তিন সেতুর জন্য নগরে জলাবদ্ধতা by হামিদ উল্লাহ

মোহাম্মদ মন্জুর আলম সিটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জলাবদ্ধতা নিরসনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাকলিয়ার তিনটি সেতুর পুনর্নির্মাণকাজ শুরু করেন। কিন্তু যথাসময়ে নির্মাণকাজ শেষ হয়নি একটিরও। ফলে তিনটি সেতুই এখন জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


গত তিন দিনের টানা বৃষ্টির পানি কর্ণফুলীতে যাওয়ার পথে তিন খালের তিনটি সেতুই প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেতুগুলো হচ্ছে চাক্তাই খালের ওপর মিয়াখান নগর সেতু, ইসহাকের পুল ও বিরজা খালের ওপর তুলাতলী সেতু। ৩০ জুনের মধ্যে সেতু তিনটির কাজ পুরোপুরি শেষ করে সিটি করপোরেশনের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু গতকাল (সোমবার) পর্যন্ত সেতুগুলো ছাদ ঢালাইয়ের জন্যও প্রস্তুত হয়নি। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সেতু তিনটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে।
সেতু এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তিনটি সেতুর মধ্যে মিয়াখান নগর সেতু ও ইসহাকের পুলের বিম তৈরির জন্য সেতুর নিচে বসানো খুঁটিগুলোর সঙ্গে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে আছে। সেতুর এসব আবর্জনাই পানি চলাচলের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ওপর থেকে নেমে আসা পানি এ আবর্জনার স্তূপে বাধা পেয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি করে। আর তুলাতলী সেতুর নিচে প্রতিবন্ধকতা কম থাকলেও খালের চেয়ে সেতুর প্রশস্ততা অন্তত ২০ ফুট কম। তা ছাড়া সেতুর নিচে খালের দুই পাড়েও মাটির স্তূপ ও খুঁটি থাকায় পানি চলাচলে বাধা পায়।
মিয়াখান নগর সেতু ও ইসহাকের পুলের নির্মাণকাজের প্রকল্প পরিচালক এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সালেহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেতুর প্রধান অংশ বিম তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। ঢালাইয়ের কাজ শেষ হতে এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগার কথা নয়। চলতি বৃষ্টিপাতের পর আশা করছি তা শেষ হবে।’
অভিযোগ রয়েছে, মিয়াখান নগর ও ইসহাকের পুল নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের এ ধরনের সেতু নির্মাণের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। জানা যায়, ২০১০ সালে মোহাম্মদ মন্জুর আলম মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর সিটি করপোরেশনে বিএনপি-সমর্থিত ঠিকাদারেরা কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্ত শিথিল করার জন্য মেয়রকে চাপ দেন। পরবর্তী সময়ে প্রধান প্রকৌশলী মোখতার আলমও কিছু শর্ত শিথিল করার সুপারিশ করেন। শিথিল শর্তের সুযোগে মিয়াখান নগর সেতুর কাজ পান নগর যুবদলের সভাপতি কাজী বেলাল উদ্দিন আর ইসহাকের পুলের কাজ পান বিএনপি-সমর্থক শহীদুল ইসলাম। তবে তুলাতলী সেতুর ঠিকাদার আলাউদ্দিন পেশাদার ঠিকাদার বলে জানা গেছে।
এ তিন সেতু নির্মাণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে চার কোটি টাকার চেয়ে বেশি। সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সেতু তিনটি নির্মাণকাজের ঠিকাদার নিয়োগের অন্যতম শর্ত ছিল এক কোটি টাকার কম কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঠিকাদার এতে অংশ নিতে পারবেন না। কিন্তু শর্ত শিথিল করে দেওয়ায় বিএনপি ও যুবদলের নেতারা একচেটিয়াভাবে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এর মধ্যে সর্বনিম্ন ঠিকাদার হিসেবে মিয়াখান নগর ও তুলাতলী সেতুর কাজ পান কাজী বেলাল। শহীদুল ইসলাম পান ইসহাকের পুলের কাজ। কিন্তু লাভজনক হবে না মনে করে কাজী বেলাল ওই কাজ করতে অস্বীকার করেন। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ঠিকাদার এভাবে কাজ করতে অস্বীকার করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তাঁকে কালো তালিকাভুক্ত করার কথা। কিন্তু তাঁকে এ ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। পরে কাজী বেলালের পরিবর্তে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ওই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করেন আলাউদ্দিন।
এ প্রসঙ্গে ঠিকাদার আলাউদ্দিন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের ফাইল-প্রক্রিয়া শেষ করতেই অন্তত ছয় মাসের বেশি সময় চলে যায়। এতে তুলাতলী সেতুর কাজও দেরিতে শুরু হয়। এটিতে যে বিম বসানো হয়েছে, তা পুনরায় সরাতে হবে। এ জন্য ২৮ দিন সময় লাগে।’ জুলাই মাসের মধ্যেই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে অন্য দুই সেতুর ঢালাই আরসিসি ধরনের। এগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা যায়। কিন্তু এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। দুই ঠিকাদার কাজী বেলাল ও শহীদুল ইসলামের মুঠোফোনও গতকাল বন্ধ পাওয়া যায়।
তিন সেতুর জন্য পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাকলিয়ার লোকজন। বাকলিয়া থানা যুবদলের সভাপতি এম ইলিয়াস প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনে বাকলিয়ার মানুষ দল বেঁধে মন্জুর আলমকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু সেতু তিনটি নির্মাণকাজ চলাকালে এলাকার মানুষের ভোগান্তি ভোলা যাবে না। বিশেষ করে, ইসহাকের পুলের কাছে বিকল্প সড়ক নির্মাণ না করায় মানুষের চলাচলের পথই বন্ধ হয়ে যায়।’ এলাকার ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা একাধিকবার বিকল্প সড়ক নির্মাণের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কেউ আমাদের কথা শোনেননি। কষ্ট সহ্য করেও ধৈর্য ধরেছি।’
১৮ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ তৈয়ব প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেতুগুলোর জন্য মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছে। আমি নিজেও আজ (সোমবার) সকাল থেকে এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সেতুর নিচের আবর্জনা পরিষ্কার করছি। আশা করি অল্প দিনের মধ্যে ঠিকাদারেরা কাজ শেষ করে জনগণকে দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেবেন।’

No comments

Powered by Blogger.