মিলনমেলার অপেক্ষায় লন্ডন অলিম্পিক by মোঃ আশরাফুল আলম

সময় এবং স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। চিরন্তন সত্য এটি। তেমনি রূঢ় সত্য ঘড়ির কাঁটাও টিকটিক করে বয়ে চলে, থেমে থাকে না। চিরকালীন এই বাস্তবিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরার একটিই কারণ অলিম্পিক গেমস। বিশ্ব এখন সর্ববৃহৎ এই ক্রীড়া আসরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।


কেননা বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া উৎসব ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’ এখন ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ডÑ ওয়ান ড্রিম’ সেøাগানকে সামনে রেখে ক্রীড়াপ্রেমীদের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত। বিশ্ববাসীর জন্য সবচাইতে মর্যাদাকর ও তৃপ্তিদায়ক এই ক্রীড়ামেলার এবারের আয়োজক ইংল্যান্ডের লন্ডন। অনেক চড়াইউতড়াই, বাধাবিঘœ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে আয়োজক হওয়ার মর্যাদা পায় বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশটি। আয়োজক হওয়ার লড়াইটাও মূল লড়াই থেকে কম মর্যাদাপূর্ণ ছিল না। রাশিয়ার মস্কো, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি, স্পেনের মাদ্রিদ ও ফ্রান্সের প্যারিসকে টপকে স্বাগতিকের মর্যাদা পায় লন্ডন। ২০০৫ সালের ৬ জুলাই আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) ১১৭তম সভায় আয়োজক হিসেবে লন্ডনের নাম ঘোষণা করা হয়। এবার নিয়ে রেকর্ড তৃতীয়বারের মতো আধুনিক অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে লন্ডনে। এর আগে লন্ডন আয়োজক হয়েছিল ১৯০৮ ও ১৯৪৮ সালে। এবারের ৩০তম আসর উপলক্ষে এখন সাজ সাজ রব ইংল্যান্ডজুড়ে। ২৭ জুলাই জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে এবারের আসরের। ১২ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় আসরে ২৬টি ইভেন্টের ৩০২ ডিসিপ্লিনে সাড়ে দশ হাজার এ্যাথলেট পদক জয়ের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন। গেমস উপভোগ করতে শহরটিতে জড়ো হবেন ২১ হাজার সংবাদকর্মী এবং ৮৮ লাখ দর্শক। আনুমানিক ২০৪টি দেশ এবারের অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করবে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইংল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ সেরা হওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে। লাল-সবুজের দেশ বাংলাদেশও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে আসন্ন অলিম্পিকে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞ নিয়ে ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে উৎসবের আমেজ। গত এপ্রিলে ১০০ দিন আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাউন্টডাউন শুরু হওয়ার পর মে মাস থেকে শুরু হয়েছে লন্ডন অলিম্পিকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। অলিম্পিকের তীর্থভূমি গ্রীসের অলিম্পিয়া পর্বত থেকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় লন্ডন অলিম্পিকের। অলিম্পিকের আঁতুড়ঘরে আনুষ্ঠানিকভাবে লন্ডন অলিম্পিকের মশাল প্রজ্বলন করা হয়। হাজার হাজার বছর আগের রীতি মেনে গ্রীসের অভিনেত্রী ইনো মেনেগকি পুরোহিতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মশাল প্রজ্ব¡লন করেন। এরপর আরও আনুষ্ঠানিকতা সেরে মশাল হস্তান্তর করা হয় এর প্রথম বাহক গ্রীসের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সাঁতারু জিয়ানিওতিসকে। তাঁর হাত ঘুরে মশাল যায় ব্রিটিশ মুষ্টিযোদ্ধা আলেকজান্ডার লোওকোসের হাতে। অলিম্পিকের এ মশাল জ্বলে আট দিন। এ সময়ে গ্রীসের পাঁচটি প্রাচীন প্রতœতাত্ত্বিক স্থান ঘুরে ১৭ মে মশাল পৌঁছায় এথেন্সের অলিম্পিয়া স্টেডিয়ামে। সেখানে সংক্ষিপ্ত রিলে শেষে ১৮ মে মশাল ইংল্যান্ডে পৌঁছায়। এবারের অলিম্পিক আসর শেষ না হওয়া পর্যন্ত অলিম্পিয়ায় জ্বলতে থাকবে মূল মশালটি। এ অলিম্পিয়াতেই ৭৭৬ খ্রিস্টপূর্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম অলিম্পিক।
