শেকড়ের ডাক-সুন্দরবন কি সপ্তাশ্চর্যে স্থান পাবে? by ফরহাদ মাহমুদ

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশের গর্ব সুন্দরবন এখনো সেই তালিকায় রয়েছে। সুন্দরবনকে ভোট দেওয়ার জন্য নানা মহল থেকে, এমনকি সরকারিভাবেও আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে তরুণরা ব্যাপক সংখ্যায় ভোটগ্রহণের জন্য নানা ধরনের ক্যাম্পেইনও চালিয়ে যাচ্ছে। ভোটদানের জন্য আজই শেষ দিন। বিশ্বের প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে আমাদের সুন্দরবন স্থান পাবে কি?


সুন্দরবন এখন আর শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। পৃথিবীতে নোনা পানির এত বিশাল বন আর নেই। এর অংশবিশেষ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেও ছড়িয়ে আছে। এর রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জনপ্রিয়তা দুনিয়াজুড়েই রয়েছে। মায়াবী চিত্রা হরিণের অবাধ বিচরণ পৃথিবীর যেকোনো দেশের প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। এখানে রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম বিষধর সাপ রাজগোখরা। বনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত অসংখ্য খাল দিয়ে জোয়ারের সময় অবাধে নৌকায় ঘোরা যায়। কখনো কখনো তীরে বিশ্রামরত নোনা পানির কুমির মানুষ দেখলেই দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে খাল বা নদীর জলে। রয়েছে বহু প্রজাতির বিরল পাখি, যার অনেকই দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। এর বৃক্ষরাজিও অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে থাকা সুন্দরবনের তুলনায় বাংলাদেশের সুন্দরবনের জৌলুস অনেক বেশি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের যেভাবে আকর্ষণ করে, আমাদের সমৃদ্ধ সুন্দরবন তার কিয়দংশও পারে না। কেন? এর অন্যতম কারণ বন ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা। আমাদের সুন্দরবনে বিদেশি পর্যটক দূরে থাক, দেশি পর্যটকরাও যেতে ভয় পায়। এর অন্যতম কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি। বিদেশি পর্যটকদের বনের ভেতরে থাকার এবং ঘুরিয়ে দেখানোর মতো সুযোগ-সুবিধার অভাব। এই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সুন্দরবন প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে স্থান পেলেও ইকো ট্যুরিজমের মাধ্যমে আমরা খুব একটা লাভবান হব না, হবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ।
১৯৯২ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, বিশ্বে প্রকৃতিভ্রমণ বা ইকো ট্যুরিজমের আয় ছিল মোট পর্যটন আয়ের ৭ শতাংশ। সে সময় পর্যটন খাতে বিশ্বের মোট বার্ষিক আয় ছিল তিন ট্রিলিয়ন ডলার। এর পর থেকে সাধারণ পর্যটনের তুলনায় ইকো ট্যুরিজমের আয়ের অনুপাত ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এমন অবস্থায় কেবল সুন্দরবনকেন্দ্রিক ইকো ট্যুরিজম থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করা মোটেও কোনো কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু এর লাখ ভাগের এক ভাগ অর্জনও আমাদের নেই। কারণ সেখানে না আছে কোনো অবকাঠামো বা পর্যটন-সুবিধা, না আছে পর্যটকদের নিরাপত্তা। পর্যটক তো দূরের কথা, সাধারণ জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ সুন্দরবনভিত্তিক পেশাজীবীরাও এখন বনে যেতে ভয় পায়। অনেকে দস্যুদের আগেই চাঁদা দিয়ে টোকেন নিয়ে রাখে। সেই টোকেন নিয়ে তাদের নির্ধারিত এলাকায় কাজ করে বা মাছ ধরে ফিরে আসে। চাঁদা না দিয়ে বনে যাওয়ার অপরাধে প্রতিবছর বহু লোক অপহরণের শিকার হয়। এমনকি অনেকের লাশ সাগরে ভাসতে দেখা যায়।
বনকর্মীরাও এক অর্থে তাদের হাতে জিম্মি। তাদের হাতে যে মামুলি অস্ত্র রয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ও শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে দস্যুদের হাতে। তাই তারা কখনো দস্যুদের ঘাঁটাতে যায় না। ভারতের সঙ্গে সুন্দরবনসংলগ্ন ৭৫ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। সেখানে বিডিআরের ফাঁড়ি রয়েছে মাত্র সাতটি। লোকবলও অনেক কম। তাদের হাতে দস্যুদের তাড়া করার মতো দ্রুতগামী নৌযান নেই বললেই চলে। কোস্ট গার্ডের সদস্যসংখ্যাও নিতান্তই অপ্রতুল। ফলে সুন্দরবন এখন জলদস্যু, বনদস্যু ও চোরাকারবারিদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। তাদের মাধ্যমে উপকূলে ধরা ইলিশসহ অন্যান্য মাছ, বনের কাঠ চলে যাচ্ছে ভারতে। বিনিময়ে ভারত থেকে আসছে আগ্নেয়াস্ত্র, মাদকদ্রব্য, ভেজাল ওষুধ ইত্যাদি। এই তথ্য কেবল যে আমরা জানি তা নয়, সারা পৃথিবী, বিশেষ করে পর্যটনে আগ্রহী ব্যক্তিরা অবশ্যই জানে। এটি নিশ্চয়ই সুন্দরবনকে সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে খুব একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে না।
এমনিতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের অনেক গাছ মরে যাচ্ছে। এর পরও চলছে অবাধে বৃক্ষনিধন। বিলুপ্তির প্রান্তসীমায় চলে আসা রয়েল বেঙ্গল টাইগারও রক্ষা পাচ্ছে না চোরা শিকারিদের হাত থেকে। এই অবস্থা চলতে থাকলে সুন্দরবন যে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং একই সঙ্গে ধ্বংস হবে এর অমূল্য প্রাণিসম্পদ, তা একরকম নিশ্চিত। আর ইকো ট্যুরিজমের সম্ভাবনা হারিয়ে যাবে দ্রুত। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হলেও একে রক্ষার দায়িত্ব মূলত আমাদের। তাই সুন্দরবনপ্রেমীরা বনটিকে বাঁচানোর আবেদন নিয়ে প্রতিবছর পালন করে সুন্দরবন দিবস। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ পর্যন্ত সব সরকারই সুন্দরবন রক্ষায়, এর উন্নয়নে বা পর্যটন-সুবিধা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে এসেছে।
সুন্দরবন মানেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সম্প্রতি এই বাঘ রক্ষায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে। প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারও সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন খাতে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পগুলোর কাজ ২০১৩ সালে শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি খুবই সামান্য। ২০০৪ সালের শুমারিকে ভিত্তি ধরে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চার শ রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই সংখ্যা দুই থেকে আড়াই শর মধ্যে। আর সুন্দরবনই হচ্ছে এ দেশে এদের শেষ আশ্রয়স্থল। এই শেষ আশ্রয়স্থলটিও কি আমরা টিকিয়ে রাখতে পারব না? তাহলে কেবল আবেগ দেখিয়ে, ভোট দিয়ে লাভ কী?
ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের মূল আঘাতটি লেগেছিল সুন্দরবনে, বিশেষ করে এর পূর্বাঞ্চলে। বন বিভাগের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এখানকার ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ গাছপালা ভেঙে গিয়েছিল। সে সময় বন্য প্রাণীরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, পূর্ব সুন্দরবনের প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর বনভূমির ২৫ শতাংশ গাছ ভেঙে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে আইলায়ও সুন্দরবনের অনেক ক্ষতি হয়েছে। তদুপরি বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে অবাধে বনের গাছ কাটা হয়েছে। এগুলো কঠোর হাতে দমন করতে হবে। পাশাপাশি সুন্দরবনে বন্য প্রাণীদের আবাসযোগ্যতা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই কেবল সুন্দরবন তার পুরনো ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে।
আগেই বলেছি, সুন্দরবন মানেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই বাঘ যদি না থাকে, সুন্দরবনও তার মূল্য হারাবে। অথচ বন বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অসচেতনতার কারণে প্রতিবছরই বেশ কিছু বাঘ মানুষ পিটিয়ে মারছে। গত বছর এবং তার আগের বছর সাতক্ষীরায় দুটি এবং বাগেরহাটে একটি বাঘকে পিটিয়ে মারার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। গত ৯ বছরে পিটিয়ে ও অন্যভাবে প্রায় ৩০টি বাঘ মারা হয়েছে। অথচ একই সুন্দরবনের পশ্চিমবঙ্গ অংশে আমরা কী দেখি? ২০০৮ সালে সেখানকার লোকালয়ে ঢুকে পড়া একটি বাঘকে তিন দিন ধরে বনকর্মীরা মাইলের পর মাইল অনুসরণ করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত অচেতন করে বাঘটি পুনরায় সুন্দরবনে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। আমাদের মধ্যে সেই সচেতনতা নেই কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের যেসব অংশে নদী বা খাল সরু বা ভরাট হয়ে গেছে, সেসব জায়গা দিয়েই বাঘ বেশি সংখ্যায় লোকালয়ে ঢোকে। শীতকালে সেগুলো আরো বেশি শুকিয়ে যায় এবং অনায়াসে বাঘ লোকালয়ে চলে আসতে পারে। নদী বা খাল সংস্কার করা হলে বাঘের লোকালয়ে আসা অনেকটা কমে যাবে। পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিশেষ দল গঠন করা যেতে পারে। ভয় দেখিয়ে কোনো বাঘকে দু-একবার তাড়ানো গেলে সে বাঘ আর কখনো লোকালয়ে প্রবেশ করবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, পিটিয়ে মেরে ফেলা এই সমস্যার সমাধান নয়। একটি বাঘ মেরে ফেললে আরেকটি বাঘ এসে এলাকা দখল করবে এবং কখনো না কখনো সেই বাঘটিও লোকালয়ে প্রবেশ করবে। মেরে সমাধান করতে হলে সুন্দরবনের সব বাঘই মেরে ফেলতে হবে। আমরা সম্ভবত তা চাই না।
পাশাপাশি বন্য প্রাণী সংরক্ষণের ব্যাপারে আমাদের বন বিভাগের নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর বদভ্যাসটি কিভাবে দূর করা যায়, তা ভেবে দেখতে হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, সুন্দরবনে বন বিভাগের কাছে কোনো ট্রাংকুলাইজার গান নেই। একটি ট্রাংকুলাইজারের দাম কত? কেন তা বন বিভাগের হাতে থাকবে না? ঘটনা ঘটার পর কেন ঢাকা থেকে ট্রাংকুলাইজার নিতে হবে? সুন্দরবন আমাদের ঐতিহ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ঐতিহ্য আমরা হারাতে চাই না।
লেখক : সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.