জীবনের সাইকেল-বিভ্রান্ত জনগণ by মামুনুর রশীদ

আমার প্রিয় এক লেখক আছেন, তাঁর নাম শহিদুল জহির। অকালপ্রয়াত এই লেখক খুব বেশি লিখে যেতে পারেননি। তবে তাঁর প্রতিটি লেখায় একটি বিষয় বারবার ফিরে এসেছে, তা হলো বিভ্রান্তি। মহল্লায় বা গ্রামে একটি ঘটনা ঘটে, আর তা নিয়েই মহল্লাবাসী বা গ্রামবাসী বিভ্রান্ত হতে থাকে।


এই বিভ্রান্তি নিয়ে তারা আবার বড় ধরনের ভুলও করে ফেলে।
সাম্প্রতিক কালে খালেদা জিয়ার বাড়িটি নিয়েও জনগণ একটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়। একদিকে আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁকে বাড়িটি ছাড়তে হলো, অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছে। এর মধ্যে আবার অশ্রুজলে সিক্ত খালেদা জিয়ার মুখ। ঈদের আগে হরতালে জনজীবন বিপর্যস্ত, আবার জনগণ বলছে, সরকার ঈদের পর উচ্ছেদটা করলেই পারত। বিভিন্ন চ্যানেলে পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথাবার্তা—নয় বিঘা জমির ওপর বাড়ি, ৬৭ জন পরিচারক-পরিচারিকা, বেগম জিয়া ও তাঁর পরিবারের বিলাসবহুল জীবনযাপন, খোন্দকার দেলোয়ারের লাগামহীন উক্তি—সব মিলিয়ে বিভ্রান্তি আরও বাড়তে থাকে।
এর মধ্যে আরও বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বদরুদ্দীন উমরের লেখা। তিনি লিখেছেন, ওই সময় ওই বাড়িটি না দিলে ছেলেদের নিয়ে খালেদা জিয়া পথে বসতেন। সে সময়ে আরও জেনারেল তো নিহত হয়েছেন, আমরা জানিও না, সেসব পরিবার কোথায়? যেখানেই থাকুক, কিন্তু পথে বসেনি। একজনের কথা জানি—কর্নেল তাহেরের স্ত্রী। অন্যায়ভাবে তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো, তাঁর স্ত্রী কোনো সরকারি আনুকূল্য পাননি। ছেলেমেয়েদের নিয়ে পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের ছোট্ট একটি চাকরির মাধ্যমে দীর্ঘদিন লড়াই করে এক গৌরবের জীবন যাপন করেছেন। সেনাশাসকেরা সে সময় জেনারেল মনজুর, খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দার এবং কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের কথা ভাবলেন না। নয় বিঘার বাড়ি তো দূরের কথা; ডিওএইচএস, বারিধারার নয় ইঞ্চি জমিও তাঁদের জন্য বরাদ্দ হয়নি। নিহত সেসব অফিসারের দেশপ্রেমও ছিল প্রশ্নাতীত। এখানে অবশ্য বিভ্রান্তির কোনো কারণ নেই। জেনারেল জিয়া একটা দল করে গেছেন, অন্যরা দল করে যেতে পারেননি।
আবার বিভ্রান্ত হয় জনগণ, যখন ব্রিটিশ আমলের, পাকিস্তান আমলের জেনারেলরা আট বিঘার বাড়ির ওপর বসবাস করতেন, আবার স্বাধীন বাংলাদেশের জেনারেলরাও এত বড় বাড়িতে থাকতেন। যে দেশে আশ্রয়হীন মানুষের অভাব নেই, ঢাকা শহরে আবাসনসমস্যা যেকোনো দেশের রাজধানীর চেয়ে অনেক গুণ বেশি। এক কক্ষের একটি বাড়ির জন্য হন্যে হয়ে উঠছে মধ্যবিত্ত। কী ভয়াবহ বৈষম্য। বেগম জিয়াকে তো গুলশানে বিশাল জায়গা-বাড়ি দেওয়াও হয়েছে। সেনানিবাসের ভেতর থেকে সুদীর্ঘকাল রাজনীতি করার অধিকারও তিনি পেয়েছেন। এটা কি সেনা সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে? শাসকগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান হয়ে সেনা সংস্কৃতিকে রক্ষা করাও তো তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যায়। জনগণ আবার বিভ্রান্ত হয়েছে, যখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গণভবন নিতে চেয়েছেন। অবশ্য তা তিনি পারেননি। ভবিষ্যতেও তার সম্ভাবনা বিলীন হয়ে গেছে।
