সংকট কাটাতে রাজশাহীতে আলুচাষিদের পাঁচ দফা দাবি by আনু মোস্তফা,

৫ লাখ বস্তা আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর আলু চাষি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকরা। আলুর বাজারমূল্য অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় তাঁদের এ দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। শনিবার রাজশাহীর হিমাগার মালিক সমিতি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও আলু চাষি সমিতির কর্মকর্তারা নগরীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ তথ্য জানান। সমূহ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাঁচ দফা দাবি উপস্থাপন করেন।


সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি আবু বাক্কার আলী। রাজশাহী চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী সরকারসহ উল্লেখ্যযোগ্যসংখ্যক হিমাগার মালিক ও চাষিরা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
হিমাগার মালিকরা জানান, রাজশাহীতে মোট ১৮টি হিমাগার রয়েছে। যেগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় আড়াই লাখ টন। বস্তার হিসাবে প্রায় ৩৫ লাখ বস্তা। কিন্তু বর্তমানে আলুর দাম অস্বাভাবিক কম হওয়ায় খরচ না পোষানোয় আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা হিমাগার থেকে আলু বিক্রি করছেন না। বর্তমানে হিমাগারগুলোতে প্রায় ১৫ লাখ বস্তা আলু পড়ে আছে। এত আলু নিয়ে চাষি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকরা বিপাকে পড়েছেন। তাঁরা বলছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চাষিরা আলু বিক্রি করতে না পারায় হিমাগারের ভাড়াও পরিশোধ করতে পারছেন না।
মালিকরা বলেন, চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মৌসুমের শুরুতে আলু মাঠ থেকে কিনে হিমাগার ভাড়া করে সংরক্ষণ করেন বছরের অন্য সময়ে বেশি দাম পাওয়ার আশায়। কিন্তু এবার তেমনটা হয়নি। তাঁরা জানান, গত মৌসুমে আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা ৮৫ কেজির এক বস্তা মাঝারি মানের আলু কিনেছিলেন ৯০০ টাকা দরে। কিন্তু মৌসুম শেষে এসে সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকা বস্তা দরে। প্রতি বস্তায় আলু ব্যবসায়ী ও চাষিরা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে লোকসান দিচ্ছেন।
হিমাগার সমিতির সভাপতি আবু বাক্কার আলী সংবাদ সম্মেলনে জানান, বাজারে বর্তমানে আলুর কেজি ১২ টাকা। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে এসব আলু কেনা হয়েছে ১৫ টাকা কেজি দরে। এখন কেজিতে তিন টাকা করে লোকসান দিতে হচ্ছে। তিনি আরো জানান, গত মৌসুমে ৮৫ কেজির এক বস্তা আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে ৬৫০ টাকা। হিমাগার ভাড়া ১৫০ টাকা যোগ করলে মোট খরচ দাঁড়ায় ৮০০ টাকা। কিন্তু সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭০০ টাকায়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মৌসুমে ৯০০ টাকা বস্তা দরে আলু কিনে এখন দাম পাচ্ছেন ৭০০ টাকা। এতে চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
হিমাগার মালিকরা বলছেন, আলুর অস্বাভাবিক মূল্য কমে যাওয়ায় চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁরা চলতি মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এবার রাজশাহীর অধিকাংশ চাষি আলু আবাদের পরিকল্পনা বাদ দিচ্ছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে রাজশাহীতে আলুর আবাদ অর্ধেকে নেমে যাবে। এতে হিমাগারগুলোও খালি থাকবে ভবিষ্যতে। ফলে দেশে আলুর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে। এতে আলু চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েক লাখ মানুষের জীবনজীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি হিমাগার মালিকরা বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন মেটাতে না পেরে হিমাগার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন। এতে জেলার কৃষি উৎপাদনে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।
রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতি, আলু চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা আলুর এই বিপর্যয় রোধে সরকারের কাছে পাঁচটি দাবি তুলে ধরেছেন। দাবিগুলো হলো_সরকারের যেসব সেক্টরে ও সংস্থায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলু সরবরাহ করা, সরকারি স্কুল-কলেজসহ অন্যান্য সংস্থায় আলুর বরাদ্দ বাড়ানো, সরকারের ভিজিএফ, ভিজিডি ইত্যাদি দুস্থ ও কল্যাণধর্মী কর্মসূচির আওতায় চাল ও গমের সঙ্গে আলু বরাদ্দ করা, সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমে আলু খাওয়ার ব্যাপারে প্রচার চালানো, আলু উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য বিশেষ ভর্তুতি কর্মসূচি চালু করা।
হিমাগার মালিকরা আরো বলেন, বাজারে সব জিনিসের দাম বেশি কিন্তু আলুর দাম কমে গেছে। এ অবস্থায় সবজি হিসেবে আলুর মূল্যে এখন কোনো ভারসাম্য নেই। এতে আলু উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অবিলম্বে আলুর ব্যাপারে সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলে এই খাতে ভয়াবহ বিপর্যয় হবে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করেছেন।


 

No comments

Powered by Blogger.