে তাদের সহায়তা করত। অঙ্ক করে দিত। সে কারও কাছে প্রাইভেট পড়ত না।
ছেলের কথা মনে পড়লেই কাঁদেন মায়েরা। এই কান্না থামবে না, থামে না...।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ জুলাই বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধু ফুটবল টুর্নামেন্ট দেখে মিরসরাই স্টেডিয়াম থেকে প্রায় ৮০ জন শিশু-কিশোর একটি মিনি ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিল। বড়তাকিয়া আবুতোরাবের সৈদালী নামক স্থানে পৌঁছালে চালকের গাফিলতিতে মিনি ট্রাকটি উল্টে খাদে পড়ে যায়। ওই দুর্ঘটনায় ৪৩ শিক্ষার্থীসহ মোট ৪৪ জন নিহত হয়। ধ্রুব ও সাকিব সেই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল।

No comments

Powered by Blogger.