বিমানবন্দরের নিরাপত্তা-কানাডীয় কম্পানিকে দায়িত্ব দিতে অদৃশ্য চাপ!-* নিরাপত্তা ফি হবে বিশ্বে সর্বোচ্চ * টানা ২৫ বছর ধরে আদায়ের পরিকল্পনা * ৪০ হাজার কোটি টাকা চলে যাওয়ার আশঙ্কা by আশরাফুল হক রাজীব

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তারদায়িত্বকানাডীয়কম্পানিভিজ্যুয়ালডিফেন্সইনকরপোরেশনের (ভিডিআই) হাতে তুলে দিতে 'অদৃশ্য চাপে' রয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। চাপ সৃষ্টি করতে কানাডীয় কম্পানির পক্ষে ভুয়া কাগজপত্রও সরবরাহ করা হয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রস্তাব পাঠায় বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।


মন্ত্রিসভা কমিটি প্রস্তাবটি নীতিগতভাবে অনুমোদন করার কথা বৈঠকে মৌখিকভাবে জানিয়ে দিলেও এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়নি। অনুমোদন দেওয়া হলে বাংলাদেশি যাত্রীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে বলে জানা গেছে। প্রথম বছরেই বিদেশি এ কম্পানিটি বিনিয়োগের টাকা যাত্রীদের কাছ থেকে তুলে নেবে এবং আরো ৬৫৪ কোটি টাকা লাভ করবে। এভাবে তারা ২৫ বছর টোল আদায় করে যাবে। তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী জি এম কাদের অদৃশ্য চাপের কথা অস্বীকার করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বিমানবন্দর লিজ দেওয়া হচ্ছে না। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য শুধু প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী এটা পরিচালনা করবে। এর বিনিময়ে যাত্রীদের কাছ থেকে যে ফি আদায় করা হবে, তা চূড়ান্ত নয়। অবশ্যই বাংলাদেশি যাত্রীদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কিছু করা হবে না। কোনো কিছু করা হলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমেই করা হবে।'
বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক মানের করার জন্য কানাডীয় কম্পানির দেওয়ার প্রস্তাব অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে তোলা হয়। কম্পানিটি নিরাপত্তার জন্য ২৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। এর মাশুল হিসেবে তারা আগামী ২৫ বছর ধরে বিদেশগামী যাত্রীদের কাছ থেকে মাথাপিছু ৩৫ মার্কিন ডলার করে আদায়ের পরিকল্পনা পেশ করে। ওই বৈঠকে নিরাপত্তার দায়িত্ব কানাডীয় কম্পানিকে দেওয়ার জন্য মৌখিক অনুমোদন দেওয়া হয়। মন্ত্রিসভা বিভাগ থেকে লিখিত অনুমোদন গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত পায়নি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, কানাডীয় কম্পানির এ প্রস্তাব দীর্ঘদিন ঝুলে রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতেই তারা এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠায়। বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী প্রস্তাবের পরিছন্নতার অভাবে বিষয়টি ঠেকিয়ে রাখেন। কিন্তু নীতিনির্ধারক মহল থেকে উপর্যুপরি চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে শুধু পরিচ্ছন্নতা দেখলে হবে না, কাজও করতে হবে_এ কথা বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের চাপ দেওয়া হয়। পরে বাধ্য হয়ে প্রস্তাবটি অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়। প্রস্তাবের পক্ষে কানাডিয়ান কম্পানি ভিডিআই সরকারকে জানায়, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তারাই আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন-আইএটিএ) একমাত্র কৌশলগত অংশীদার। এর সপক্ষে তারা আইএটিএর প্রত্যয়নপত্রও জমা দেয়। কিন্তু সেই প্রত্যয়নপত্র ভুয়া বলে জানা গেছে। আইএটিএ থেকে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে, বহির্গামী যাত্রীদের কাছ থেকে ৩৫ মার্কিন ডলার করে আদায় করা হলে সেটা হবে বিশ্বে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ফি। ২৩০টি এয়ারলাইনসের সংগঠন আইএটিএ পরিচালক হেমন্ত মিস্ত্রি গত ৩ নভেম্বর বিমান ও পর্যটনসচিব আতাহারুল ইসলামকে এক চিঠিতে জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টি তাঁরা সমর্থন করেন। তবে যাত্রীদের কাছ থেকে টিকিট কেনার সময় অতিরিক্ত ৩৫ ডলার করে ফি আদায়ের খবরে তাঁরা উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে ভিডিআই এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের কোনো চুক্তি হয়নি। ৩৫ ডলার আদায়ের যে প্রস্তাব, তা অস্বাভাবিক বেশি। বিশ্বের অন্যান্য বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাবদ আদায় করা অর্থের সঙ্গে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। আইএটিএ জানায়, এ ধরনের অস্বাভাবিক নিরাপত্তা ফি আরোপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ প্রয়োগ করবে। একই সঙ্গে দেশের বিকাশমান পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এসব কারণে এ ফি নির্ধারণের আগে আইএটিএ বিভিন্ন এয়ারলাইনস ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দেয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একজন কর্মকর্তা বলেন, কানাডিয়ান কম্পানি ভিডিআই মাত্র আট মাসে বিনিয়োগের টাকা তুলে নিয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। এ দেশের একটি মহল তাদের সহায়তা করছে। কানাডিয়ান কম্পানিকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হলে বিমানবন্দর পার হওয়ার জন্য প্রতি যাত্রীকে ৩৫ ডলার করে পরিশোধ করতে হবে। এ ৩৫ ডলারের মধ্যে বাংলাদেশ পাবে মাত্র ১৫ ডলার। অবশিষ্ট ২০ ডলার নিয়ে যাবে ভিডিআই। নিরাপত্তার জন্য কম্পানিটি বিনিয়োগ করবে ২৮০ কোটি টাকা। এর বিনিময়ে তারা ২৫ বছর ধরে যাত্রীপ্রতি ২০ ডলার করে হাতিয়ে নেবে। অথচ প্রথম বছরেই তারা বিনিয়োগের টাকা তুলে অতিরিক্ত লাভ করবে ৬৫৪ কোটি টাকা। কারণ এক হিসাবে জানা গেছে, গত বছরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পার হয়ে বিদেশে গেছেন ৪১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৮৫ জন। এ হিসাবে প্রতিবছর টোল আদায় হবে প্রায় এক হাজার ৯৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ১৫ শতাংশ হিসাবে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা পাবে বাংলাদেশ। অবশিষ্ট ৯৩৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা যাবে কানাডিয়ান কম্পানি ভিডিআইয়ের পকেটে। আর যেভাবে যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে, তাতে করে ২৫ বছরে ভিডিআইয়ের আয়ের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
কানাডিয়ান কম্পানি নিরাপত্তার জন্য যা করতে চায় : ভিডিআই বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য আট দফা কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনার কথা জানায়। কম্প্রিহেনসিভ সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিএসএমএস) করার জন্য তারা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমানাপ্রাচীরের অবকাঠামো উন্নয়ন করবে। এর আওতায় স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম ও ভিডিও সার্ভিল্যান্স থাকবে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মসূচির উন্নয়ন করবে তারা। যাত্রীদের দেহ তল্লাশি পদ্ধতি আধুনিকায়ন করার জন্য তারা ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপন করবে। যাত্রীদের ব্যাগেজ তল্লাশির জন্য স্ক্যানিং মেশিন স্থাপন করবে। পর্যাপ্ত সংখ্যক স্ক্যানিং মেশিন অপারেটরদের প্রশিক্ষণও দেবে তারা।
বিমানবন্দরে প্রবেশের জন্য বায়োমেট্রিক ফিচারযুক্ত স্বয়ংক্রিয় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি চালু করবে। কম্প্রিহেনসিভ ভিডিও চালু করবে এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কার্যক্রম তদারকির জন্য সমন্বিত নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (আইকাও) উড্ডয়ন নিরাপত্তা উদ্বেগের (সিগনিফিকেন্ট সেফটি কনসার্ন-এসএসসি) তালিকাভুক্ত। ভবিষ্যতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা উদ্বেগের তালিকায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানো জরুরি। কিন্তু নিরাপত্তা অর্থের নামে যাত্রীপ্রতি ৩৫ ডলার করে আদায় অনেক বেশি।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্ট অব বাংলাদেশ (আটাব)-এর সভাপতি এম এ মোহাইমেন সালেহ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দুর্বল। এ কারণে ভালো এয়ারলাইনসগুলো এখানে অপারেশন করতে চায় না। তাই নিরাপত্তা বাড়ানো দরকার। তবে নিরাপত্তা বাবদ যে টাকা আদায় করার কথা বলা হচ্ছে, তা অনেক বেশি। এটা কোনোভাবেই ৩৫ ডলার হতে পারে না। বিশ্বে কোথাও এত বেশি ফি নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেকটাই যেহেতু প্রবাসী শ্রমিকনির্ভর, তাই অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। তিনি আরো বলেন, একজন যাত্রীর কাছ থেকে বিমান কম্পানিগুলো ৩৫ ডলার লাভই করতে পারে না। সেখানে এই পরিমাণ নিরাপত্তা ফি বাড়াবাড়ি। এ ফি সর্বোচ্চ ২০ ডলার হতে পারে। আর কোনো রকম টেন্ডার ছাড়া এটা কানাডীয় কম্পানিকে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। টেন্ডারের মাধ্যমে সব হওয়া উচিত। তাতে যেকোনো কম্পানি অংশ নিতে পারবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদেশি সংস্থাকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া ঠিক নয়। বিমানবন্দরটি অবশ্যই স্পর্শকাতর জায়গা। তাই দেশি কোনো সংস্থাকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করা উচিত।
সাবেক এ সেনাপ্রধান আরো বলেন, 'বিমানবন্দরের পাশেই বিানবাহিনীর একটি ঘাঁটি রয়েছে। সেটির নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। সব কিছু মিলে সরকার চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নেবে বলে আমার বিশ্বাস।'

No comments

Powered by Blogger.