সয়াবিনের দাম আবার বাড়াল কম্পানিগুলো-দুই দফায় আট টাকা বৃদ্ধি by রাজীব আহমেদ

খোলা সয়াবিন তেলের দাম আরেক দফা বাড়িয়েছেন মিলমালিকরা। ঈদের পর এক দফা বাড়ানো হয়েছিল। গত সপ্তাহে বাড়ানো হলো আবার। দুই দফায় বাড়ানো হলো লিটারপ্রতি আট টাকা। ঈদের আগে মিলগেটে এ তেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ৯৯ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ১০৭ টাকা। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১১ টাকা।একই সঙ্গেবোতলজাত সয়াবিন তেলের দামও বাড়িয়েছে কম্পানিগুলো। এক লিটারের বোতলের দাম বাড়ানো হয়েছে দুই টাকা।


আর দুই ও পাঁচ লিটারের বোতলের দাম বেড়েছে যথাক্রমে চার ও ১০ টাকা।দেশের বাজারে দাম বাড়ানো হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম নিম্নমুখী। গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে যা দাম ছিল বর্তমানে তার চেয়ে টনপ্রতি কমপক্ষে ১০০ ডলার কমে বিক্রি হচ্ছে। যদিও কমোডিটি এঙ্চেঞ্জ মার্কেটগুলোতে প্রতিদিনই দাম টনপ্রতি ২০-২৫ ডলার ওঠানামা করে।
দাম বাড়ার কারণ হিসেবে মিলমালিকরা বলছেন, তাঁরা এত দিন লোকসানে তেল বিক্রি করেছেন। এখন লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নিতে দাম বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে অনেক ব্যবসায়ী বলেছেন, শীতে পাম তেল জমাট বেঁধে যায় বলে সয়াবিনের সঙ্গে মেশানো যায় না। ভেজাল দেওয়া যায় না বলেই দাম বাড়ানো হয়েছে।
কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতারা জানান, দু-তিন দিন আগে সিটি গ্রুপের তীর ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলের দাম লিটারে দুই টাকা বাড়ানো হয়। এরপর প্রায় সব কম্পানি এই হারে বাড়িয়ে এক লিটারের বোতল ১২৩ টাকা নির্ধারণ করে। একমাত্র বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের তেলের দাম অন্য কম্পানির চেয়ে লিটারে দুই টাকা বেশি। তাদের সয়াবিন তেলের এক লিটারের বোতলের দাম ১২৫ টাকা।
নতুন দর অনুযায়ী, দুই লিটারের বোতলের দাম চার টাকা বেড়ে ২৪৪ টাকা ও পাঁচ লিটারের বোতল ১০ টাকা বেড়ে ৬০৫ টাকা হয়েছে।
কোরবানির ঈদের আগে লিটারপ্রতি প্রায় পাঁচ টাকা কমিয়ে মিলগেটে ৯৯ টাকা লিটার দরে তেল বিক্রি করেছেন মিলমালিকরা। ঈদের পর এক দফা বাড়িয়ে ১০৩-১০৫ টাকা করা হয়। গত সপ্তাহে আবার বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১০৭ টাকা।
সূত্র জানায়, সিটি গ্রুপ এখন মিলগেটে ১০৭ টাকায় প্রতি লিটার তেল বিক্রি করছে। তারা দাম আরো এক টাকা বাড়াবে বলে পরিবেশকদের জানিয়েছে। মেঘনা গ্রুপ তেল বিক্রি করছে ১০৭ টাকায়। টিকে গ্রুপের তেল মিলগেটে বিক্রি হচ্ছে ১০৩ টাকায়।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী ভুট্টো বলেন, বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট চলছে। অন্যদিকে চাহিদাও বেশি। মজুদ সীমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম নিম্নমুখী হওয়ার পরও তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে তেল পরিশোধনকারী মিলগুলো।
