সদ্য প্রয়াত কথাসাহিত্যিক রশীদ করীমের সাক্ষাৎকার

বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং প্রবন্ধকার রশীদ করীম। দেশবরেণ্য এ লেখক ২৫ নভেম্বর দিবাগত রাত ৩টায় প্রয়াত হয়েছেন। আমরা শোকাহত। রশীদ করীম জন্মগ্রহণ করেন কলকাতাতে ১৯২৫ সালের ১৪ আগস্ট।বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য রশীদ করীম ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ১৯৮৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া ১৯৬৯ সালে লাভ করেন আদমজী পুরস্কার।

তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে--  উত্তম পুরুষ, প্রসন্ন পাষাণ, আমার যত গ্লানি, মায়ের কাছে যাচ্ছি, সোনার পাথরবাটি,  সাধারণ লোকের কাহিনী, প্রেম একটি লাল গোলাপ, একালের রূপকথা, চিনি না, বড়ই নিঃসঙ্গ, লাঞ্চবক্স  ইত্যাদি।  ছোটগল্পের বই : প্রথম প্রেম।

এছাড়াও রয়েছে প্রবন্ধ-গবেষণাগ্রন্থ : আরেক দৃষ্টিকোণ, অতীত হয় নতুন ‍পুনরায়, মনের গহনে তোমার মুরতিখানি। স্মৃতিকথা : জীবন মরণ। ১৯৯২ সালে স্ট্রোক হওয়ার পর থেকে তিনি দীর্ঘদিন পক্ষাঘাতে  ভুগছিলেন। 

১৯৯২ সালের ১ নভেম্বর রশীদ করিমের ধানমণ্ডির বাসভবনে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেনঃ শহিদুল ইসলাম মিন্টু।
সদ্য প্রয়াত এ কথাসাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি পুনঃমুদ্রণ করা হলো।

লেখালেখির জগতে কীভাবে এলেন?

রশীদ করীম : আমাদের বাড়িতে অনেক আগে থেকেই লেখালেখি এবং লেখাপড়ার পরিবেশ ছিল। আমার সেজো ভাই আবু রুশদ লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন। ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, গোলাম কুদ্দুসসহ ঐ সময়ের অনেক লেখকই আমার সেজো ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন। এদের যাতায়াত ছিল আমাদের বাড়িতে। তাদের লিখতে দেখতাম। নিজে উৎসাহী হতাম বলা যায়।

আমি জন্মেছি সাহিত্যের প্রতি একটা প্রবৃত্তি নিয়ে, সাহিত্য সম্পর্কে একটা অনুরাগ নিয়ে। তাছাড়া আমার দাদার অর্থাৎআব্বার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল। সেখানেও বই দেখতাম। বই দেখলেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। তাই আমারও বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছিল।...

আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন ১৯৩৭ সাল। আমাদের ক্লাসের ছেলেরা উদ্যোগ নিল হাতে লেখা পত্রিকা বের করবে। ক্লাসের ফার্স্ট বয় বন্ধু-অরুণ ঘোষের অনুরোধে আমি সেখানে প্রথম গল্প লিখি। পরে এটি অন্য নামে শিশু সওগাতে প্রকাশিত হয়, গল্পটির নাম ছিল ‘চালাক ছেলে’ এবং এভাবেই মূলত লেখালেখির জগতে আমার প্রবেশ।

সাহিত্যের কোন মাধ্যমে লিখতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

রশীদ করীম : কবিতা কখনোই লিখিনি। যা লিখেছি তার মধ্যে বলতে পারো আগে গল্প লিখতাম, পরে উপন্যাস লিখেছি। এখন তো কলাম, প্রবন্ধ লেখা ছাড়া অন্য কিছুই করতে পারছি না।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা একাডেমী থেকে আপনার দুটো প্রবন্ধ সংকলন বেরিয়েছে। আমরা লক্ষ করছি, গল্প-উপন্যাস লেখার চেয়ে আপনি ধীরে ধীরে প্রবন্ধ লেখার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। আপনার কি মনে হয়?

