নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন-ডান্ডিবাসীর যন্ত্রণা অশেষ, অনেকের ভরসাস্থল মেয়র by অমিতোষ পাল ও দিলীপ কুমার মণ্ডল,

ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের সাইনবোর্ড মোড় দিয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে এগোলেই চোখে পড়ে বিশাল ফটকে লেখা 'স্বাগতম নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন'। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এখান থেকেই শুরু হয়েছে নতুন এ করপোরেশনের এলাকা। কিন্তু ফটক পার হলেই নাকে আসে উৎকট দুর্গন্ধ। নাড়িভুঁড়ি মোচড় দেওয়ার জোগাড়। দুর্গন্ধের উৎস রাস্তার পূর্ব পাশে রাখা ময়লার স্তূপের সারি। পুরো শহরের ময়লা ফেলা হচ্ছে ওই জালকুড়ি এলাকায়।আরো একটু এগোলেই আরেক বিপদ। রাস্তার অবস্থা এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছে যে সড়ক বিভাজকের একপাশে যানবাহন চলাচল এখন বন্ধ।


আরেক লেন দিয়ে দুদিকের যানবাহন চলতে গিয়ে সর্বক্ষণ লেগে থাকছে তীব্র যানজট। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া পর্যন্ত পেঁৗছাতে এ অবস্থা। জানা যায়, এখানে রোদ হলে একহাঁটু ধুলো আর বৃষ্টি হলে একহাঁটু কাদা জমে।
মালয়েশিয়া প্রবাসী নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের বাসিন্দা গৌতম রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বিদেশে থাকলেই দেশে আসতে মন চায়। আবার বাড়িতে এলেই নারায়ণগঞ্জের যে চেহারা দেখি তখন মনে হয়, যেতে পারলেই বাঁচি।'
নারায়ণগঞ্জে কয়েক দিন ঘুরে এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত এ শহরে নাগরিক সমস্যার অন্ত নেই। মৃত্যুর পরও যেন এ যন্ত্রণার শেষ নেই। কারণ এখানে লাশকাটা ঘর নেই। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ পাঠাতে হয় মুন্সীগঞ্জে, নরসিংদী বা ঢাকার কোনো হাসপাতালে। বিদ্যমান দুটি হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় সেবা পায় না এলাকাবাসী। দুই যুগ ধরে শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণের কথা শোনা যাচ্ছে। সেটিও কবে নির্মাণ করা হবে, তা জানে না নগরবাসী। শিশুদের চিত্তবিনোদনের জন্য কোনো পার্ক নেই। দুটি খেলার মাঠ থাকলেও সাধারণ কিশোর-যুবকদের জন্য নয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভিড় করা ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। এসব কারণেই ইভ টিজিং বা মাদক সমস্যা বাড়ছে বলে মনে করেন অনেকে। নগরজুড়ে আরো আছে তীব্র যানজট। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জবাসীকে বিদ্যুৎ, পানি, জলাবদ্ধতা, গ্যাস সংকটের মতো নানা নৈমিত্তিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও আধুনিক নারায়ণগঞ্জ বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক বুলবুল চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'নারায়ণগঞ্জে তো সমস্যার অন্ত নেই। আশা করব, যিনি নতুন মেয়র হবেন, তিনি এসব সমস্যার সমাধান করবেন।' তিনি আরো বলেন, নারায়ণগঞ্জে আন্তর্জাতিক মানের মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নতুন প্রজন্মের দাবি। যে কয়টি কলেজ নারায়ণগঞ্জে আছে, তাতে ভর্তি-বাণিজ্য চলে। নতুন মেয়র সংকীর্ণতার বাইরে বেরিয়ে জনগণের জন্য কাজ করলে নারায়ণগঞ্জের অনেক সমস্যারই সমাধান করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয় লোকজন জানায়, ১৮৭৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জকে পৌরসভা করা হয়। সেই প্রাচীন আমল থেকেই এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের গোড়াপত্তন ঘটে। শীতলক্ষ্যার পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠে নানা শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। হোসিয়ারি ও পাট শিল্পের জন্য নারায়ণগঞ্জের সুনাম বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়ে। কালের বিবর্তনে পাট শিল্প প্রায় হারিয়ে গেলেও হোসিয়ারি শিল্পের অস্তিত্ব এখনো রয়ে গেছে। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে গার্মেন্ট, রড, লবণ, সুতা, চিনি, আটা, গম, ইট, সিমেন্ট প্রভৃতি শিল্প কারখানা। কিন্তু বিদুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে এসব শিল্পের অস্তিত্ব এখন হুমকির সম্মুখীন।