অলিম্পিক কমিটির এক বিবৃতিতে জানানো হয়, অলিম্পিকের প্রচলিত রীতি অনুযায়ীই মশাল জ্বালানো হয়। মশাল প্রজ্বলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) প্রধান জ্যাক রোগে ও লন্ডন অলিম্পিক আয়োজক কমিটির প্রধান সেবাস্তিয়ান কো। গত এপ্রিলে লন্ডন অলিম্পিকের ক্ষণগণনা শুরু করেন আয়োজকরা। নানা আয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞের কাউন্টডাউন শুরু হয়। গত ১৮ এপ্রিল থেকে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সর্ববৃহৎ আসরের পর্দা উঠতে বাকি আর মাত্র ১০০ দিন। এ সময় ক্রমশই কমে আসছে। লন্ডন অলিম্পিক শুরু হতে আর মাত্র সপ্তাহ দুয়েকের অপেক্ষা। বিশ্বব্যাপী নানান আয়োজন শেষে আগামী ২৭ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্বলিত হবে অলিম্পিক মশাল, যার যাত্রা শুরু হয় গ্রীস থেকে। লন্ডন অলিম্পিক উপলক্ষে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সবাইকে স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। সর্ববৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞ সার্থক ও সফলভাবে আয়োজনের জন্য আয়োজকরা লন্ডন শহরকে সাজাচ্ছেন অপরূপ সাজে। বাদবাকি প্রস্তুতিও সম্পন্নের জন্য তোড়জোড় চলছে। আধুনিক অলিম্পিক সৃষ্টিতে ইংল্যান্ডের ভূমিকাকে স্মরণীয় করে রাখতে মশাল প্রজ্বলনের দিনটিতে একটি ওক গাছ লাগানো হয় এবং ২৫ হাজার ফুল দিয়ে সুসজ্জিত অলিম্পিক রিং প্রদর্শন করা হয়। আসন্ন ক্রীড়াযজ্ঞ উপলক্ষে ইতোমধ্যে আয়োজকরা পুরো সিডিউল ঘোষণা করেছেন। এবারের আসরের ইভেন্টগুলোর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে ৯০০টি ভেন্যু। লন্ডন অলিম্পিকের আয়োজকরা এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সবাইকে চমকে দেয়ার আশা করছেন। আয়োজকদের দাবি, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অংশজুড়ে থাকা সাংস্কৃতিক উৎসব এর আগে কেউ উপহার দিতে পারেনি। ‘অন দ্য নাইট শো’ শিরোনামে পুরো আসরের রাত্রিকালীন সঙ্গীতযজ্ঞ ও উন্ডারমার লেকজুড়ে আতশবাজি উৎসবের মূল পরিকল্পনার দায়িত্ব পেয়েছেন ফ্রান্সের স্ট্রিট আর্টস কোম্পানি ‘লেস কমান্ডোস পারসু’। বিশ্বের ২৫ হাজার সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব তাঁদের উপস্থিতিতে ধন্য করবেন লন্ডন অলিম্পিককে। মূল ইভেন্টের পাশাপাশি এসব বিনোদনমূলক আসরের কমপক্ষে ১০ মিলিয়ন টিকেট ফ্রি বণ্টন করা করা হবে। অলিম্পিকে অংশ নেয়া ২০৪টি দেশের প্রতিনিধিরাও থাকবেন এসব অনুষ্ঠানে। লন্ডন অলিম্পিকের সঙ্গীতযজ্ঞের সূচনা করবেন সুপারস্টার তারকা গুস্তাভো ডুডামেল। সেটি ওই স্কটল্যান্ডের ব্যাকড্রপ অব স্ট্রিরলিং ক্যাসেলের রাত্রিকালীন ওপেন এয়ার কনসার্ট দিয়ে। লন্ডন অলিম্পিকের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ফেস্টিভ্যাল পরিচালক রুথ ম্যাকেঞ্জি বলেছেন, গ্রেট ব্রিটেনের ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনের সঙ্গী হতে চলেছে লন্ডন অলিম্পিক। এদিকে লন্ডন অলিম্পিকের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান আকর্ষণীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ করতে ব্রিটিশ সরকার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে; চলছে তাদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। অলিম্পিক ভেন্যুর নিরাপত্তাজনিত ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২৭ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড। ফলে এ বাবদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৫ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড। নীতিনির্ধারণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড। যেসব ভেন্যুতে গেমস হবে সে সব ভেন্যুর নিরাপত্তার জন্য ২৩ হাজার ৭০০ গোয়েন্দাকর্মী থাকবেন। ফলে নিরাপত্তা ব্যয় ১০০ কোটি পাউন্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে আয়োজক সূত্র জানিয়েছে। উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে ব্যয় হবে আট কোটি ১০ লাখ পাউন্ড। এর মধ্যে চার কোটি ১০ লাখ পাউন্ড আয় হবে জনগণের কর পরিশোধের অর্থ থেকে। পূর্ব লন্ডনের স্ট্যাটফোর্ড স্টেডিয়ামে চারটি অনুষ্ঠানের সময়কাল ধরা হয়েছে ৩ ঘণ্টা করে। ব্রিটিশ আয়কর বিভাগ জানিয়েছে, আয়কর পরিশোধের মাত্রা দাঁড়াবে ৯৩০ কোটি পাউন্ড। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সংস্কৃতি, প্রচার মাধ্যম ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানের জন্য তারা চার কোটি ১০ লাখ পাউন্ড দেবে। নিরাপত্তাজনিত কারণেই ব্যয় বেশি হবে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে মূল ভেন্যু যেখানে এ্যাথলেটিক্স ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। এখানে প্রচুর দর্শক আসবে। সেই সুযোগে কোনো জঙ্গীবাদী সংগঠন যাতে কোন অঘটন ঘটাতে না পারে সেজন্য কড়া নিরাপত্তা থাকবে। এক্ষেত্রে ২৩ হাজার ৭০০ নিরাপত্তাকর্মী পুরো ভেন্যু প্রদক্ষিণ করতে থাকবে। প্রতিটি ইভেন্ট শুরুর আগে ভেন্যুতে নিরাপত্তাকর্মী ও বাহিনী নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, ট্রেনিং সেন্টার ও মিডিয়া সেন্টার পর্যবেক্ষণ করবে। এজন্য ২০০০ এক্সরে মেশিন ও মেটাল ডিটেক্টর থাকবে। পুরো ৪০ মাইল এলাকা নিরাপত্তার বেষ্টনীতে ঘিরে রাখা হবে।
লন্ডন অলিম্পিক এ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মোট বাজেট ৯৩০ কোটি পাউন্ড ছাড়িয়ে গেছে। ২০০৫ সালে লন্ডন যখন অলিম্পিক বিডে জয়ী হয়ে আয়োজক হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছিল, তখন প্রাথমিক বাজেট ধরা হয়েছিল ২৩৭ কোটি পাউন্ড। কিন্তু দুই বছরের ব্যবধানে বাজেট প্রায় দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়। আর এখন তা এক হাজার কোটি পাউন্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে জানা গেছে। ইংল্যান্ডের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অলিম্পিকের নিরাপত্তাজনিত কাজে সাত হাজার সামরিক বাহিনীর বিশেষ ফোর্স সর্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। এই বিশেষ ফোর্সের জন্য ৩০ লাখ পাউন্ড ব্যয় হবে। অলিম্পিকের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হাফ রবার্টসন অতিরিক্ত ব্যয়ের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে বলেছেন, অলিম্পিক বিশ্বের সেরা ক্রীড়া আসর। এ জন্য অর্থ ব্যয় হবে। লন্ডন কর্তৃপক্ষ যে কাজটি করতে পারে তা হচ্ছে পত্রপত্রিকা, প্রচার মাধ্যম ও বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে খরচ মেটাতে পারে। কারণ আমরা চাই সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক অনুষ্ঠান প্রচার করে বিশ্বকে মাতিয়ে দিতে।

No comments

Powered by Blogger.