ব্যাটিংয়ের নতুন কান্ডারি জিয়া by মোঃ মামুন রশীদ

ক্রিকেটের ক্ষুদ্রতম ফরমেট টি২০। মার মার কাট কাট মনোভাব এবং ব্যাটিংয়ে আগুন ঝরানোর মতো ক্রিকেটার ক’জনই বা আছেন বিশ্বে। তবে এমনটাই মূল যোগ্যতা বিচার করে টি২০ ক্রিকেটে। ব্যাট হাতে নিজের বিধ্বংসী মনোভাব দেখিয়ে ২০০৭ সালেই নজর কেড়েছিলেন খুলনার ক্রিকেটার জিয়াউর রহমান।


‘ধরো তক্তা মারো পেরেক’ ধরনের নীতিতেই বিশ্বাসী তিনি। এ কারণেই ২০০৭ সালের প্রথম বিশ্বকাপ টি২০ আসরের বাংলাদেশ জাতীয় দলের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেন এ পেসার অলরাউন্ডার। তবে ওই সময় শুধু বোলিংয়ের কারণেই দলে সুযোগ হয়েছিল তাঁর। অবশ্য একটি ম্যাচেও খেলার সুযোগ হয়নি। আর ২০০৯ সালে মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) একাদশের হয়ে ম্যাচ খেলার সময় গোড়ালির ইনজুরিতে পড়েন। ভয়াবহ ওই ইনজুরির পর পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লেগেছে প্রায় দুই বছর। তবে একটুও হতাশায় ভোগেননি। বরং ফেরার পর ক্রমেই ব্যাটসম্যানও হয়ে ওঠেন। চলতি বছর প্রথম বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে (বিপিএল) চট্টগ্রাম কিংসের হয়ে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন। সিলেট রয়্যালসের বিরুদ্ধে দু’টি বিস্ফোরক (৪৮ ও ৪০) ইনিংস খেলে নজর কাড়েন জিয়া। ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যাট-বলে একেবারে কার্যকর অলরাউন্ডার হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পুরস্কারও মিলেছে। জাতীয় দলের টিকেট হাতে পেয়েছেন আরেকবার। জুনে জিম্বাবুইয়েতে ত্রিদেশীয় টি২০ সিরিজের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় দলে আবারও সুযোগ পান ২৫ বছর বয়সী খুলনার এ ডানহাতি ক্রিকেটার। ব্যক্তিগত জীবনের অনেক সঙ্কট মোকাবেলা করে জিয়ার স্বপ্ন ছিল দলের হয়ে খেলে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করা। ক্রিকেটের হাতেখড়ি ওয়াহিদুজ্জামান সেলিমের কাছে। খুলনার এ কোচের প্রতি নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন জিয়া তাঁকে একজন ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। তবে সেই সঙ্গে নতুন করে ফেরার জন্য ওল্ড ডিওএইচএস কোচ ও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজনের অবদানকে অনস্বীকার্য বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর অনুপ্রেরণায়ই পেসার অলরাউন্ডার থেকে জিয়া হয়ে উঠেছেন অন্যতম বিধ্বংসী ব্যাটিং অলরাউন্ডার। বরাবরই দেখা গেছে লোয়ার অর্ডারে বাংলাদেশের চরম ব্যাটিং ব্যর্থতা। কিন্তু জিয়া দলে ঢোকার পর আপাতত টি২০ ফরমেটে তাঁর কাছ থেকে রান পাচ্ছে দল। নিজেকে টি২০ ফরমেটের অন্যতম একজন উপযুক্ত ব্যাটসম্যান হিসেবে ইতোমধ্যে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত অফিসিয়াল কিংবা আনঅফিসিয়াল মিলিয়ে মোট ১৪ টি২০ খেলেছেন তিনি। আর প্রতিটি ম্যাচেই তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে অন্তত একটি করে ছক্কা। টি২০ ক্রিকেটের প্রাণই তো এই ছয়ের মারগুলো। আর সে বিষয়ে একেবারেই পারঙ্গম হয়ে উঠেছেন জিয়া। আন্তর্জাতিক টি২০ খেলেছেন এখন পর্যন্ত ৬টি। ২১.২৫ গড় আর ১৭০.০০ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ৮৫ রান। মাত্র ৩ বাউন্ডারি হাঁকালেও ছক্কার মার এসেছে তাঁর ব্যাট থেকে ৮টি। সাধারণত ৬ অথবা ৭ নম্বরে ব্যাটিং করা জিয়ার সর্বোচ্চ ইনিংস অপরাজিত ৪০ রানের। বেলফাস্টে ১৮ জুলাই মাত্র ১৭ বলের ওই বিধ্বংসী ইনিংসে তিনি কোন চার না মারলেও বল উড়িয়ে মেরেছিলেন ৫টি। তিনি টি২০ ক্রিকেটের উপযুক্ত একজন বিগ হিটার তার প্রমাণটা হাড়ে হাড়েই পেয়েছিল আইরিশরা। এছাড়া বাকি আনঅফিসিয়াল ম্যাচগুলোতেও ব্যাটের আগুন টের পাইয়েছেন প্রতিপক্ষ বোলারদের। বড় রান তাড়া করতে গিয়ে বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশের শেষ আশা যে তিনিই এটাও এখন ভরসা করেন বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।
