‘আলীম জয়পুরহাটে রাজাকার নিয়োগের দায়িত্বে ছিলেন’

বিএনপির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল সোমবার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, জয়পুরহাটে আলীমের বাড়িতে রাজাকার নিয়োগের (রিক্রুটমেন্ট) ক্যাম্প ছিল। রাজাকার নিয়োগের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।


বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি রানা দাশগুপ্ত এবং এ কে এম সাইফুল ইসলাম ৪২ পৃষ্ঠার এই লিখিত সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। পরে ৬ আগস্ট এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
শারীরিক কারণে জামিনে থাকা আলীমের উপস্থিতিতে সূচনা বক্তব্যে রাষ্ট্রপক্ষ বলে, ১৯৭১ সালে আবদুল আলীম তৎকালীন জয়পুরহাট মহকুমায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সেখানে শান্তি কমিটি গঠিত হয়। এই শান্তি কমিটি পরে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়। পাকিস্তানি মেজর আফজালের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন আলীম। তিনি জয়পুরহাট রোডের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শাওনলাল বাজলা (মৃত) ও তাঁর পরিবারকে হত্যার হুমকি দিয়ে তাঁদের দেশছাড়া হতে বাধ্য করেন এবং শাওনলালের বাড়িঘর, দোকান, ধানের চাতাল, গদিঘর দখল করে সেখানে রাজাকারের কার্যালয় ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, আলীম পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে জয়পুরহাটের সব থানায় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, হিন্দুসম্প্রদায়সহ সাধারণ মানুষকে হত্যা, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন। মানবসভ্যতার ইতিহাসে ভয়ংকরতম অপরাধ যারা করেছে, তাদের যদি শাস্তি দেওয়া না হয়, তবে সেটি হবে অন্যায় ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সূচনা বক্তব্যের পর ট্রাইব্যুনাল বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণিত হয়েছে এবং আবেগ দিয়ে লেখা, যা হূদয় ছুঁয়েছে। কিন্তু আদালত সব আবেগের ঊর্ধ্বে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাইব্যুনালকে উভয় পক্ষ সহযোগিতা করবেন।
এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী এ ই এম খলিলুর রহমান আসামিপক্ষের সাক্ষীর তালিকা ও নথি উপস্থাপনের জন্য সময়ের আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল এই আবেদন গ্রহণ করে ৬ আগস্ট আসামিপক্ষের সাক্ষীর তালিকা ও নথি উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন। একই দিন রাষ্ট্রপক্ষকে প্রথম সাক্ষী হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলায় প্রথম সাক্ষীকে জেরা শেষ: একই ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী মোজাফফর আহমেদ খানকে আসামিপক্ষের জেরা গতকাল শেষ হয়। আসামির কাঠগড়ায় কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী একরামুল হক সাক্ষীকে তৃতীয় দিনের মতো জেরা করেন।
ঘাটারচর কেরানীগঞ্জে কি না—একরামুল হকের এ প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, ঘাটারচর কেরানীগঞ্জে। একাত্তরে আপনাদের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প কোথায় কোথায় ছিল—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দ্বিতীয় ক্যাম্প হাজি ইউসুফ আলীর বাড়িতে, তৃতীয় ক্যাম্প নাজিরপুরে মোবারকের বাড়িতে এবং চতুর্থ ক্যাম্প ছিল নিমতলী গ্রামের চিকিৎসক করিম সাহেবের বাড়িতে।
জেরার শেষপর্যায়ে আইনজীবী মত দেন, যেহেতু সাক্ষী আওয়ামী লীগ করেন এবং আসামি কাদের মোল্লা জামায়াত নেতা, তাই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছেন। জবাবে মোজাফফর আহমেদ বলেন, এটা সত্য নয়।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পুনর্বিবেচনার বিষয়ে আদেশ ১৫ জুলাই: জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনের বিষয়ে ১৫ জুলাই আদেশের দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। শুনানি শেষে গতকাল এ দিন ধার্য করা হয়।
শুনানিতে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক বলেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগে কেবল একটিতে আসামিকে আলবদর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু গঠিত অভিযোগে তাঁকে সব কটিতে আলবদরের নেতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটা যদি সংশোধন করা না হয়, তবে আসামি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আসামির জীবনবৃত্তান্ত ও পদবি থেকে আমরা দেখেছি, তিনি আলবদর নেতা ছিলেন। যত দিন তিনি থাকবেন, পদবি থেকে যাবে। তাই তাঁকে আলবদর বলা হয়েছে।’ এ পর্যায়ে আবদুর রাজ্জাক আরও কিছু বিষয় সংশোধনের আবেদন জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সাক্ষীর জবানবন্দি, বিভিন্ন তথ্য ও নথি থেকে ট্রাইব্যুনাল যেটি সঠিক মনে করেছেন, সেটিই করেছেন। আমরা আমাদের সাক্ষী, বিভিন্ন তথ্য-নথি দিয়ে প্রমাণ করব, তিনি আলবদরের নেতা ছিলেন।’

No comments

Powered by Blogger.