ইতিহাস-ঐতিহ্যের আয়না by সুভাষ সাহা

আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির লেখক সাজ্জাদ শওকত তার অতি সাম্প্রতিক এক লেখায় পাকিস্তানের জনগণের ঐতিহ্য অসচেতনতায় খেদ প্রকাশ করেছেন। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর মতো সাড়ে চার হাজার বছর আগেকার প্রাচীন সভ্যতার পীঠস্থান হওয়ার পরও কেন পাকিস্তানের মানুষ এখনও আত্মপরিচয় সন্ধান করতে গিয়ে অহেতুক মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ফিরে ফিরে তাকায়, সে প্রশ্নও তিনি বারবার করেছেন।


তার এই প্রশ্নকে আত্মজিজ্ঞাসা বলেই বোধ হয়েছে। সত্যিই তো যদি পাকিস্তানের জনগণ তার বিশ্বাস ও কর্মে প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারণাকে লালন করতে সক্ষম হতো, তাহলে দেশটি অনেক আগেই একটি প্রথম সারির উন্নত দেশে পরিণত হতে পারত। পাকিস্তানের কী নেই! খনিজসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রাণশক্তিসম্পন্ন অপেক্ষাকৃত তরুণ জনসম্পদ_ সবই তাদের আছে। শুধু নেই তাদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক। এ কারণে হাজার হাজার বছর ধরে বহমান ধারাবাহিকতাকে তারা জাতীয় মানসে ধারণ করতে পারেনি। তারা যদি জাতিগতভাবেই অনুভব করতে পারত যে, তাদের পুর্বপুরুষরা সবচেয়ে প্রাচীন নগর সভ্যতার পত্তন করেছিলেন, তাহলে তাদের মধ্যে আত্মগত চেতনা শানিত হতো। বিদেশি ও নিজ দেশের বিশেষ মহলের প্ররোচনার কুফল সম্পর্কে জনগণ সম্যক উপলব্ধি করতে পারত। ব্রোঞ্জ যুগের মহেঞ্জোদারো সভ্যতার নিদর্শনগুলো দেখে এখনও থ হয়ে যেতে হয়। সেই যুগে একটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত শহর কি কল্পনা করা যায়! ইটের দেয়াল, দোতলা ভবন, তারপর সারি করে দাঁড়ানো বাড়িঘর, পাকা ঘরের ভেতরেই শৌচাগার, ল্যাট্রিন, গণশৌচাগার, বাজার, গলিপথ এবং প্রশস্ত সড়ক, শস্য মজুদ রাখার বিরাট বিরাট ভাণ্ডার, পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের ব্যবস্থা, আরও কত কী! অথচ ওই শহরের রূপকারদের আধুনিক যুগের উত্তরপুরুষরা এখন ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা লাগানোর অপেক্ষায়। আমরা অবশ্য দেশ স্বাধীন করে পাকিস্তানিদের চেয়ে কিছুটা ভালো আছি। কিন্তু আমরা যতটা ভালো থাকতে পারতাম ততটা কি ভালো আছি? নিশ্চয়ই না। আমাদেরও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগহীনতা এখনও প্রকট। রাজনৈতিক প্রচারণাগুলো এখানে এমনভাবে চলে, যাতে মনে হয় ১৯৭১ সালেই বুঝিবা হঠাৎ করে বা ইসলামপন্থিরা যেমনটি বলে থাকেন সেই ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ অথবা আরও পশ্চাতে গেলে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ থেকেই বাংলার এই পূর্বাংশের ইতিহাসের শুরু! তা কিন্তু নয়। বাংলা ভাষার পরিপূর্ণ বিকাশের আগেও এখানে মানুষ ছিল। বিভিন্ন সময়ে বিদেশিদের আগমনে এই এলাকা কখনও পেছনে আবার কখনও সামনে এগিয়েছে। আমরাও যে সমৃদ্ধ সভ্যতাকে ধারণ করি সে সত্যটি এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। সকল ধর্ম, মতে অবগাহন করে বাংলা ও বাঙালির পুষ্টি এই সত্য প্রকট হচ্ছে। আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই উপমহাদেশের প্রাচীন সভ্যতার মতো সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এই ঐতিহ্যকে বাঙালি তাদের চিন্তা ও কর্মে ধারণ করতে যেদিন শিখবে সেদিন তাদের অপরের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে হবে না। আমাদের পূর্বপুরুষদের কর্মচাঞ্চল্য এবং প্রকৃতি ও মানুষ সৃষ্ট প্রতিকূলতাকে জয় করে টিকে থাকার দুর্জয় সাহস ও বিচক্ষতা আধুনিক বাঙালির পাথেয় হতে পারে। এই যে এখনও ফসলের জন্য বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরতা, শহরগুলোর দশকের পর দশক ধরে বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতার শিকার হওয়া ইত্যাদি সমস্যাগুলো সমাধানে সমাজ ও রাষ্ট্রের ঐক্য শক্তি গড়ে তোলার তাগিদ আমরা আমাদের ঐতিহ্য থেকে আহরণ করতে পারি। আমরা নিজেরাই যে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারি, আধুনিক উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার যোগ্যতা রাখি, সে বোধ আমাদের মধ্যে পূর্বপুরুষদের লব্ধ সুকৃতির ঐতিহ্য গড়ে দিতে পারে। আসলে যে কোনো জাতির সত্যিকারভাবে নিজেকে চিনে নেওয়ার আয়না হলো তার ইতিহাস-ঐতিহ্য। পাকিস্তানিরা সে আয়নায় এখনও নিজেদের চিনে নিতে পারেনি। আমরাও কতটুকুই-বা পেরেছি!
 

No comments

Powered by Blogger.