রাষ্ট্রের সম্পদ নিয়ে বদান্যের অধিকার মন্ত্রণালয়কে কে দিল? এ দেশে ভূমি বরাদ্দের নীতিমালাই বা কারা নির্ণয় করে? ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরায় একক বরাদ্দে এক বিঘা, ১০ কাঠা, পাঁচ কাঠা জমি দেওয়া হয়েছে। এখনো পূর্বাচলের বরাদ্দও সেই নিয়ম অনুযায়ীই হচ্ছে। যেকোনো আবাসিক এলাকায় তিন কাঠা জমির ওপর ১৫টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা সম্ভব। পাশের দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সল্টলেকে ১৫ জনকে পাঁচ কাঠা বা তিন কাঠার প্লট দেওয়া হচ্ছে। ৮৪০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। অত্যন্ত ঘন জনবসতিতে একজনকে এত জমি দেওয়ার ফলে আসলে কী হচ্ছে?
বাংলাদেশ এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে, এ দেশ উচ্চবিত্তের দেশ। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষ শুধুই করুণার পাত্র। শহরে রাস্তাঘাট নেই, অথচ গাড়িতে প্লাবিত হয়ে গেছে দেশ। প্রতি ঈদেই তার প্রমাণ মেলে। ভূমি প্রশাসনের নীতিমালাও উচ্চবিত্তদের আরও উচ্চতর স্থানে নিয়ে যাচ্ছে! মন্ত্রিপাড়ায় বা প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিলাসবহুল একাধিক বাড়ি নির্মিত হয়ে আছে। মিন্টো রোডের বাড়িগুলোতে বিশাল বিশাল চত্বরের প্রয়োজন আছে কি? একজন মন্ত্রীর কতটুকু জায়গা লাগে? তেমনই একজন জেনারেলেরই বা কতটুকু জায়গা লাগে তাঁর কাজকর্মের জন্য? জাতির আবাসনসংকট মাথায় রেখে এ বিবেচনাগুলো অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।
মনে রাখা দরকার, এ দেশটা স্বাধীন করার পেছনে উচ্চবিত্তদের কোনো ভূমিকা ছিল না। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষই বড় বড় লড়াই করেছে, প্রাণ দিয়েছে। রাষ্ট্রটা তাদেরই হওয়া উচিত ছিল। এ দেশের সাংসদেরা সবাই বড়লোক। তার পরও এমপি হোস্টেল, ন্যাম ভবনে তাঁদের থাকার সুব্যবস্থা আছে, ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আছে, ভালো বেতন আছে; অথচ কোনো রাজনৈতিক কাজ নেই। সংসদটা কার্যকরই হচ্ছে না। সংসদে অংশ নিচ্ছেন না, অথচ সুযোগ-সুবিধা ষোলোআনা ভোগ করছেন। একটু বিবেকের কাছে প্রশ্নও করছেন না তাঁরা।
বিরোধীদলীয় নেত্রী-সাংসদেরা সংসদে যান না, অথচ বাড়ির প্রশ্নে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন। জাতীয় সম্পদ ও গাড়ি ভাঙচুর করে জনজীবনে ত্রাসের সৃষ্টি করেন। বাড়ির ইস্যুটি কোনো রাজনৈতিক বা জনস্বার্থের ইস্যু নয়। জনস্বার্থের ইস্যুগুলো ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। দেশে অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষার বিস্তর ইস্যু আছে। এসব বিষয়ে কখনোই কোনো বিরোধী দল প্রশ্ন তোলে না। প্রশ্ন একটাই—ক্ষমতা। যেকোনো প্রজাতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ। এটা তারা বোঝেও, ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা, তদবির, ব্যবসা—এসবে ষোলোআনা ভোগ করবে; কিন্তু জনস্বার্থের বেলায় নেই। নির্বাচনের পর সাংসদেরা মহাব্যস্ত, কোথাও তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায় না, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে মহাব্যস্ত। মন্ত্রী হতে না পারার বেদনায় তাঁরা আখের গোছাচ্ছেন। তবে এসবেরও অবসান আছে। জনগণের বিভ্রান্তির কালও শেষ হবে। সবকিছুরই জবাব দিতে হবে।
মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব।

No comments

Powered by Blogger.