আমায় ক্ষমো হে-বাংলাদেশে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন আছে কি? by মামুন রাশীদ

মার আগের একটি লেখায় বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান 'ভোগবাদ' (কনজুমারিজম) ও 'চরম ভোগবাদিতা' (সুপার কনজুমারিজম) নিয়ে কিছু কথা বলেছিলাম। সেই লেখাটিতে আমি মূলত গুরুত্ব দিয়েছিলাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এবং ক্রমাগত নগরায়ণের ওপর। আর তা করতে গিয়ে অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রীদ্বয়ের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের উল্লেখ করেছিলাম।


সপ্তাহে এক দিন বাজারে যাওয়া বন্ধ রাখা এবং কম খাওয়া। আমি সেখানে কিছু পরামর্শও দিয়েছিলাম, যার মধ্যে আছে, বর্জ্য অর্থনীতির বিকাশ রোধ করা বা তার চেষ্টা করা এবং জরুরি ভিত্তিতে অর্থনীতিতে বিদ্যমান বৈষম্য বৃদ্ধির প্রক্রিয়া থামানো।
আমার কাছে মনে হয়েছিল, আমার বন্ধু ও পাঠকদের অনেকেই তাতে খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাঁদের কেউ কেউ লেখাটিতে মন্ত্রীদের প্রতি, বিশেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রতি কিছুটা পক্ষপাত দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁদের অধিকাংশেরই ধারণা, পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা ছাড়া যেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আর কোনো কাজ নেই। আমার মতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা বাজারে হস্তক্ষেপ করা নয়, বরং ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা, বিভিন্ন বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। তবে আমার সেই মতকে খুব কমসংখ্যক পাঠকই গ্রহণ করতে পেরেছেন। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ে বাড়ুক কিংবা দেশে উৎপাদন কম হোক বা সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ুক, তা সত্ত্বেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একমাত্র কাজ হলো পণ্যমূল্য কমিয়ে আনা। আমার তখন খুব বেশি করে মনে হতে থাকল, এ অবস্থায় বাংলাদেশে একটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থাকার প্রয়োজন আছে কি? আমরা কেন মূল্য কমিশন স্থাপন করছি না? বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীরা যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন তাদের দায়িত্ব পালন করে না? আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিচক্ষণ কূটনীতিকরা কি বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থাগুলোতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পক্ষে যথেষ্ট নন? গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রদূতরা কি সেখানকার বাজারে আমাদের পণ্যের অনুপ্রবেশে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারেন না? প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সামান্য একটি অফিস আদেশ কিংবা বড়জোর পার্লামেন্টের একটি সিদ্ধান্তেই তো ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে নেওয়া যায় এবং টেলিভিশনের আলোচনায় আমাদের অনেক অর্থনীতিবিদ অথবা নিদেনপক্ষে বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে যেসব পরামর্শ দিচ্ছেন, তা পালন করলেই তো আমাদের বাজার স্থিতিশীল হয়ে যায় (!)।
হ্যাঁ, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল স্থানীয় বাজারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং কেউ যদি লম্বা করে একটি শ্বাস নেন ও চারদিকে তাকিয়ে দেখেন, তাহলে তিনি সম্ভবত বলবেন, বিশ্বব্যাপী বাড়তে থাকা পণ্যমূল্য, জাহাজ ভাড়া এবং একই সময়ে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার প্রেক্ষাপটে এই সরকার খুব একটা খারাপ করছে না। যা হোক, সারা বছরই আমরা দেখতে পাই সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দায়িত্ব এড়ানোর একটা পারস্পরিক প্রতিযোগিতা চলে।
পণ্যমূল্য কী কী বিষয়ের ওপর নির্ভর করে? স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা হলে তা নির্ভর করে উৎপাদন খরচ, পরিবহন খরচ, গুদামজাত করার খরচ এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার ওপর। আর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তা সংগ্রহ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, জাহাজে পরিবহন খরচ, আমদানিকারকের মুনাফা, বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার ওপর সেই পণ্যের মূল্য নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি দাম বাড়ে, তাহলে আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়বে। অতীতের সরকারগুলোর মতোই বর্তমান সরকারও রমজান মাসের আগে আগে মূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশ মজুদ গড়ে তুলেছিল এবং আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ পরিস্থিতি ঠিক রাখতে চেয়েছিল। যা হোক, বাজারে কিন্তু এসব প্রচেষ্টার যথেষ্ট ফলাফল লক্ষ করা যায়নি। বরং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কথিত ব্যর্থতার পাশাপাশি প্রায়ই 'সিন্ডিকেট' (কার্টেল) ও হোর্ডিং মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মনে হয়, সরকারেরও একটি বড় অংশ মনে করে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান ভূমিকা হলো বাজারমূল্য স্থিতিশীল করা।
