র ঙ বে র ঙ-ঈশ্বরের দেওয়া মুকুট

ক সময় রাজার মুকুটই প্রতিনিধিত্ব করত একটি জাতির। মুকুট দেখেই চেনা যেত, কোনটা কোন রাজার রাষ্ট্র। প্রাচীনকাল থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজারা লোহার মুকুট ব্যবহার করতেন। এমনই একটি মুকুট ইতালির মিলান শহরের নিকটবর্তী মোনজার ক্যাথিড্রালে আজও সংরক্ষিত আছে। মুকুটটির আয়তন এক মিটারের মতো। বানানো হয়েছিল চাকতির মতো গোল করে। ওই সময় এ মুকুট ব্যবহৃত হতো হাতের আঙুলের নখে।


যিশুর ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুকে স্মরণ করতেই নাকি নখে এ মুকুট পরা চালু করা হয়েছিল! এটি প্রচলন করেছিলেন সম্রাট প্রথম কনস্টানটাইনের মাতা হেলেনা। জার্মানির উপনিবেশ তখন ইতালি। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের পর মোনজা লোমবার্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে লোমবার্ডের রানী দিওডেলিন্ডা এ মুকুট ব্যবহার শুরু করেন। জন্ম দেন এমন এক কাহিনীর, যা আজ কিংবদন্তিতুল্য। রানী মুকুটটি পরা শুরু করেন হাতের আঙুলের নখে। নখে পরার কারণ ছিল, এর আঘাতে সহজেই শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করা যেত। কিন্তু ওই যুগে মানুষ খুব সহজ-সরল হওয়ায় সবকিছুর মধ্যে অলৌকিকতা খুঁজতেন। অবিশ্বাস্য কিছু দেখলেই বিশ্বাস করতেন, পূজা দিতেন। মনে করতেন, পূজা দিলেই রোগ-শোক, এমনকি যুদ্ধেও জেতা যাবে। তাদের কাছে ওই বস্তুটি হয়ে উঠত পবিত্র। একদিন লোহার এ মুকুট হয়ে পড়ে অলৌকিক বস্তু। খ্রিস্টান পুরোহিতরা বলতে থাকেন, মহাসম্রাজ্ঞী হেলেনা জাতিসত্তার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে, পবিত্র বলে এ মুকুট ব্যবহার করতেন। এ মুকুট যিশুখ্রিস্টের প্রতীক। পুরোহিতদের প্রচারণার ফলে নখে পরার এ মুকুট পরিণত হয় মহামূল্যবান সম্পদে। ক্রমে উঠে আসে রাজাদের মাথায়। কেউ পেটানো লোহার সঙ্গে জুড়ে দেন স্বর্ণের টুকরো। আড়াআড়িভাবে আরও সংযুক্ত করেন তরতাজা ফুল। মুকুটটি ক্রমে ছোট করে আনা হয় এবং মাথায় পরার উপযোগী করে তৈরি করা হয়। পরবর্তীকালে এটি রাজা-বাদশাদের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়, যা আজ কেবলই ইতিহাস।
খ্রিস্টীয় নবম শতক থেকে আঠারো শতক পর্যন্ত ইতালির প্রায় সব রাজাই লোহার মুকুট পবিত্র বলে ব্যবহার করতেন। তবে ব্যবহারে পরিবর্তন আসে ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ইতালির রাজার কাছ থেকে মিলান দখল করে নেন। তার দখলকৃত অঞ্চলটি পাথর দিয়ে চিহ্নিত করেন। এলাকাটি পরে ব্যবহারের জন্য মিলানের আর্চবিশপকে দান করেন তিনি। কিন্তু বিনিময়ে নিয়ে যান লোহার মুকুটটি। তা ব্যবহারও করেন। মজার ব্যাপার হলো, এ মুকুটটিই এক সময় পরতেন লোমবার্ডের রাজা, যিনি এটাকে ঈশ্বরের দান ভাবতেন! অস্ট্রিয়া ও ইতালির যুদ্ধের পর ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মুকুটটি চলে যায় ভিয়েনায়। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয়বারের মতো যুদ্ধজয়ের মধ্য দিয়ে মুকুটটি আবার ফিরে আসে ইতালিতে। লোহার মুকুটটি ইতালিবাসী ঐতিহ্য হিসেবে ধরে রেখেছে আজও, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। তারা এগুলো দেখেই জানবে তাদের পূর্বপুরুষের নানা গৌরবময় ইতিহাস।
হ ঋতা আলম

No comments

Powered by Blogger.