দোহার নবাবগঞ্জের আতঙ্ক ‘হাফপ্যান্ট বাহিনী’ by শামীম আরমান ও ইমরান হোসেন সুজন
দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিরা ওই চিকিৎসককে অভয় দিয়ে স্বগর্বে বলেন, ডাক্তার সাহেব, আমরা ডাকাত, ডাকাতি করতে এসেছি, আপনাদের মারতে আসি নাই, তাই কোনো আওয়াজ করবেন না। ঘরে টাকা-পয়সা ও স্বর্ণ আছে আমাদের দিয়ে দেন। এরপর নগদ দেড় লাখ টাকা ও ১০-১২ ভরি স্বর্ণ লুট করে নিয়ে যায়। তবে ডাকাতরা কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করেনি। এ ঘটনায় ওইদিনই নবাবগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ডাকাতরা তার বাড়ির জানালার গ্রিল কেটে ভিতরে প্রবেশ করে। ডাকাতদের একজন মধ্যবয়সী হলেও বাকিদের বয়স ১৫-২৫ এর মধ্যে। তারা সবাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলেছিল। দেখে মনে হয়েছে সবাই শিক্ষিত এবং এখনো তুই তুরাকি শব্দ ব্যবহার করেনি। তবে সেই রাতেই স্মৃতি থেকে এখনো বের হতে পারছেন না তারা।
এর আগে ১৫ই এপ্রিল রাতে পার্শ্ববর্তী দোহার উপজেলার পশ্চিম সুতারপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী মো. শাহজাহানের বাড়িতে সশস্ত্র হানা দেন ৬-৭ জনের একটি ডাকাতদল। একই কায়দায় রুমের গ্রিল কেটে ঘরে প্রবেশ করে তারা। তখনো ডাকাতরাও মুখ ঢেকে শুধু হাফপ্যান্ট পরে এসেছিল বলে জানা যায়। ২৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ দেড় লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা। এর একদিন পর একই কায়দায় উপজেলার নারিশা পশ্চিম চরের গাজী মাহফুজ কাকনের বাড়িতে হানা দিয়ে ৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ৫ লাখ টাকা লুট করে ডাকাতদল। ২ ঘটনার পর বাড়িতে থাকা সিসি ক্যামেরার ডিভিআর নিয়ে যায়। এরপর দোহার থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী পরিবার দু’টি।
জানা যায়, দোহারের দু’টি ও নবাবগঞ্জের একটি ডাকাতির ঘটনায় অনেক কিছুর মিল রয়েছে। সব ঘটনায় একই ধরনের আলামত রয়েছে বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ডাকাতির শিকার দোহারের ব্যবসায়ী শাহজাহান বলেন, হাফপ্যান্ট পরে মুখ ঢেকে ডাকাতরা বাসায় প্রবেশ করে সব লুট করে নিয়ে যায়। ওরা কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেনি। আমরা ভয়ে তাদের সব দিয়ে দিয়েছি। যাওয়ার সময় তারা মামলা না করার হুমকিও দিয়ে যায়। আরেক ভুক্তভোগী একই উপজেলার নারিশা পশ্চিম চরের হাজী মাহফুজ কাকনও জানান একই কথা। তার বাড়িতেও গ্রিল কেটে হাফপ্যান্ট পরে ডাকাতরা প্রবেশ করে। তার গ্রিলের কাটা অংশে কাপড় পেঁচিয়ে রেখেছিল। তার সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি ডাকাতরা। শুধু ভয় দেখিয়ে হাত-পা-মুখ বেঁধে সব লুট করে নিয়ে যায়। এভাবে ডাকাতির ঘটনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে দোহার-নবাবগঞ্জের মানুষের মাঝে। ২ উপজেলায় ডাকাতরা এখন ‘হাফপ্যান্ট বাহিনী’ হিসেবে পরিচিত। দোহার ও নবাবগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, রাত হলেই এখন আতঙ্কে থাকি। বাসায় ঘুমাবো সেখানেও ডাকাত আতঙ্ক, আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রেখে আসি সেখানে চুরির আতঙ্ক। এদিকে, দোহারে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত একই পরিবারের ৩ জনসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফরিদপুরের নগরকান্দা গ্রামের ছাগলদীর খোরশেদ মাতুব্বরের ছেলে ডাকাত সরদার ওমর আলী মাতুব্বর ও ভাংগা উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের সরোয়ার মাতুব্বরের ছেলে মো. আকরাম মাতুব্বর, লুণ্ঠিত স্বর্ণ বিক্রি ও ডাকাতির তথ্য সংগ্রহ কাজে সহায়তা করা, ওমর আলীর স্ত্রী রাবেয়া বেগম ও মা কমেলা বেগম এবং স্বর্ণ কেনার অপরাধে একই উপজেলার বিনোকদিয়া গ্রামের গোসাই দাস পালের ছেলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল পালকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় তাদের কাছ থেকে ডাকাতির সময় ব্যবহৃত ১টি দেশীয় অস্ত্র ও লুণ্ঠিত ১০ আনা ১ রতি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে দোহার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম জানান, ডাকাত সরদার ওমর আলী মাতুব্বর কিছুদিন পূর্বে জামিনে বের হয়ে বাসাভাড়া নিয়ে ডাকাতির পরিকল্পনা করে এবং চাঞ্চল্যকর দুইটি ডাকাতি সংগঠিত করে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা প্রাথমিকভাবে অত্র ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানান তিনি। দোহার থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, দোহারের দুই ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫ জনের মধ্যে ডাকাত সরদার ওমর আলী মাতুব্বর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেয়ায় তাদের আদালত রিমান্ড দেয়নি। নবাবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ডাকাতির ঘটনায় প্রশাসন কাজ করছে। সারারাত নবাবগঞ্জে পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমনে দোহার থানা পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে।

No comments