রশীদ করীম : একদিক থেকে তোমার এই কথা ঠিক। আমাদের দেশে অসংখ্য দৈনিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকা বেরুচ্ছে। এসব পত্রিকা থেকে কলাম প্রবন্ধ লেখার অনুরোধ আসে। তাই বছর দুই থেকে নিয়মিত কলাম লিখছি এদের অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়ে যেমন কলাম বা প্রবন্ধ লিখছি, তেমন আর্থিক কারণেও লিখছি। ...এখন উপন্যাস লেখা একেবারেই হচ্ছে না। উপন্যাস লেখবার জন্য অভিনিবেশ লাগে। সৃজনধর্মী কাজ বলো, মগজের কাজ বলো, এসব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু উপন্যাসেই মনোনিবেশ করতে হয়। কেননা উপন্যাসের ক্ষেত্রে চরিত্র গঠন আছে, ঘটনার বিশ্লেষণ আছে, পরিবেশ তৈরি করার কাজ আছে, কাজেই এটা খুব সহজ কাজ নয়। এমনিতেই আমি ধীর লয়ে লিখি। তাই কলাম-প্রবন্ধ লিখছি বলেই উপন্যাসের প্রতি নজর দিতে পারছি না।

আমাদের দেশের কথাসাহিত্যের গতি প্রকৃতি আপনার কাছে কী রকম মনে হয়?

রশীদ করীম : এটা বলা মুশকিল। যা কিছু গল্প উপন্যাস লেখা হচ্ছে তার সব আমার পড়া নেই। সে কারণেই এ প্রশ্নের জবাব দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। তবে এতটুকু বুঝি, একটা ধারা আছে যারা জনপ্রিয়তার জন্য লিখছেন, কিংবা যা লিখছেন তাই জনপ্রিয় হচ্ছে। এদের লেখার ধরন ছক বাঁধা। এরা যা লিখেছেন তার সবটাই বই পড়া ঘটনার পুনঃবর্ণনা মাত্র। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যের এটি একটি ধারা। আবার কেউ কেউ আঞ্চলিক উপন্যাস লিখছেন। কেউ কেউ অতি প্রাচীন যুগের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়েছেন। যেমন শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন; আবার কেউ কেউ কী করছেন ঠিক বুঝতে পারছি না। যেমন মাহমুদুল হক। লেখার প্রতি যতটা একনিষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল, ততটা তিনি হননি। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনেকে লিখেছেন এবং এখনো লিখছেন, এটিও একটি ধারা।

গত দুই দশকে আমাদের কথাসাহিত্যের একটা বন্ধ্যাত্ব ভাব লক্ষ করা যায়। আপনার কী মনে হয়?

রশীদ করীম : মূলত আশির দশকে কথাসাহিত্য বন্ধ্যাত্ব লাভ করে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, শওকত ওসমান, আবু রুশ্দ, শাহেদ আলী, রাবেয়া খাতুন প্রমুখদের সাথে তুলনীয় লেখা ঐ দশকে হয়নি। আসলে দশক হিসেবে বিচার করা যায়ও না। পূর্বের দশকের অনেকেই এখনো লিখছেন। সে কারণে কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের কথাসাহিত্য গত দুই দশকে আরো পরিণত হয়েছে। আরো সমৃদ্ধ হয়েছে।

সত্তরের দশকে আমাদের সাহিত্যে বিশেষ করে ছোটগল্পে নিরীক্ষার নামে এক ধরনের দুর্বোধ্যতা, আবদ্ধতা, অস্পষ্টতা লক্ষ করা গেল। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, এই নিরীক্ষাধর্মী প্রক্রিয়াটি থেকে উত্তরণের চেষ্টা না করে বরং প্রক্রিয়াটিই বন্ধ হয়ে গেল। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

রশীদ করীম : নিরীক্ষাধর্মী ব্যাপারটা আসলে কী? নিরীক্ষার জন্য নিরীক্ষা! প্রশ্ন হলো, আমি কোনটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি? আমি একটা উপন্যাস লিখতে চাই। উপন্যাসের একটি বিষয় আছে। উপন্যাসের চরিত্রগুলো যদি উন্মাদ না হয়, তাহলে তাদের আচরণের একটি পরম্পরা আছে, সম্পৃক্ততা আছে, আমার লেখা হতে হবে সে রকম। কিন্তু নিরীক্ষার জন্য আমি যদি আমার আসল জিনিসকে, সৃজনশীলতাকে বিসর্জন দিই, সেটা তো কাম্য নয়। আমি চাচ্ছি সাহিত্য সৃষ্টি করতে, নিরীক্ষা করতে নয়। সাহিত্য সৃষ্টি করতে গিয়ে তার আসল বক্তব্য ও শৈল্পিক মানের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। ঘাড়ে নিরীক্ষা চাপিয়ে দিলে সাহিত্যের আসল জিনিসটাই নষ্ট হয়ে যাবে। নিরীক্ষাধর্মী কাজ তখনই করতে হবে, যখন মানুষের আধুনিক চিন্তা বিদঘুটে হয়ে যাবে, জীবনের ধারা অন্যরকম হয়ে যাবে। সে জীবনকে প্রকাশ করতে বিশেষ ধরনের এক ভাষা লাগবে। ঘটনার সংস্থাপন এক ধরনের হতে হবে, আঙ্গিককেও সে ধরনের হতে হবে। কিন্তু আমরা আধুনিক চিন্তা বা আচরণের সেই স্তরে না পৌঁছানোর কারণে নিরীক্ষার প্রশ্নটি অবান্তর।

