সমাজ-মুক্তিযোদ্ধাদের স্থান হবে সবার ওপরে by মহিউদ্দিন আহমদ

বছর দুই আগে একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা পড়েছিলাম পত্রিকায়—একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভার পর অতিথিদের খাবারের উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করছেন নিজ পরিবারের জন্য। এটা পড়ে আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা কেঁদেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যত দিন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা অভুক্ত থাকবে, তত দিন আমি বঙ্গভবনে যাব না।’ তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন কি না জানি না।

আমি সেই খবরটি পড়ে আহত হয়েছি, অবাক হইনি। গত চার দশক ধরে আমরা দেখছি একই চালচিত্র। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের শ্রম, ঘাম আর রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার যে সিঁড়িগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন, সেটা মাড়িয়ে অনেকেই ক্ষমতা আর বিত্তের চূড়ায় উঠে গেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বিরাট অংশ পড়ে আছে পাদপ্রদীপের নিচে, অন্ধকারে।
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তবে আমার কাছে কোনো সার্টিফিকেট নেই। এর প্রয়োজন কখনো অনুভব করিনি। দেশ এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধায় ছেয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, একটা প্রমাণপত্র থাকলে মন্দ হতো না।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সহসভাপতি শামসুল কাউনাইন আমার স্কুলজীবনের সতীর্থ। কাউন্সিলের পুনর্বাসন ও কল্যাণ মহাসচিব মনিরুল হক ও আমি একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। তাঁদের কাছে আমার ইচ্ছার কথা জানাতেই তাঁরা আমাকে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার একটি লম্বা ফিরিস্তি দিলেন। আমি বললাম, ‘মুক্তিযোদ্ধা হয়েও যদি প্রমাণের জন্য আমাকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তাহলে তোমাদের কাজটা কী?’ দুই দিন পর তাঁরা আমাকে জানালেন, একটা কর্মসূচি উপলক্ষে তাঁরা এক দিনের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাবেন, আমি যেন তাঁদের সহযাত্রী হই। আমি সানন্দে রাজি হলাম।
১৯ মে ভোরে রওনা হয়ে পৌঁছালাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে। সংসদের জেলাপ্রধান হারুনুর রশীদ আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। জেলা পরিষদ মিলনায়তনে দেখা হলো মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল হক সরকার ও আখতার হোসেন সায়িদের সঙ্গে। জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অপেক্ষা করছিলেন সংসদের জেলা উপপ্রধান রতন মিয়া। মিলনায়তন কানায় কানায় ভরা। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক মুক্তিযোদ্ধা সমবেত হয়েছেন। সবাই প্রবীণ। শরীর ভেঙে গেছে, চোখ কোটরাগত। অনেকের হাতে লাঠি। কেউ বা অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছেন। যে তরুণেরা একদা রাইফেল হাতে শত্রুনিধনে ছোটাছুটি করেছেন, আজ তাঁরা অবসন্ন এবং অনেকটাই অপাঙেক্তয়। তাঁদেরই নাকি বলা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান! মলিন বেশভূষায় দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। আমার রবীন্দ্রনাথকেই মনে পড়ল:
ওই যে দাঁড়ায়ে নতশির
মূক সবে, ম্লান মুখে লেখা
শত শতাব্দীর বেদনার করুণ কাহিনী।
স্কন্ধে চাপে যত ভার
বহিচলে মন্দ গতি যতক্ষণ
থাকে প্রাণ তার।
রিকশাচালকের সামাজিক মর্যাদা নেই। এই বয়সে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধা রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করবেন, এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। এই উপলব্ধি থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তাদের পুনর্বাসনের একটি উদ্যোগ নিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা রিকশাচালককে দুটো করে রিকশা দেওয়া হবে, যা ভাড়া দিয়ে তাঁরা সংসার চালাবেন। ব্যাপারটি আমার কাছে খুব একটা সুখকর মনে হলো না। আরেকজনকে দিয়ে এই ‘অমর্যাদাকর’ কাজটি করিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁর মর্যাদা বজায় রাখবেন, এটা কেমন সমাধান হলো? পুনর্বাসনের আর কোনো লাগসই উপায় আছে কি না, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তা ভেবে দেখতে পারে।
আমার পাশেই বসা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। বয়সের ভারে নত, চোখে ছানি পড়েছে। মোট চারজন মুক্তিযোদ্ধাকে দুটি করে আটটি নতুন রিকশা দেওয়া হলো। মনিরুল হক দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য তাঁদের চিন্তাভাবনার কথা বললেন। বললেন, এখন আড়াই হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয় প্রতি মাসে। এটা বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে পাঁচ হাজার করা হবে। শামসুল কাউনাইনের সঙ্গে আলাপচারিতায় সংসদের যাত্রারম্ভের সময়কার মহাসচিব, আমার আরেক সতীর্থ, আবদুল আজীজ বীর প্রতীকের প্রসঙ্গ উঠল। আমরা স্মৃতিতাড়িত হলাম। আজীজ ওই সময় অমানুষিক পরিশ্রম করেছিল সংসদকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
