চপেটাঘাত by মাহবুব মোর্শেদ

চারদিকে কত খুনোখুনি, কত রক্তপাত_ তোলপাড় করা নানা হত্যাকাণ্ড। কিন্তু সেসব নিয়ে যেন কারও ভ্রূক্ষেপ নেই। গোটা ভারত গতকাল মগ্ন ছিল একটা চড় নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলে মাওবাদী নেতা কিশেনজি নিহত হলেন। বৃহস্পতিবারের ঘটনা হলেও সে নিয়ে খুব বেশি কথাবার্তা ছিল না সংবাদমাধ্যমগুলোতে। কিশেনজির মৃত্যুর খবর গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু লোকের মুখে মুখে ফিরছিল সামান্য এক চড়ের ঘটনা।


কে, কাকে চড় মেরেছে? টেম্পোচালক হরবিন্দর সিং চড় মেরেছিলেন কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ারকে। কেন মেরেছেন? মন্ত্রী বা ভিআইপিদের ওপর হামলা হলে ধরেই নেওয়া হয় যে, তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই তা হয়েছে। নাশকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হামলা। কিন্তু টিভিগুলোর লাইভ প্রচারের দৌরাত্ম্যে দেখা গেল হত্যা বা মারাত্মক আহত করার উদ্দেশ্য হরবিন্দরের ছিল না। ছোট একটি চাকু হাতে থাকলেও তা ব্যবহার করেননি হরবিন্দর। বরং একটি চড় মেরেই রাগ প্রকাশ করেছেন। চড়টি মারার পর খোদ হরবিন্দরই শারদ পাওয়ারের নিরাপত্তারক্ষীদের প্রচণ্ড কিল-ঘুষির শিকার হয়েছেন। বেদম চড়চাপড় খেয়েছেন। মজার ব্যাপার, ঢিলটি সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পেলেও পাটকেলটি কিন্তু গুরুত্ব পায়নি। সবাই গুনে বলতে পারছেন, শারদ পাওয়ার একটি চড় খেয়েছেন। কিন্তু বদলে হরবিন্দর কতটি চড় খেয়েছেন সেটি কিন্তু কেউ গোনার প্রয়োজন মনে করছে না। তবে একটি চড়ই পুরো ভারতকে মাতিয়েছে। অনেকেই বিষয়টি নিয়ে রস করেছেন। রস করতে গিয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতা আন্না হাজারে তো বেফাঁস এক মন্তব্যই করে বসেছেন। চড়ের সংবাদ শুনে তিনি বলে বসেছেন, 'এক হি মারা কেয়া?' তিনি জানতে চেয়েছিলেন, চড় কি একটাই মেরেছিল কি-না। পরে অবশ্য সমালোচনা হওয়ায় তিনি দায়িত্বশীল বক্তব্য দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'সকালে একজন আমাকে খবরটা দেওয়ার পর আমি জানতে চেয়েছিলাম একটাই চড় মেরেছিল কি-না। সেটাকেই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। যিনি চড় মেরেছিলেন তিনি হয়তো রাগান্বিত ছিলেন। রাগ ভালো জিনিস নয়। সংবিধান সহিংসতা সমর্থন করে না।' শারদ পাওয়ার চড় খেয়েছেন শুনে আন্না হাজারে হয়তো সত্যিই জানতে চেয়েছিলেন চড় কতটি পড়েছে? কিন্তু ভারতের অনেক আম আদমি এতে খুশি হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বল্গাহারা গতিতে চড়ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ত্রাহি রব চারদিকে। মানুষ কতটা অসহায় তার পুরো সংবাদ গণমাধ্যমে আসে না। আসলে সে সংবাদের নানা মাত্রা থাকে। হরবিন্দর সিংয়ের পকেটের হিসাব মিলছে না কিন্তু বাজারের নীতি, প্রবৃদ্ধি, ভর্তুকি নানা হিসাবে শেষ পর্যন্ত হরবিন্দরদের পকেটের হিসাব হারিয়ে যায়। তো হরবিন্দর ঠিক করেছেন, খবরটা জানানো দরকার আলাদা করে। আর সে কারণেই বাসা থেকে বেরিয়েছেন মন্ত্রীকে চড় কষাবেন বলে। ঝাঁকের মধ্যে মিশে গিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় বসে থেকেছেন। সুযোগ পেয়ে মেরে দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মন্ত্রীকে এভাবে অপমান করা ঠিক নয়। আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সংবিধানও এটা সমর্থন করে না। কিন্তু এর তো একটা বার্তাও আছে। হরবিন্দর যে বার্তাটা পেঁৗছে দিতে চাইলেন তার সমাধান না করে যদি তাকে আলাদা করে শাস্তি দেওয়া হয় তবে সেটি কেমন হবে? ভারতীয় মিডিয়াগুলোতে এ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বোঝা যাচ্ছে, হরবিন্দর এখন নায়ক। অনেকেই স্মরণ করছেন জর্জ বুশের দিকে জুতা ছুড়ে মারা সেই ইরাকি সাংবাদিকের কথা। সে ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। গুণে-মানে হয়তো এটি অনেক ছোট। কিন্তু হরবিন্দরের নাম অনেকেই যে মনে রাখতে চেষ্টা করবেন, তা নিশ্চিত।

No comments

Powered by Blogger.