হেলিকপ্টারে চড়ে বাল্যবিবাহ by ফারুক মেহেদী

হেলিকপ্টারে চড়ে বর গেলেন বিয়েবাড়িতে। মহা ধুমধামে হলো বিয়ের আয়োজন। কনে তানিয়া অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী, বয়স মাত্র ১৩ বছর। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ভারেল্লা গ্রামে গত শনিবার এ বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের জানা থাকার পরও কী করে বাল্যবিবাহের ঘটনাটি ঘটল, তা নিয়ে এলাকায় চলছে সমালোচনা।বুড়িচং উপজেলার গাজীপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক আবদুর রাজ্জাকের সাইপ্রাস প্রবাসী ছেলে সেলিম রেজা সৌরভের সঙ্গে গত শনিবার তানিয়ার বিয়ে হয়। একই উপজেলার ভারেল্লা গ্রামের মহিলা মেম্বার শিরিন আক্তারের মেয়ে তানিয়া।

বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস। জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে বরযাত্রায় হেলিকপ্টারের পাশাপাশি ঘোড়ার গাড়িও ব্যবহার করা হয়। কুমিল্লা শহর থেকে ভাড়ায় নেওয়া হয় শতাধিক মাইক্রোবাস। অপ্রাপ্ত বয়সের কনের কথা জানার পরও স্থানীয় প্রশাসন বিয়ে ঠেকানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
স্থানীয় লোকজন জানায়, বর সেলিম রেজা সৌরভ বিয়েতে ব্যবহারের জন্য ঢাকা থেকে দেড় লাখ টাকায় একটি হেলিকপ্টার ভাড়া করেন। ভারেল্লা গ্রামে শনিবার দিনভর ছিল উৎসবের আমেজ। সৌরভকে নিয়ে হেলিকপ্টার তানিয়ার বাড়ির অদূরে নামে। সেখানে অপেক্ষায় ছিল ঢাকা থেকে ভাড়া করে আনা ঘোড়ার গাড়ি। বর ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে কনের বাড়ির আঙিনায় পেঁৗছেন। বরযাত্রী হিসেবে অন্যদের মধ্যে ছিলেন সাবেক এমপি অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস।
মাত্র ১৩ বছর বয়সের একটি মেয়ের ধুমধামের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার ঘটনা আগে থেকেই জানতেন বুড়িচং উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বিজয় কৃষ্ণ দেবনাথ। বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহনেয়াজেরও বিষয়টি জানা ছিল। এমনকি সমাজসেবা কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাসহ কনের স্কুল ভারেল্লা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও তানিয়া-সৌরভের বিয়ের খবর জানতেন। কিন্তু আইনগতভাবে অবৈধ বাল্যবিবাহ বন্ধের কোনো উদ্যোগ কেউ নেননি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজয় কৃষ্ণ দেবনাথকে গতকাল রবিবার প্রশ্ন করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বিয়ে সম্পর্কে জানি। এখন আমরা সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে করণীয় নির্ধারণ করব।' থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহনেয়াজও স্বীকার করেন বিয়ের অনুষ্ঠানটির কথা আগে থেকেই তাঁর জানা ছিল। তবে কেউ অভিযোগ না দেওয়ায় কিছু করা যায়নি। এ মুহূর্তেও কিছু করার নেই বলেও তিনি জানান।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জেড এম মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'এ বিষয়ে আমার কিছু করণীয় নেই।' একই বক্তব্য দেন মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা পারভীন আক্তার। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাও দায় এড়িয়ে যান। অন্যদিকে কনের স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বিয়ের অনুষ্ঠানের সময় আমি স্কুলে ছিলাম। বিষয়টি আমার জানা ছিল। এ ব্যাপারে স্থানীয় কয়েকজনকে ফোন করলেও কারো আগ্রহ না থাকায় আমি আর এগোইনি।'
কনের মা শিরিন আক্তার একজন জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে কেন বিয়ে দিলেন তা নিয়ে লোকজনের মধ্যে সমালোচনা চলছে। কুমিল্লার সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা অন্বেষার প্রধান উপদেষ্টা আবু হানিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'একজন জনপ্রতিনিধির মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়েছে। এ বিষয়ে কেউ কোনো দায়িত্ব নিচ্ছে না_এটা অত্যন্ত বিস্ময়কর। এমন একটি বিয়েতে একজন সাবেক এমপির উপস্থিত থাকার ঘটনাও লজ্জাজনক। যাঁরা দেখার কথা তাঁরাই যদি না দেখেন, তাহলে কার কী করার আছে!'

       

No comments

Powered by Blogger.