আমি চার দশক আগে ফিরে গেলাম। ফ্ল্যাশব্যাকে দৃশ্যমান হলো সবুজ জমিন, কাঁধে গামছা, হাতে কালো কারবাইন, নগ্নপদে জমির আল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমরা কজন—ভাদুগড়ের আলী আকবর, নাটঘরের লিয়াকত আলী, চাপুরের ফয়েজ, ধনাশীর ওয়ালীউল্লাহ, কোনাউরের মোখলেস, কালঘরার রফিক, নিলখির রেণু, নবীনগরের আলম, ধরাভাঙ্গার লতিফ। লতিফ ছিলেন আমাদের দলনেতা। পরে জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিলেন। সম্প্রতি প্রয়াত। আলম ও ওয়ালীউল্লাহ আর নেই। আলী আকবরের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলো। অন্যরা কে কেমন আছে জানি না।
মনিরুল হক যখন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি শোনাচ্ছেন, আমি ভাবলাম, জাতি কি এই দু-চার-পাঁচ হাজার টাকা মাসিক ভাতা দিয়ে তাঁদের ত্যাগের প্রতিদান দেবে? একজন উঁচু পদের সরকারি কর্মকর্তা যে হারে অবসর ভাতা পান, জাতির একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান কোন যুক্তিতে তার চেয়ে কম পাবেন?
আমি মনে করি না, নানান রকম ইহজাগতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাঁদের ত্যাগের প্রতিদান দেওয়া সম্ভব। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি বিবেকের তাড়নায়, বেতন-ভাতার আকাঙ্ক্ষা ছিল না। দেশের সব নাগরিকের দেখভাল করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দেশে একটি মানুষও অনাহারে থাকবে না, সবার মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে, তাদের সন্তানেরা স্কুলে যাবে, অসুখ-বিসুখে চিকিৎসাসেবা পাবে, এটাই তো রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত। তা না হলে রাষ্ট্রের প্রয়োজন কী? কিন্তু যদি সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে, তখন প্রশ্ন ওঠে অগ্রাধিকার নির্ণয়ের। এই অগ্রাধিকার বিবেচনায় সাংসদেরা বিনা শুল্কে গাড়ি পাবেন, শিল্পপতিরা ট্যাক্স হলিডে পাবেন, নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা হবে?
অনেক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেখা যায়, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরিয়ে হুইলচেয়ারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। তারপর রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সামনে দিয়ে হেঁটে যান, দু-একবার কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। এ ছবি টেলিভিশনের পর্দায় দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত। আমার প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোর সামনের সারিটি কেন তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য বরাদ্দ থাকবে না?
মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের জন্য চার দশক আগে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিল। অনেক লাভজনক প্রতিষ্ঠান এই ট্রাস্টের আওতায় আনা হয়েছিল, যাতে করে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া যায়। ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চুরি-চামারির কারণে প্রায় দেউলিয়া হয়ে গেছে। যারা এর জন্য দায়ী, তাদের কি বিচার হয়েছে?
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মায়াকান্না কম হয়নি। তাঁরা তো ভিক্ষা চান না? তাঁরা চান একটি সুন্দর জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। আমরা যদি একটি ‘অর্ডার অব প্রিসিডেন্স’ দিয়ে সমাজে কৌলীন্যপ্রথা চালু রাখি, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের কেন সবার ওপরে রাখা হবে না? আমরা মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনার কথা বলি, তার প্রাথমিক শর্তই হলো মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করা। বাগাড়ম্বর দিয়ে এই চেতনার বাস্তবায়ন হবে না।
নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যে রকম ভয়াবহ রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে, তা থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদও মুক্ত নয়। গুটি কয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া এই বিভাজনের দগদগে ঘা ছড়িয়ে পড়েছে সমাজদেহের সর্বত্র। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তার মর্যাদা অনেকটাই হারিয়েছে এই রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির জন্য। এটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
প্রয়োজনমতো টাকা আর যোগাযোগ থাকলে এ দেশে সহজেই এমপি হওয়া যায়, মন্ত্রী হওয়া যায়, রাজনৈতিক দলের মালিক হওয়া যায়; কিন্তু চাইলেই মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় না। এ সুযোগ ইতিহাস আমাদের একবারই দিয়েছিল। যাঁরা সেদিন দেশ ও মানুষের মর্যাদা ও মুক্তির লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁদের অবহেলা করে, চরিত্র হনন করে বা অনুকম্পা দেখিয়ে এই জাতি কখনোই বড় হতে পারবে না।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক, গবেষক।
mohi2005@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.