স্মরণ-মোহন মিয়ার অবদান

রহুম ইউসুফ আলী চৌধুরী ওরফে মোহন মিয়ার নাম যখন প্রথম শুনি তখন আমি ভাঙ্গা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের ছাত্র। আমাদের ক্লাসের ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্রের মধ্যে আমরা মাত্র সাত-আটজন মুসলমান। শিক্ষকদের মধ্যে প্রায় সবাই হিন্দু। দু-একজন মুসলমান শিক্ষক আরবি-ফারসি পড়ানোর জন্য ছিলেন। আমরা মুসলমান ছাত্ররা মুসলমান কোনো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির নাম শুনলে খুবই খুশি হতাম। ওই সময় মোহন মিয়া ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক আইনসভার


নির্বাচনে দত্তপাড়ার বাদশাহ মিয়ার সঙ্গে শিবচর ও সদরপুর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। আমাদের এলাকায় বাদশাহ মিয়া খুবই পরিচিত ছিলেন। তবে মরহুম আব্বাজান এবং আরো অনেকে মোহন মিয়ার সমর্থক ছিলেন। ওই সময় বাইশরশির জমিদাররা খুবই পরাক্রমশালী ছিলেন। তাঁরা প্রজাদের ওপর, বিশেষ করে মুসলমান প্রজাদের ওপর খুবই অত্যাচার করতেন। তাঁদের বেশির ভাগ প্রজাই ছিলেন মুসলমান, তাঁরা মুসলমান প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা ছাড়াও পূজা-পার্বণ ও নানা উৎসব-অনুষ্ঠান উপলক্ষে টাকা-পয়সা আদায় করতেন। অত্যাচার করা হতো। জানা যায়, বেচু সরকার নামের একজন মুসলমান প্রজা জমিদারের বিরাগভাজন হলে জমিদারদের হুকুমে তাঁর দাড়ি ছিঁড়ে ফেলা হয়। এ ঘটনায় ফরিদপুর জেলার মুসলমানদের মধ্যে খুবই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। মোহন মিয়া এ ঘটনার জোর প্রতিবাদ জানিয়ে বেচু সরকারের পক্ষাবলম্বন করেন। এতে মুসলমান সমাজে মোহন মিয়ার খুবই সুনাম হয়। কেননা তখন বাইশরশির জমিদারদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহস কারো ছিল না। ১৯৩৭ সালে মোহন মিয়া প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। ওই সময়ে শেরেবাংলার কৃষক প্রজা পার্টি ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সঙ্গে বাংলা প্রদেশে এক কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। ওই মন্ত্রিসভায় এ কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী হন এবং প্রশাসন ও রাজনীতিতে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ওই মন্ত্রিসভা প্রদেশে অনেক গঠনমূলক কাজ করে। সেই সময় ফরিদপুরের অন্যতম নেতা মরহুম মৌলভী তমিজউদ্দিন খান প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় অন্যতম মন্ত্রী হন।
মরহুম খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইছমাইল, মরহুম আবদুস সালাম খান ও অন্য মুসলিম নেতাদের সহযোগিতায় ফরিদপুরে 'মুসলিম লীগ' সংগঠন গড়ে তোলেন এবং তিনি ফরিদপুর জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তখন থেকেই প্রাদেশিক মুসলিম লীগেও তিনি অন্যতম নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মোহন মিয়া ফরিদপুরের মুসলিম লীগের রাজনীতি করলেও নিজেকে মনে-প্রাণে সাম্প্রদায়িকতার ঊধর্ে্ব রেখেছিলেন। তিনি সুযোগ পেলেই হিন্দু বন্ধুবান্ধবের বাসায় বেড়াতে যেতেন এবং তাঁদের খোঁজখবর নিতেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যে গণ-আন্দোলন হয় তাতে মোহন মিয়া, সোহরাওয়ার্দী ও নুরুল আমিনের নেতৃত্বে এনডিএফ গঠনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং আইয়ুবের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, এ দেশের শিক্ষার জন্যও তাঁর দান কম নয়। তাঁরই নেতৃত্বে ফরিদপুর ময়েজউদ্দিন হাই মাদ্রাসা, হালিমা বালিকা বিদ্যালয় ও ফরিদপুর স্টুডেন্টস হোম প্রতিষ্ঠিত হয়। মোহন মিয়া সম্পর্কে বলতে গেলে অনেক কিছু বলার আছে। গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করি।
অ্যাডভোকেট ছরওয়ারজান মিয়া

No comments

Powered by Blogger.