আলোচনা- 'এখনো একটি গ্রেট গেইম অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক' by এম আবদুল আজিজ

নবিংশ শতাব্দীতে হিমালয় অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ার ক্ষুদ্ররাজ্য পুণ্ড্র তাদের কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্ব দিয়ে তৎকালীন তিনটি সাম্রাজ্যকে প্রচণ্ডভাবে আকর্ষণ করেছিল। ওই অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্রিটিশ এবং রুশরা তখন গ্রেট গেইম নামে অভিহিত এক রাজনৈতিক খেলায় মেতে ওঠে। বলা হয়ে থাকে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আর্থার কোনালি গ্রেট গেইম অভিধার উদ্ভাবক, যদিও পরবর্তী সময়ে তা রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর 'কিম' শীর্ষক উপন্যাসে অমরত্ব পেয়েছিল।
এই অভিধা এবং যে অঞ্চলের জন্য তা উদ্ভাবিত হয়েছিল কালক্রমে তার বিলুপ্তি ঘটে। রাজনৈতিক বিতর্ক এবং আলোচনা থেকেও তা ক্রমেই মুছে গিয়েছিল। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধোত্তর সময়ে আবার প্রসঙ্গটি পুনর্বাসিত হয়েছে এবং বৈশ্বিক রাজনীতির রাডারের পর্দায় তার দেখা মিলছে। সেলিগ হ্যারিসন তাঁর ২৬ আগস্টের নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধ 'China's discreet hold on Pakistan's Northern borderland'-এ উলি্লখিত অঞ্চলটিতে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) ১১ হাজার সৈন্যের উপস্থিতির কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বিশালাকার চীন অচিরেই এ অঞ্চলের স্ট্র্যাটেজিক গিলগিট-বাল্টিস্তান গ্রাস করে ফেলবে। উল্লেখ্য, নিবন্ধকার হ্যারিসন বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল পলিসি সেন্টারে 'এশিয়া' প্রোগ্রামের পরিচালক এবং নিজে একজন দক্ষিণ এশিয়াবিশেষজ্ঞ।
এ ছাড়া ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষা এবং বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিং ২৫ সেপ্টেম্বর গার্ডিয়ানে লিখেছেন, জল, স্থল এবং কাঁচামালের জন্য বুভুক্ষু একটি চীন এখন হিমালয় অঞ্চলে অনুপ্রবেশে তৎপর। ফলে দেশটি ভারতকে সরাসরি তার সীমা লঙ্ঘনের চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। এদিকে গিলগিট-বাল্টিস্তানে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক এবং রাজনীতির পণ্ডিতদের মধ্যে চাঞ্চল্য 'গ্রেট গেইম'-এর পুনরাবির্ভাবের প্রমাণ। গ্রেট গেইম নিয়ে নবোদ্ঘাটিত আগ্রহ ও চাঞ্চল্য পিটার হপকিক-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ যা তিনি তাঁর 'The great game : the struggle for empire in Central Asia' শীর্ষক নিবন্ধে দিয়েছেন তার সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ। হপকিকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী গত ১০০ বছরে গ্রেট গেইমের মৌলিক কোনো কিছুই পরিবর্তিত হয়নি। তাঁর ভাষায়, 'The great game is still ominously topical.' (গ্রেট গেইম এখনো অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক)।
গ্রেট গেইমের নতুন সংস্করণে একটি পরিবর্তনই শুধু পরিলক্ষিত হয়। তা হলো, এতে খেলোয়াড়দের সংখ্যা বৃদ্ধি। নতুন খেলোয়াড়রা স্পষ্টতই ভারত, পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্র। এরা সবাই এখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খেলায় জড়িয়ে পড়েছে।
গিলগিট-বাল্টিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে একটি কেন্দ্রিক (Pivotal) ভূকৌশলগত গুরুত্বের উপাদান। এ কারণেই গ্রেট গেইমের নতুন সংস্করণ পুরো অঞ্চলে একটি গভীর প্রত্যাহতির (repercussion) উদ্ভব ঘটাতে পারে। এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে চলমান কারাকোরাম মহাসড়ক পিএলএ এবং পাকিস্তান আর্মির প্রকৌশলীরা যৌথভাবে নির্মাণ করেছিল। চীনারা এখন এ সড়কের শুধু মানোন্নয়নই করছে না, ওই অঞ্চলের আরো একাধিক প্রকল্পেও তারা কাজ করছে।
এ অঞ্চলে চীনাদের উদ্যোগ কোনো মতাদর্শপ্রসূত নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রণোদনাই তাদের কর্মস্পৃহার উৎস। এ পর্যন্ত এ অঞ্চলে চৈনিক তৎপরতা অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ। আর্থসামাজিক উন্নয়নে এখনো তাদের কোনো তৎপরতা পরিলক্ষিত হয় না। অথচ পশ্চিমা যে শক্তিগুলো এখানে আর্থসামাজিক সেক্টরে কাজ করছে, তারা তা এনজিওগুলোর সাহায্য ও সহযোগিতাতেই করছে। উল্লেখ্য, অবকাঠামো নির্মাণে তাদের আগ্রহ কম।
