সুবর্ণ জয়ন্তী-সংস্কৃতির পথে, লড়াইয়ের পথে ছায়ানটের ৫০ বছর by নওশাদ জামিল

গাছগাছালিতে ঘেরা বড়সড় লাল ইটের ভবন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে বসতবাড়ি। ধানমণ্ডির শংকর বাসস্ট্যান্ডের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এ ভবন আসলে সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য তীর্থস্থান পরিতুল্য। সারা দিন এ ভবনে শিশু থেকে শুরু করে নানা স্তরের সংস্কৃতিপ্রেমীদের পদচারণ। মাঝেমধ্যে এখান থেকে ভেসে আসে মধুর ধ্বনি_'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'। এটিই বিখ্যাত সেই ছায়ানট। কাগজে-কলমে এর নাম 'ছায়ানট সংস্কৃতি


ভবন'। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধানের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এ প্রতিষ্ঠান অতিক্রম করল গৌরবের ৫০ বছর। প্রতিষ্ঠার অর্ধশত বছর পূর্তি উপলক্ষে ছায়ানট আগামী ২৫ ও ২৬ নভেম্বর আয়োজন করেছে বিশেষ উৎসবের।
ছায়ানটের শুরুটা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের জন্য একত্রিত হয়েছিলেন সংস্কৃতিমনা কিছু মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিচারপতি মাহবুব মোরশেদ, ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক প্রমুখ। ভয়-ভীতি পিছু ফেলে অত্যন্ত সফলভাবে তাঁরা আয়োজন করেন রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষের উৎসব। দেশব্যাপী আয়োজিত এ উৎসব শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার, বাঙালি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার। পরে তাঁরা মোখলেসুর রহমান সিধুর নেতৃত্বে জয়দেবপুরে মিলিত হন রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানের সমাপনী সম্মিলনের জন্য। সেখানেই জন্ম নেয় ছায়ানটের।
'ছায়ানট : আরম্ভ কথা' শীর্ষক রচনায় প্রয়াত ওয়াহিদুল হক লেখেন, 'শরতের বেলা পড়ে এসেছে, লম্বা হয়ে পড়ে থাকা গাছের ছায়াতে ভাওয়াল এস্টেটের ম্যানেজার-বাড়ির আঙিনায় আমরা শতেক কর্মী কঠিন শপথ নিলাম_আর ঘরে ফেরা নয়। তাহলে? সিধু ভাইয়ের নেতৃত্বে কর্তব্য নির্ধারণী সভা বসল। সকলে একমত। শতবার্ষিকীর খুলে দেওয়া পথে যাব আমরা। বাঙালিকে সংস্কৃতির পথে ফেরাব আমরা, লড়াইয়ের পথে ফেরাব। আমরা রবীন্দ্রধ্বজ কিছু সংশপ্তক। সভাপতির জন্য হাতড়াতে হল না কারো। একবাক্যে সবাই নাম করল সুফিয়া কামালের। সম্পাদক হলেন ফরিদা হাসান। তাঁর স্বামী বানিয়াচঙ্গের জমিদার বংশের সয়ীদুল হাসান সরকারি চাকুরে হলেও সংস্কৃতি ও দেশমনস্ক অভিজাত রুচির মানুষ। সংগঠনের নাম তাই প্রস্তাবানুযায়ী হল ছায়ানট।'
ওই ছায়ানট এখন দেশের সংস্কৃতি ও সংগীতচর্চার প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় অভিষিক্ত। বর্তমানে দেড় শতাধিক শিক্ষকের নিবিড় পরিচর্যায় এখানে শিক্ষা গ্রহণ করছেন তিন হাজার শিক্ষার্থী। কেবল সংগীতচর্চাই নয়, বাঙালি সংস্কৃতির পরিচর্যায় নানামাত্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে ছায়ানট নিজেই একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
১৯৬১ সালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সারা বাংলার বিশিষ্ট সুরকার-গীত রচয়িতাদের গান পরিবেশনের মাধ্যমে পথচলা শুরু ছায়ানটের। উন্মুক্ত অঙ্গনে ছায়ানটের প্রথম অনুষ্ঠান বসন্ত ঋতুবরণ। ১৯৬৪ সাল, বাংলা ১৩৭১-এর ১ বৈশাখ রমনার বটমূলে ছায়ানট সর্বপ্রথম বাংলা নববর্ষ পালন করে। ক্রমেই চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, নাট্যশিল্পী, চলচ্চিত্র সংসদ-কর্মী, বিজ্ঞানীসহ নানা ক্ষেত্রের মানুষের মিলনমঞ্চ হয়ে ওঠে এ ছায়ানট। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে, সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সংগঠনটি।
