সেই পাকিস্তানই এখন কত ধারাবাহিক by নোমান মোহাম্মদ

প্রতিভাবানদের প্রাচুর্য দলে। ঠিক। অনেক ম্যাচ উইনার, যাঁদের প্রত্যেকের ক্ষমতা আছে ম্যাচ জেতানোর। ঠিকই তো। যেকোনো প্রতিপক্ষকে হারানোর সামর্থ্য আছে দলটির। তাও ঠিক। কিন্তু এসবের সমন্বয়ে পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে ভালো ক্রিকেট খেলবে, যতটা হারবে জিতবে তার চেয়ে ঢের বেশি, সিরিজের পর সিরিজ তাদের কাছে পরাভব মানবে প্রতিপক্ষ? কস্মিনকালেও না। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের চরিত্রের সঙ্গে এটি যে একেবারেই যায় না!


যাক বা না যাক, হচ্ছে কিন্তু ঠিক তাই। গত বছর পাতালপুরীর ঘোর আঁধারে দিশেহারা হয়ে ছিল যে দলটি, তারাই কি না এখন ছুটছে আলোর মশাল হাতে। ধারাবাহিক ক্রিকেটে ঘোচাচ্ছে ঐতিহ্যের বদনাম! আজ থেকে শুরু হওয়া ওয়ানডে সিরিজটি তাই বাংলাদেশের জন্য রীতিমতো এসিড-টেস্ট!
হবে না? পাকিস্তানের সাম্প্র্রতিক ফর্মটা দেখুন। টেস্ট-ওয়ানডে-টোয়েন্টি টোয়েন্টি মিলিয়ে এ বছর যে ৪২টি ম্যাচ খেলেছে তারা, এর মধ্যে জিতেছে ২৯টিতে। হেরেছে কেবল ৯ ম্যাচে। পরিসংখ্যানের পরিধি কমিয়ে শুধু ওয়ানডেতে নিয়ে এলে এ বছর খেলা ২৯ ম্যাচের মধ্যে পাকিস্তানের জয় ২১টিতে। ৭ হারের পাশাপাশি বৃষ্টিতে ভেসে গেছে অন্য ম্যাচ। অথচ গত বছরই ১৮ ওয়ানডের মধ্যে হাসিমুখে তারা মাঠ ছাড়তে পেরেছিল মাত্র বারপাঁচেক। বছরের শুরুতে হেরেছিল টানা সাত ম্যাচ। সেই পাকিস্তান কী শৌর্যে-বীর্যে, প্রবল বিক্রমেই না ফিরে এল!
শুধু পরিসংখ্যানের সাধ্যি নেই এই প্রত্যাবর্তনকে ব্যাখ্যার। গত বছর তো ম্যাচ পাতানো কলঙ্কে জর্জরিত হয়েছিল সে দেশের ক্রিকেট। স্পট-ফিঙ্ংি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল তারা। কিংবদন্তি ইমরান খানের 'কর্নারড টাইগার' তত্ত্বে সেখান থেকে পাকিস্তান ফেরে দারুণভাবে। এ বছরের শুরুতে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে ছয় ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে ৩-২ ব্যবধানে। এরপর বাজির দর উলটে ওঠে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। সে পথে হারায় অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কার মতো দলকে। বিশ্বকাপ শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে পাঁচ ম্যাচের সিরিজ জিতেছে ৩-২ ব্যবধানে। আয়ারল্যান্ডে গিয়ে ২-০, জিম্বাবুয়েতে গিয়ে ৩-০ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়েছে প্রতিপক্ষকে। কিছু দিন আগে আরব আমিরাতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষের জয় ৪-১ ব্যবধানে। এ যেন অচেনা এক পাকিস্তান!
সাফল্যে মোড়ানো এ বছরে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সও আলো ঝলমলে। কয়েকজনেরটিতে চোখ বোলান। মোহাম্মদ হাফিজ ২৯ ম্যাচে তিন সেঞ্চুরিতে ১০২১ রান করার পাশাপাশি নিয়েছেন ২৬ উইকেট। আসাদ শফিক ১৩ ম্যাচে ৪২ গড়ে ৪২০ রান, ইউনিস খান ২৪ ম্যাচে ৩৭.৭২ গড়ে ৬৭৯ রান, মিসবাহ উল হক ২৮ ম্যাচে ৫৪ গড়ে ৮৬৪ রান, উমর আকমল ২৬ ম্যাচে ৪১.৩৭ গড়ে ৬৬২ রান। এমন দুরন্ত ফর্মে থাকা ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে আজ হাত ঘোরাতে হবে শফিউল-রুবেল-সাকিবদের। তামিম-ইমরুল-মুশফিকদের কাজটাও-বা সহজ কী! পাকিস্তানি বোলাররাও যে এ বছর ফর্মের তুঙ্গে। শহীদ আফ্রিদি ২৪ ম্যাচে ৪০ উইকেট নিয়েছেন ২০.৯৫ গড়ে, ইনিংসে পাঁচ উইকেট তিনবার। সাঈদ আজমলের ১৭ ম্যাচে ৩০ উইকেট, উমর গুলের ২০ ম্যাচে ২৩ শিকার, আইজাজ চিমার ছয় ম্যাচে ১২ উইকেট। জিততে হলে মোটামুটি এভারেস্ট জয়ের মতো কিছু করা ছাড়া উপায় নেই স্টুয়ার্ট লয়ের শিষ্যদের।
ল তা মানছেন, তবে বাস্তবতা জেনেও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে রাজি নন, 'পাকিস্তানকে হারাতে হলে আমাদের খুব ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। বুঝতে পারছি যে, ওদের বিপক্ষে জেতা আমাদের জন্য খুব কঠিন। কিন্তু আমরা যদি এসব ভেবে মাঠে নামি, তাহলে জয়ের কোনো সম্ভাবনাই আর থাকবে না। আমাদের এটি ভাবতে হবে যে, আমরা মাঠে নেমে ভালো স্কোর করতে পারব, সেটি ডিফেন্ড করতে পারব।' ধারাবাহিক পাকিস্তান দলের বিপক্ষে সেটি কতটা সম্ভব, কে জানে! সংবাদ সম্মেলনে দলের প্রতিনিধি হয়ে আসা ইউনিস খান বাংলাদেশকে হালকাভাবে না নেওয়ার কথা আরেকবার উচ্চারণ করে গেলেন। আর খানিকটা জানিয়ে গেলেন ধারাবাহিকতার রহস্য, 'আমাদের দলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের চমৎকার এক মিশেল আছে। সেটি বোলিংয়ে, ব্যাটিংয়েও। গুল, আফ্রিদি, আজমল, মিসবাহ, ইউনিস, আসাদ শফিকের মতো ক্রিকেটার নিয়ে আমাদের দলে এখন দারুণ সমন্বয়।' এভাবে খেলতে থাকলে সবগুলো সিরিজই যে তারা জিতবেন, সে কথাও জানিয়ে পরোক্ষে বাংলাদেশকে হুঙ্কার ছুড়তে ভুল করলেন না ইউনিস।
সত্যিই তো, অধারাবাহিকতার দুর্নাম ঘুচিয়ে যে দল এ বছর নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলা সবগুলো সিরিজই জিতেছে, তাদের সামনে বাংলাদেশ আর এমন কী!

No comments

Powered by Blogger.