গত ২১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম ছিল টনপ্রতি এক হাজার ৯৯ ডলার। পণ্যের আন্তর্জাতিক দর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিএমই গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ জানুয়ারি দাম ছিল টনপ্রতি এক হাজার ২৭১ ডলার। ১৮ ফেব্রুয়ারি তা কমে দাঁড়ায় এক হাজার ২৩৫ ডলারে। ১৮ মার্চ এক হাজার ২২৯ ডলার, ১৮ এপ্রিল এক হাজার ২৬৫ ডলার, ১৮ মে এক হাজার ২২৯ ডলার, ১৮ জুন এক হাজার ২৩২ ডলার, ১৮ জুলাই এক হাজার ২৬৪ ডলার, ১৮ আগস্ট এক হাজার ২২১ ডলার, ১৮ সেপ্টেম্বর এক হাজার ২৪৬ ডলার ও ১৮ অক্টোবর এক হাজার ১৬১ ডলার। ১ নভেম্বর সয়াবিন তেলের দাম ছিল টনপ্রতি এক হাজার ১১৯ ডলার, ১৫ নভেম্বর ছিল এক হাজার ১৬৯ ডলার।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদিনই দাম ২০-২৫ ডলার ওঠানামা করে। ব্যবসায়ীরা সাধারণত সর্বনিম্ন দামেই পণ্য কিনে থাকেন। বিশ্ববাজারে দাম বাড়েনি যে দেশের বাজারে ঈদের পর মাত্র দুই সপ্তাহে সাত-আট টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, গত চার-পাঁচ দিন চট্টগ্রাম বন্দরে কিছু ঝামেলার কারণে তাঁদের সয়াবিন তেল খালাসে বিলম্ব হয়েছিল। সে কারণে হয়তো সরবরাহে কিছু ঝামেলা হয়েছে। তাঁদের কাছে সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত মজুদ আছে বলে জানান তিনি।
দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে কেন জানতে চাইলে মোস্তফা কামাল বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কমে যাওয়ায় কিছুদিন আগেও ১০৯ টাকার তেল ৯৯ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এখন লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য দাম একটু বাড়ানো হয়েছে।
গত ৫ ডিসেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে প্রথমবারের মতো ভোজ্য তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। ওই দিন ঢাকার জন্য সয়াবিন তেলের দাম ৮৪ টাকা ও অন্যান্য স্থানের জন্য ৮৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মিলগেটের ওই দর নির্ধারণ করা হয় ঢাকায় ৮৩ টাকা ও চট্টগ্রামের জন্য ৮১ টাকা। এরপর দাম শুধু বাড়ছেই। সর্বশেষ ২০ জুলাই দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। ওই দিন পরিবেশকদের জন্য সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করা হয় লিটারপ্রতি ১০৫ টাকা। পরিবেশকরা তা ১০৭ টাকা দরে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে এবং খুচরা বিক্রেতারা তা ১০৯ টাকা দরে বিক্রি করবেন বলে ঠিক করা হয়। নতুন করে দাম বাড়ানোর ফলে নির্ধারিত ওই দাম অতিক্রম করে গেছে।
ঈদের আগে খোলা তেলের দাম কমলেও বোতলজাত তেলের দাম কমেনি। একমাত্র সিটি গ্রুপ সপ্তাহখানেক তাদের তীর ব্র্যান্ডের তেলে লিটারপ্রতি দুই টাকা বেশি কমিশন দিয়েছিল খুচরা বিক্রেতাদের। কিন্তু বোতলে মুদ্রিত দাম ছিল আগের মতোই। ফলে সাধারণ ক্রেতা যাঁরা বোতলজাত তেল কেনেন তাঁরা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার কোনো সুফল পাননি। বেশির ভাগ মানুষ বোতলজাত সয়াবিন তেল ব্যবহার করে। খোলা তেল বেশি ব্যবহার করেন হোটেলমালিকরা।

No comments

Powered by Blogger.