এখনো স্পষ্ট নয়, অবকাঠামো নির্মাণ বা আর্থসামাজিক অবদান এর কোনোটি এসব কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়দের একটি অনুকূল অবস্থানে নিয়ে যাবে। তবে এ অঞ্চলের জনগণের একবার স্পষ্টতা অবশ্যই থাকতে হবে।
কেননা গ্রেট গেইমে স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক স্বার্থ একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। এ খেলা এতই জটিল এবং দুর্বোধ্য যে এখানে বিভিন্ন পর্যায়ের স্বার্থের সীমারেখা নির্ধারণ অসম্ভব। গিলগিট-বাল্টিস্তানের জনগণের জন্য ঝুঁকির পরিমাণ সর্বাপেক্ষা বেশি এ জন্য যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও তো তাদের অবস্থান খুব একটা স্পষ্ট নয়। গিলগিট-বাল্টিস্তান এখনো পাকিস্তানের সাংবিধানিক চৌহদ্দির বাইরে এবং এখানকার কারো পাকিস্তানের পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব নেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই এখানকার কোনো ব্যাপারেই ইসলামাবাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো ক্ষমতা নেই।
অতীতে গ্রেট গেইম সংঘটিত হওয়ার সময় গ্রেট গেইমের খেলোয়াড়রা স্থানীয় শাসক বা গিলগিট-বাল্টিস্তানের বিভিন্ন উপত্যকার অভিবাসী বা সর্দারের সঙ্গে প্রয়োজনমতো যুদ্ধ বা দরকষাকষিতে লিপ্ত হয়েছে। যেহেতু স্থানীয় ও জনগণের স্বার্থ স্থানীয় সামাজিক বিন্যাস এবং সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত ছিল, তাই স্থানীয় জনগণ কদাচিৎ কোনো বহিঃশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছে। দুর্ভাগ্য, এখন আর আগের সামাজিক বন্ধন নেই বলে স্থানীয় জনগণের স্বার্থের অনুকূলে অবস্থান নেওয়ারও কেউ নেই।
এ ছাড়া বহিঃশক্তিবর্গের স্বার্থের সমকেন্দ্রিকতা এবং একই পরিসরে সার্বক্ষণিক অস্থিরতাও আরো কোনো খেলোয়াড়ের পথ প্রশস্ত করতে পারে এমন একটি খোলা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। গিলগিটের ধর্মগোষ্ঠীগত সহিংসতা প্রায় নিরন্তর সংঘটিত চোরাগোপ্তা হত্যা এবং পরিবার জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাগতভাবে জনগণের পৃথক্করণ নতুন গ্রেট গেইমের বৃহৎ ক্যানভাসের ক্ষুদ্রাংশ। গ্রেট গেইম থেকে উৎক্ষিপ্ত অগি্নস্ফুলিঙ্গ থেকে গিলগিট-বাল্টিস্তান বাঁচাতে অনিবার্যভাবে যা করতে হবে তা হলো এখানকার অধিবাসীদের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করা। এ লক্ষ্যে কোনো দায়সারা পদক্ষেপ নিলে তা হবে জনগণকে নতুন গ্রেট গেইমের ক্ষমতার রাজনীতির শিকারে পরিণত করার নামান্তর।
====================
গল্পসল্প- জীবন ঢেকে যাচ্ছে বালুতে  প্রকৃতি- কোপেনহেগেন থেকে কানকুনঃ সময় এসেছে মুহূর্তটিকে কাজে লাগানোর by জেমস এফ মরিয়ার্টি  আলোচনা- দরিদ্র মানুষের পাঁজরের ওপর দুর্দান্ত পাজেরো  বিএনপির মিছিলে পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের পিটুনি  খবর কালের কন্ঠের- হরতালের ধরপাকড় চলছেই  খবর- খুনের মামলা প্রত্যাহার, শীর্ষ সন্ত্রাসীর অব্যাহতি by নজরুল ইসলাম  প্রকৃতি- চট্টগ্রামে ঐতিহ্যের পাহাড় কেটে বহুতল ভবনঃ সুরক্ষার পরিকল্পনা ধ্বংসের অনুমোদন  প্রকৃতি খবর- জলবায়ু সম্মেলন আজ শুরু  রাজনৈতিক আলোচনা- 'পুলিশই কি হরতাল সফল করে দেয়' by আবেদ খান  আইন কানুন- 'বাহাত্তরের সংবিধান ফিরছে না' by আহমেদ দীপু  আইরিন খান বললেন,'নারীর মানবাধিকার রক্ষায় আরও সক্রিয় হতে হবে' সুত্র প্রথম আলো  আইন কানুন- চাই বিরোধের বিকল্প নিষ্পত্তি by রোমেল রহমান  আইন কানুন- ভরণপোষণ একটি আইনি অধিকার by মাসূমা তাসনীম  আইন কানুন- অর্থঋণ আদালত আইনে অনেক গলদ by এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম  আইন কানুন- গাড়ি আটক হলে মালিকের করণীয় by মো. রাশেদ খান  যুক্তি তর্ক গল্পালোচনা- 'আমাদের রাজনীতিতে বখাটেপনা' by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম  স্মরণ- 'আমরা তো কাঁদছিই' by নেয়ামতউল্যাহ  চিত্রকলা- এক পরিবারের বৃক্ষ ও শেকড় সুত্র প্রথম আলো  গল্পসল্প- 'ঢাকা নয়, অন্য কোথা অন্য কোনোখানে' by উম্মে মুসলিমা  কৃষি আলোচনা- 'বরেন্দ্রভূমির কৃষকের বীজবিদ্রোহ' by পাভেল পার্থ


দৈনিক কালের কন্ঠ এর সৌজন্যে
লেখকঃ এম আবদুল আজিজ
সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস ও কলামিস্ট


এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.