বিকেএমইএর সহসভাপতি মো. হাতেম জানান, নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৮০০ নিট গার্মেন্ট রয়েছে। গত অর্থবছরে এ শিল্পে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ ছিল ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এ শিল্প চালু রাখতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি বলেন, 'নারায়ণগঞ্জে এমন কোনো আবাসিক হোটেল পাওয়া যাবে না যেখানে শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও টেলিভিশন আছে। এখানে নেই কোনো বার। ফলে বিদেশি বায়ার (ক্রেতা) এসে এখানে দু-এক দিন যে থাকবে, সে রকম কোনো ব্যবস্থা নেই। আবার রাজধানী থেকে নারায়ণগঞ্জের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার হলেও কখনো কখনো আসতে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।' নতুন মেয়র ও সরকারকে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখার অনুরোধ জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জের জামতলা এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বাদল ক্ষোভের সঙ্গে জানান, '১৯৮২ সালের দিকে জাপানের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে ২০০ শয্যা হাসপাতাল গড়ে ওঠে। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, এ হাসপাতাল থেকে জনগণ আধুনিক মানের সেবা পাবে। ২৯ বছর পরও এ হাসপাতালের যে করুণ অবস্থা, এটিকে এখন রেফার্ড হাসপাতাল না বলে উপায় নেই।' তিনি বলেন, 'কারো ফোড়া হলেও এ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ রোগীকে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেয়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল থেকেও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যায় না।'
বঙ্গবন্ধু সড়কের ব্যবসায়ী মোদাচ্ছের হোসেন দুলাল জানান, 'দেশের জাতীয় গ্রিডে নারায়ণগঞ্জ থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎই বেশি যুক্ত হচ্ছে। অথচ আমরা বিদ্যুৎ পাই না।' দুলাল বলেন, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর সংযোগকারী বোর্ড খালটি ভরাট হয়ে গেছে। এ খাল দখল করে অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় শহরে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তফা কবীর বলেন, ৩০ বছর আগেও এ খাল দিয়ে শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর পণ্যবাহী নৌকা চলত। পরবর্তী সময়ে পৌরসভার পক্ষ থেকে ময়লা-আবর্জনা ফেলে খালটি ভরাট করা হয়েছে। এমনকি পৌরসভার উদ্যোগেই ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করার চেষ্টা চলছে।
শহরের গলাচিপা এলাকার গৃহিণী বেদানা রানী মণ্ডল বলেন, 'এ শহরে চলাচল করতে বড়ই ভোগান্তি পোহাতে হয়। যানজট, রিকশা, ইজিবাইক, ধুলোবালির যন্ত্রণায় মনে হয় না কোথাও যাই। সন্ত্রাস ও মাদক ব্যবসাও আছে অনেক এলাকায়।'
শহরের দেওভোগ এলাকার বাসিন্দা মাসুদুর রহমান খসরু বলেন, রাজধানীর এত কাছে অবস্থান। এর পরও নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজারো সমস্যা। এখন যানজটের শহর বললে ভুল বলা হবে না। এখানে পরিকল্পনার কোনো ছাপ নেই। তাঁর মতে, নারায়ণগঞ্জে আধুনিক মানের মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক স্থাপন করা খুবই জরুরি। তবে সবচেয়ে আগে নজর দিতে হবে যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের দিকে।

No comments

Powered by Blogger.