২০০৭ টি২০ বিশ্বকাপের দলে জিয়া জায়গা পান একজন পেসার অলরাউন্ডার হিসেবে। তবে খেলতে পারেননি একটি ম্যাচও। ৫ বছর পর ফিরলেও এবার একাদশে খেলেছেন। এ বিষয়ে আত্মবিশ্বাসও ছিল তাঁর। জিয়া ওই সময় বলেছিলেন, ‘আমি তো মনে করি আমার সুযোগ পাওয়া উচিত। অন্তত সুজন ভাই আমাকে যেভাবে গড়ে তুলেছেন এবং তাঁর আস্থার মূল্য দিতে পেরেছি এবার জাতীয় দলের হয়ে খেলবই।’ তবে ওই সময় পেসার অলরাউন্ডার হিসেবে জায়গা পেলেও এবার সুযোগ পেয়েছেন ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে। সেই গল্পটাও করলেন জিয়া সুজনকেই কৃতিত্ব দিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি ইনজুরিতে পড়ার পর মূলত বোলিং করা কমিয়ে দেই। কিন্তু সুজন ভাই আমাকে ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দিতে বলেন। এছাড়া আমার সামর্থ্য বুঝেছেন তিনিই। এ কারণে বিপিএলে তিনি আমাকে চট্টগ্রামে নেন এবং হঠাৎ এক ম্যাচে বলেন তুমি কি উদ্বোধন করতে পারবে? আমি রাজি হই। তিনি আমার ভেতরে ব্যাটিং করার ক্ষমা দেখেছেন বলেই ওমন প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আল্লাহর রহমতে আমি তাঁর আস্থার সম্মান রাখতে পেরেছি। তবে আমি এখনও নিজেকে একজন পেসার অলরাউন্ডার মনে করি।’ জিয়া জানিয়েছিলেন বিগ শট খেলতে অনেক বেশি পছন্দ করেন তিনি। সেই সঙ্গে ইনজুরির কারণে দুই বছর ক্রিকেট থেকে বাইরে থাকলেও সেটা অনেক ভাল হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। কারণ এর মধ্যে ব্যাটিংটা আরও ভাল করে শিখতে পেরেছেন সুজনের অনুপ্রেরণায়। তিনি বলেন, ‘সব সময় পাশে থেকে আমাকে মানসিক সমর্থন দিয়েছেন ওয়াহিদুজ্জামান সেলিম। কিন্তু সুজন ভাই আমাকে সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে এনেছেন। আমার মনে হয় আমি এখন আগের চেয়ে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী। এখন আমি ওই ইনজুরিকে আশীর্বাদ বলে মনে করি। আর বিপিএলের নৈপুণ্যই আমাকে জাতীয় দলে ঢোকার পথ করে দিয়েছে বলেই মনে করি। এখন লক্ষ্য ভাল কিছু করে দলে নিয়মিত হওয়া।’ এখন নিয়মিতই হয়েছেন জিয়া। শেষ মুহূর্তে ব্যাট করতে নেমে টেলএন্ডার হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন তার পুরোপুরিই করে যাচ্ছেন প্রতিটি ম্যাচেই। প্রতি ম্যাচেই অন্তত গড়ে ২০/২৫ রান আসছে তাঁর ব্যাট থেকে দেড় শ’র বেশি স্ট্রাইক রেটে। আর টি২০ ক্রিকেটের জন্য এটা বেশ জরুরী। তাঁর প্রশংসা ঝরেছে সতীর্থদের মুখেও। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার শাকিব আল হাসানসহ সাবেক ক্রিকেটাররাও জিয়াকে নিয়ে ভাল কিছুই পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। সেটাই করে যাচ্ছেন তিনি। আর পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান হয়ে যাওয়া জিয়া বর্তমানে বোলিংটাই ভুলতে বসেছেন। ৬ টি২০ খেলা জিয়া এখন পর্যন্ত মাত্র ১ ওভার বোলিং করেছেন। এরপরও একাদশে নিয়মিত সদস্য জিয়া। এর কারণ ব্যাটিংয়ে অগ্নিমূর্তি। ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে টি২০ বিশ্বকাপের চতুর্থ আসর। গ্রুপপর্বে বাংলাদেশকে ‘ডি’ গ্রুপে লড়তে হবে শক্তিশালী পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। আর ক্ষুদ্র ফরমেটের এ ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রাথমিক লক্ষ্য সুপার এইটে ওঠা। টানটান উত্তেজনায় ঠাসা এবং চার-ছক্কার বাহারি মারে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে শেষ মুহূর্তে জ্বলে ওঠার অন্যতম ভরসার প্রতীক জিয়া। দলকে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে দারুণ কিছু উপহার দেবেন এমনটাই প্রত্যাশা বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমী ভক্ত-সমর্থকদের। আর টি২০ ক্রিকেটের ইতিহাস বলে একটি বল কিংবা একটি ওভারেই পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। সেটা বাংলাদেশের পক্ষে পাল্টানোর অন্যতম ভূমিকায় থাকবেন জিয়া এমন আশা তিনিই জুগিয়েছেন। এখন সেটা সর্বোচ্চ ক্রিকেট আসরের ময়দানে প্রমাণের দায়িত্ব জিয়ারই।

No comments

Powered by Blogger.