আমাদের মতো ক্রান্তিকালে থাকা একটি অর্থনীতিতে, যেখানে অব্যাহত শিল্পায়ন ও সম্পদ সৃষ্টিই কেবল দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মতো দুটি প্রধান দুষ্টচক্রকে মোকাবিলা করতে সক্ষম, সেখানে রাষ্ট্র ও বাজারের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারকে অনেক সতর্ক থাকতে হবে। এটি কোনো সহজ কাজ নয় এবং কখনো ছিলও না। 'বাজার' নামক বস্তুটিকে সতর্কভাবেই নাড়াচাড়া করতে হবে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত এবং যথেষ্ট পরিমাণে চীনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, খুব বেশি পরিমাণে 'পুলিশি' তৎপরতা সরকারের জন্য ভালো ফল বয়ে আনে না। বরং তাদের সবাইকে কিছু পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ ও শাসনসহ বাজারমানের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কখনো পুলিশি ভূমিকা পালন করতে যায় না। সুশাসন, জবাবদিহি, সংকট ব্যবস্থাপনা একত্রে সর্বোত্তম উপায় হতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ হওয়া উচিত, বাজার গবেষণা, আমাদের পণ্যের জন্য নতুন নতুন বাজার খোঁজা, অন্যান্য মন্ত্রণালয় কিংবা অন্যান্য দেশের প্রতিপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সমস্যার সমাধান করা। আমার বিবেচনা, বাণিজ্য বিষয়ে আলোচনার সক্ষমতা বাড়াতে আমাদের পুরনো অকার্যকর আইনগুলো পর্যালোচনা করা এবং আধুনিকীকরণ করা প্রয়োজন। আমরা যদি কেবল দাম কমানো বা নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করি, আমার মনে হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় কাজগুলো আমরা করতে পারব না। যদি তা না হয়, তাহলে আমার মতে আজকের পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আমাদের একটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থাকারই প্রয়োজন নেই।
বাজারে হস্তক্ষেপ করার চেয়ে নীতি ও কৌশলগত বিষয়গুলোর ওপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধিক গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। মূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করা হলে তা বরং বাজারের ব্যর্থতাকেই ডেকে আনতে পারে। কাজেই স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সময়মতো আমদানি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরবরাহ ঠিক রাখার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব উপায়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে জাতীয় কৃষিনীতি প্রণয়ন ও মনিটরিং, যাতে অবশ্যই কৃষি উপকরণগুলো সময়মতো বিতরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে, বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা, ভর্তুকির ব্যবস্থা, বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ, ভোক্তার প্রত্যাশিত মূল্যের প্রতিফলন, শস্য বাছাই, শস্য বহুমুখীকরণ এবং আধুনিকায়ন ইত্যাদি।
সরকারের দায়িত্ব কেবল সময়মতো আমদানি করা নয়, বরং ভোক্তাদের কাছে সঠিকভাবে পেঁৗছানোর জন্য আমদানি করা পণ্যের বিতরণ নেটওয়ার্ক ও বিক্রয় নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। সে ক্ষেত্রে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবিকে আরো শক্তিশালী করা যেতে পারে। 'শক্তিশালী' করার উদ্দেশ্য এই নয় যে বেসরকারি খাতের 'রাঘব বোয়ালদের' সঙ্গে টিসিবিকে প্রতিযোগিতায় নামানো হবে, বরং এর উদ্দেশ্য হবে প্রয়োজনের সময় একে কমবেশি বাজার স্থিতিশীলতার জন্য কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাণিজ্যনীতির ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। অতীতে বিভিন্ন বাণিজ্য ফোরামে এবং বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলোতে আমরা আমাদের অবস্থান হারিয়েছি। টিফা নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে। ডবি্লউটিএর সঙ্গে সংগতি রেখে আমাদের টিফার সুবিধাগুলোও নেওয়া উচিত এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিতে হবে, যা বাংলাদেশ ডবি্লউটিএতে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব ফোরামে আমাদের প্রতিনিধিদের নেতৃত্ব নিতে হবে। আমাদের নেতাদের অবশ্যই বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা, দরকষাকষিতে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আরো উচ্চ স্বর ও সুস্পষ্ট হতে হবে। উভয় পক্ষের জন্য একটি বিজয়ের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য (উইন উইন) আমাদের আলাপ-আলোচনার কলাকৌশলকে আবেগমুক্ত ও সুস্পষ্টভাবে কাজে লাগাতে হবে।
এখন পর্যন্ত আমরা সাফটা চুক্তির সুবিধাও পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি। যেখানে আমাদের আমদানির সিংহভাগ আসে ভারত থেকে, সেখানে ভারতে আমাদের রপ্তানি এখনো বেশ কম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে আরো গুরুত্বের সঙ্গে এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে কাজ করে যেতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলোও তাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। অপর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধা, অদক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ এখনো অনেক বেশি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ এবং নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে, স্থানীয়ভাবে দক্ষতার সঙ্গে পণ্য সংগ্রহের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে, বিদেশের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এবং আইনশৃঙ্খলা বলবৎ করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশে আমরা যদি একটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাই, তাহলে তাদের অবশ্যই কাজ করতে দিতে হবে। অন্যথায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রাখার এবং অতীতের মতো বর্ডার আউট পোস্ট হিসেবে কিংবা 'বাজার সরকার' (বিক্রয় প্রতিনিধি) বানিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই। এ ক্ষেত্রে অবশ্য এটাও মনে রাখতে হবে যে বিকাশমান অর্থনীতিতে ভোক্তাদের সন্তুষ্টি বিধান এবং ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টিতে সহায়তা করা খুবই কঠিন কাজ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী অর্থনীতিও আজ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
ইমেইল : mamun1960@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.