চট্টগ্রাম ট্র্যাজেডি-গাছের গুঁড়িকেও লাশ মনে হয় by শিউলি শবনম

বুধবার সকাল সাড়ে ১১টা। ধসে পড়া পাহাড়ের পাশে অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ উদ্ধারকাজ দেখছে, কেউ বা স্বজনের লাশের অপেক্ষায়। হঠাৎই ভিড়ের মধ্যে একজনের চিৎকার- আরেকটা লাশ দেখা যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে 'আল্লা গো, আমার মায়ের লাশ' বলে ভিড় ঠেলে ছুটে যায় এক কিশোরী।


লাশ ভেবে মাটির নিচ থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যা বের করে আনলেন তা ছিল গাছের গুঁড়ি। মেয়েটি আবার বুক চাপড়ে কান্না শুরু করল, 'আল্লা, তুমি কী করলা? আমার মায়েরে কাইড়া নিলা? মা, মাগো...।' গত মঙ্গলবারের পাহাড়ধসে ওই কিশোরীর মতো অনেকে তাদের স্বজন হারিয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রামের আকবর শাহ এলাকায় রেলওয়ের পাহাড় ধসে পড়ে। এতে মাটিচাপা পড়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা বানেজা বেগম বানু (৩৬)। তাঁরই লাশের অপেক্ষায় থাকা দুই মেয়ে ফাতেমা ও শাবনাজের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। মাটির নিচ থেকে কোনো লাশ বের হলেই মা ভেবে তারা ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু মেলেনি তাদের মায়ের লাশ। নাতনিদের সামলাতে গিয়ে বারবার জ্ঞান হারান বানেজার মা পাখি বেগম (৬০)। জ্ঞান ফিরলেই বিলাপ করেন, 'আমার স্বামী, বাপ, ভাই কেউ নাই আল্লাহ। মাইয়্যাডা আমারে খাওয়াইত, পরাইত। এখন কে আমারে খাওয়াইব?'
এই বিলাপ ও আর্তনাদের যেন শেষ নেই। একই ঘটনায় মাটিচাপা পড়ে মারা গেছে বানেজার ১৬ বছরের ভাতিজি শানু। মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা জয়নবুন্নেছা। এর আগে দুর্ঘটনায় স্বামী তৈয়ব আহমদকে হারান জয়নব। মঙ্গলবার রাতে শানুর লাশ উদ্ধার করা হলেও ফুফু বানেজার লাশ এখনো পাওয়া যায়নি।
বানেজার খালা রাজিয়া বেগম জানান, পাশের ঘরে শানু মায়ের জন্য সুপারি আনতে যায়। ঠিক তখনই পাহাড় ধসে পড়ে। শানুকে বাঁচাতে ছুটে যায় মা ও ফুফু। ততক্ষণে মাটির নিচে চাপা পড়ে শানু। ভাইঝিকে না নিয়ে কিছুতেই ফিরবেন না ফুফু বানেজা। একসময় তিনিও মাটির নিচে চাপা পড়েন। প্রসঙ্গত, আগামী শুক্রবার শানুর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।
পাহাড়ধসে আহত প্রতিবেশী মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, 'আমি তখন মাগরিবের নামাজ শেষে সালাম ফেরাচ্ছি। হঠাৎ একটা ভারী আওয়াজ কানে আসে। বুঝতে পেরেই আমি বাচ্চাদের নিয়ে বের হয়ে যাই। তখন দেখি একটা মেয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। তাকে ওঠাতে গিয়ে আমিও মাটির নিচে চাপা পড়ি। পরে আমাকে উদ্ধার করে ওপরে নিয়ে আসা হয়।'

No comments

Powered by Blogger.