উদয়ন বিদ্যালয়, আজিমপুর কিন্ডারগার্টেন স্কুল, কলাবাগান লেক সার্কাস বিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে ইত্যাদি অস্থায়ী ঠিকানায় ছায়ানট ছিল দীর্ঘদিন। বর্তমানে ছায়ানট ধানমণ্ডিতে নিজের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। ১৯৯৯ সালে ছায়ানট ভবন নির্মাণের জন্য সরকার এক বিঘা জমি বরাদ্দ দেয় ধানমণ্ডিতে। পরে প্রখ্যাত স্থপতি বশিরুল হকের নকশায় বরাদ্দ করা জায়গায় নির্মিত হয় আজকের 'ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন'।
ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল বলেন, 'ছায়ানটের ৫০ বছর পূর্তির এই সময়ে এসে মনে হয়, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি ক্ষুদ্র একজন কর্মী হিসেবে জড়িয়ে আছি। এটা আমার পরম সৌভাগ্য। ছায়ানট অনেক বড় কিছু করেছে_এটা বলব না, তবে আমাদের বাংলা সংস্কৃতিতে দেশে ও দেশের বাইরে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ছায়ানট নিরলস কাজ করে চলেছে। এটাই আমাদের সবার সার্থকতা।'
প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে গান, নৃত্য, যন্ত্রসংগীতের প্রশিক্ষণ। রয়েছে সাধারণ শিক্ষার বিদ্যালয় 'নালন্দা'; শিশুদের মনোজাগতিক বিকাশের কার্যক্রম 'শিকড়'। এ ছাড়া রয়েছে অটিস্টিক শিশুদের সহায়ক কর্মকাণ্ড 'সুরের জাদু/রঙের জাদু', বাংলা ভাষা অনুশীলন কার্যক্রম 'ভাষার আলাপ'। এ ছাড়া 'বাংলাদেশের হৃদয় হতে' নামের একটি ত্রৈমাসিক প্রকাশনাও রয়েছে ছায়ানটের।
পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন আজ নাগরিক বর্ষবরণের অপরিহার্য অংশ। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত শ্রোতার আসরসহ নানা বর্ণিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে বছরব্যাপী। এ ছাড়া সংস্কৃতি ভবনে রয়েছে ছায়ানট মিলনায়তন, রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনকেন্দ্র, বক্তৃতা কক্ষ, রেকর্ডিং স্টুডিও এবং একটি অডিও ভিজ্যুয়াল ল্যাব। প্রশিক্ষণের বাইরে প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত কাজ করেন এখানে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছায়ানটের নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য রহমান বলেন, 'আমাদের নিজস্ব অনুষ্ঠানের বাইরে মিলনায়তনগুলো ভাড়া দেওয়া হয়। তবে মূলধারার সাংস্কৃতিক সংগঠনের বাইরে অন্য কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয় না।'
কবি সুফিয়া কামাল, মোখলেচুর রহমান, সায়েরা আহমদ, ওয়াহিদুল হক, ফরিদা হাসান, সন্জীদা খাতুনসহ আরো অনেকের স্বপ্ন নিয়ত বয়ে বেড়াচ্ছে ছায়ানট। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধানে এ এক দীর্ঘ পথ পরিক্রমা।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উৎসব : প্রতিষ্ঠার অর্ধশত বছর পূর্তি উৎসব হবে ২৫ ও ২৬ নভেম্বর ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে। প্রথম দিন সকাল ১০টায় সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষক মদন গোপাল দাস ছায়ানট ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন। এরপর ভবনের সামনে স্থাপিত শিল্পী নাসিমা হকের গড়া একটি ভাস্কর্যের উদ্বোধন করা হবে। বিরতিহীনভাবে অনুষ্ঠান চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
অনিন্দ্য রহমান জানান, ছায়ানটের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যাঁরা সংগঠক-কর্মী-সদস্য ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছিলেন, তাঁদের সবাইকে নিয়ে সম্মিলনীর আয়োজন করা হয়েছে আগামী ২৫ নভেম্বর। ৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানটি হবে পরের দিন সন্ধ্যায়। নানা সময়ে যাঁরা ছায়ানটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে নির্বাচিত কয়েকজনকে গান করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। থাকবে এ সময়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও। থাকবে গান, নাচ, আবৃত্তি, পাঠ ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

No comments

Powered by Blogger.