শুধু গল্পের ক্ষেত্রে নয়, আমাদের সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও একটা নৈরাজ্যিক ভাব লক্ষণীয়। কেউ কেউ বলেন, এই নৈরাজ্যের কারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক। আবার কেউ কেউ বলেন অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততার কথা-- আপনি কি বলেন?

রশীদ করীম : সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নৈরাজ্য এই তিনটি বিষয় একত্রিত হয়েই সাহিত্যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। এগুলোতো আলাদা কোনো বিষয় নয়। এদের একটির সাথে আরেকটির সম্পর্ক বিদ্যমান। একটির প্রভাবে আরেকটি প্রভাবিত হয়।... সবখানে অস্থিরতা দেখেই মানুষের মনে অস্থিরতা জন্মলাভ করে, তুমি যাকে বলছ নৈরাজ্য। ফলে সাহিত্যে নৈরাজ্য তো আসবেই।

আমাদের দেশের গল্প-উপন্যাস লেখকের জন্য প্রকাশনা প্রক্রিয়া একটি বিরাট বাধা। আপনার কি তাই মনে হয়?

রশীদ করীম : হ্যাঁ, আমার তাই মনে হয়। আবার অনেক লেখকের দোরগোড়ায় প্রকাশকরা টাকা হাতে নিয়ে অপেক্ষাও করেন পাণ্ডুলিপির জন্য। আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রকাশকই সাহিত্যপ্রেমে ব্যবসায় নামেননি। নেমেছেন পয়সা রোজগারে। তারা সেসব বই-ই বেছে নেয় যেগুলোর কাটতি বেশি। যেগুলো বাজারে গরম পিঠার মতো বিক্রি হয়। ফলে সুস্থ ও রুচিবান সাহিত্যিকদের বই ছাপাতে প্রকাশকরা উৎসাহী হয় না। কেননা এদের পাঠক সীমিত অন্যদিকে উপন্যাস-গল্প যদি প্রকাশিত না হয় তাহলে সাহিত্যিকও লেখার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

রবীন্দ্র সাহিত্যের কোন মাধ্যম আপনার কাছে বেশি ভালো লাগে?

রশীদ করীম : রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান সবচেয়ে মহৎ সৃষ্টি। যদিও এটিকে গান হিসেবে ধরা হয়, কিন্তু, লেখা হয়েছে কবিতা হিসেবেই।

গল্পকে গল্প করে তোলার জন্য কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার?

রশীদ করীম : গল্পে থাকে মাত্র একটি ঘটনা। ঐ ঘটনা লেখকের মনে যে ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করে, যেভাবে তার মনে উপস্থিত হয়েছে, সেটাকে অনুসরণ করে পেছন দিক থেকে গল্প লেখা শুরু করতে হয়। পার্শ্ব পরিবেশ, প্রতিক্রিয়া হিসেবে কয়েকটি চরিত্রও সৃষ্টি করতে হয়।

তরুণ লিখিয়েদের লেখা পড়েন কি?

রশীদ করীম : শুধু তরুণ কেন, প্রতিষ্ঠিত অনেক লেখকের লেখাই পড়া হয়নি। বয়স হয়েছে তো, তাই পড়া সম্ভব হচ্ছে না।

অবসর সময়ে আপনি কী করেন?

রশীদ করীম : অবসরে গান শুনি। মাঝে মাঝে বই পড়ি। কলাম-প্রবন্ধ লিখি। চিন্তা করি। তবে ক্লাসিক বইগুলো খুব বেশি পড়ি।

বি:দ্র :--সাক্ষাৎকারটি ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায় ১৯৯২ সালরে ৫ নভেম্বর প্রকাশিত হয়। এখানে হামিদ কায়সার  ও  পিয়াস মজিদ সম্পাদিত ‘তরুণ আলোয় রশীদ করীম` (শুদ্ধস্বর ২০১১) বই থেকে সংগৃহীত।

No comments

Powered by Blogger.