ডিসিসি দু'ভাগ হওয়ার আগেই by শাহেদ চৌধুরী

ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) দু'ভাগ হওয়ার আগেই মেয়র পদে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলের সমর্থন পেতে নীতিনির্ধারক মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। নগরবাসীর কাছে নিজেদের আগ্রহ জানাতে কৌশলে নানামুখী প্রচার-প্রচার চালাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সমর্থকদের বাগে আনতে দলের পদ-পদবির টোপও দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।


তবে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সংসদে কোনো আইন পাস হয়নি। ইতিমধ্যে গ্রুপ বৈঠকও করেছেন কেউ কেউ। শুক্রবার জুমার নামাজের পর অনেকে
দোয়া চেয়েছেন। অনেকে হজ করে এসেছেন।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মধ্যে যারা সরকার সমর্থক, তারাও ঢাকাকে দুই ভাগ করার বিপক্ষে অভিমত দিয়েছেন।
বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিতে, রাজনৈতিক কারণে সরকার ঢাকাকে দুই ভাগ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এক ঢাকায় নির্বাচন হলে সরকারি দলের প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা কম বলেই এমন অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতেও সরকারের শেষ রক্ষা হবে কিনা সন্দেহ। এর ফলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনও বাড়বে।
ঢাকাকে বিভক্ত করার বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত থাকলেও মেয়র পদে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলের সমর্থন পাওয়ার জন্য নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হরেক রকম পোস্টার-ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে।
আবার ঢাকাকে দুই ভাগ করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানানোর পোস্টারও চোখে পড়ছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার-ফেস্টুন টাঙানোর উদ্যোগ রয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। পোস্টার-ফেস্টুন প্রকাশের দিক থেকে এগিয়ে আছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম ও কামাল আহমেদ মজুমদার এমপি।
সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় এখন নামের ছড়াছড়ি। তাদের মধ্যে ঢাকা উত্তরে রয়েছেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, ঢাকা-১০ আসনের সাংসদ একেএম রহমতুল্লাহ এবং ঢাকা-১৫ আসনের সাংসদ কামাল আহমেদ মজুমদার। ঢাকা-১৪ আসনের সাংসদ আসলামুল হক আসলামও প্রার্থী তালিকায় আছেন।
ঢাকা দক্ষিণের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, ঢাকা-৯ আসনের সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী এবং ঢাকার সাবেক সাংসদ হাজী মোহাম্মদ সেলিম। এ ছাড়াও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ এবং ঢাকা-৬ আসনের সাংসদ মিজানুর রহমান খান দিপুর নামও শোনা যাচ্ছে।
প্রচার-প্রচারণা ও আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, একেএম রহমতুল্লাহ, কামাল আহমেদ মজুমদার, মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, সাবের হোসেন চৌধুরী এবং হাজী মোহাম্মদ সেলিম। সাবের হোসেন চৌধুরী ঢাকায় নেই। তিনি তার অসুস্থ মা রাশিদা চৌধুরীর চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে রয়েছেন।
শীর্ষ নেতাদের বাসায় গিয়েও শলা-পরামর্শ করেছেন কেউ কেউ। তারা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ইতিবাচক সাড়া পেতে চেষ্টা-তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন যমুনায় এক ঘরোয়া আলোচনায় দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ঢাকার মেয়র পদে উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য তোফায়েল আহমেদের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। তোফায়েল আহমেদ এমপি অবশ্য এই প্রস্তাবে সাড়া দেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কোনো মন্তব্য করেননি।
আলোচনার এক পর্যায়ে মেয়র পদে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু তারও আগ্রহ নেই। মেয়র পদে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এমপি, দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরী ও ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এমপির নাম শোনা গেলেও এখন নেই।
আগামী নির্বাচনে ঢাকার মেয়র মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। সুতরাং মেয়রের পতাকা পেলে উল্টে যেতে পারেন_ এমন কাউকে সমর্থন দেওয়া হবে না। এই অবস্থায় নগরের নেতাকর্মীরা পরীক্ষিত নেতৃত্বকে সমর্থন দেওয়ার পক্ষে রয়েছেন।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, তিনি নির্বাচনে লড়ার জন্য ষোলো আনা প্রস্তুত। তার কথা, দীর্ঘ দিন ধরে তিনি ঢাকায় রাজনীতি করছেন। ঢাকাবাসীর জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। এখন তিনি ঢাকাবাসীর সেবা করতে চান।
ঢাকা-১০ আসনের সাংসদ একেএম রহমতুল্লাহ বলেন, তিনি সাদা কাপড়ের মানুষ। তার গায়ে কোনো দাগ নেই। মেয়র পদে জয়ী হওয়ার মতো নেটওয়ার্কও রয়েছে তার।
ঢাকা-১৫ আসনের সাংসদ কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, বৃহত্তর মিরপুরে ভোটার বেশি। বৃহত্তর নোয়াখালীর উল্লেখযোগ্য ভোটার মিরপুরের বাসিন্দা। তাদের চাপেই তিনি প্রার্থী হতে চাইছেন। কামাল মজুমদার তার বিকল্প হয়ে আওয়ামী লীগের অন্য কেউ ভোট টানতে পারবেন না বলে মন্তব্য করেছেন।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, তিনি ঢাকার সন্তান। তার বাবা মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ঢাকাবাসীর সুখে-দুঃখে থেকেছেন। বাবার মতো ঢাকাবাসীর জন্য তার দরজাও সব সময় খোলা থাকে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন পেলে নির্বাচনে লড়বেন বলে জানিয়েছেন।
হাজী মোহাম্মদ সেলিম শুক্রবার লালবাগের শাহী মসজিদে মেয়র প্রার্থিতার জন্য দোয়া চেয়েছেন। তার মতে, ভোটযুদ্ধে কেউই তার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারবেন না। তবে দলের সমর্থন না পেলে তিনি নির্বাচন করবেন না। সে ক্ষেত্রে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে তিনি আগ্রহ হারাবেন।
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে নানা কথা রয়েছে। অভিক্ত ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বিভক্ত ঢাকায় নির্বাচন করতে আগ্রহী হবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তা ছাড়া ইভিএম (ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন) পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজনের প্রতিবাদে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন বয়কটের ইঙ্গিত দিয়েছে বিএনপি।
ঢাকায় ইভিএম পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজন বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কয়েকটি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলক ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে মেয়র পদে বিএনপির মনজুর আলম জয়ী হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী একেএম শামীম ওসমান হেরে গেছেন।

No comments

Powered by Blogger.