Thursday, May 1, 2025
কোরআনের কাহিনি: বাঁধভাঙা বন্যার গল্প by রায়হান রাশেদ
কোরআনের কাহিনি: বাঁধভাঙা বন্যার গল্প by রায়হান রাশেদ
পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টির পানি জমা হতো বাঁধে। বাঁধের ওপরে-নিচে ও মাঝখানে পানি বের করার তিনটি দরজা ছিল। দরজা দিয়ে সঞ্চিত পানি সুশৃঙ্খলভাবে শহরের লোকজন ও তাদের খেত-খামার এবং পৌঁছানো হতো। প্রথমে ওপরের দরজা, এরপরে মাঝখানের এবং সর্বশেষ নিচের তৃতীয় দরজা খুলে দিয়ে বছরব্যাপী পানির সঙ্কট কাটানো হতো। পরের বছর পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টির পানিতে ভরে উঠত বাঁধ। বাঁধের নীচে পানির আধার নির্মাণ করে বিরাট বিরাট খালের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন দিকে পৌঁছানোর ব্যবস্থা ছিল। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ ১,১০৯)
এই বিশাল বাঁধ অন্যান্য বাঁধ থেকে পুরো দেশকে এমনভাবে জলতৃপ্ত করত, চতুর্দিকে শুধু বাগান আর বাগান দেখা যেত। মাইলের পর মাইল সবুজ শ্যামলিমায় ছেয়ে থাকত। চারপাশের খেজুরের বাগানগুলো খেজুরের কাঁদিতে নুইয়ে পড়ত। নানা ধরনের ফলফলাদিতে ভরে উঠত গাছগুলো। সুগন্ধ দ্রব্যসমূহের খেত, তৃণভূমি, দারুচিনি, আগর ও অন্যান্য সুগন্ধযুক্ত বৃক্ষের ঘন উদ্যান এত বেশি সৃষ্টি হয়েছিল যে গোটা এলাকাটি পুষ্পোদ্যান ও স্বর্গে পরিণত হয়েছিল। কাতাদাহ (রা.) বলেন, কেউ মাথায় খালি ঝুড়ি নিয়ে পথ ধরে গেলে গাছ থেকে পতিত ফলে ঝুড়ি ভরে যেত। (তাফসিরে ইবনে কাসির)। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সাবার অধিবাসীদের জন্য তো তাদের বাসভূমিতে ছিল নিদর্শন: দুটি উদ্যান, একটি ডানদিকে, অপরটি বামদিকে। (তাদের বলা হয়েছিল, হে সাবার অধিবাসীরা) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রদত্ত রিজিক ভোগ করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। উত্তম নগরী ও ক্ষমাশীল প্রতিপালক।’ (সুরা সাবা, আয়াত: ১৫)
সাবা ছিল শান্তিকামী, নিরাপদ ও সুখী রাজ্য। তাদের বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় হতো প্রাসাদ ও অট্টালিকা নির্মাণে। পথঘাট সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল। আরাম-আয়েশ, উন্নতি ও সভ্যতার সব উপকরণ পূর্ণমাত্রাই বিদ্যমান ছিল। শহরে পোকামাকড়, মশা-মাছি ও সাপ-বিচ্ছুর মতো ইতর প্রাণীর নামগন্ধও ছিল না। বাইরে থেকে কোনো ব্যক্তি শরীরে বা কাপড়ে উকুন ইত্যাদি নিয়ে এ শহরে এলেও সেগুলো আপনাই মারা যেত। সাবা থেকে শাম দেশ পর্যন্ত সাত শ গ্রাম আবাদ ছিল। সকাল বেলা এক জনপদ থেকে রওনা হলে দুপুরে আরেক জনপদে পৌঁছা যেত। সেখানে থেকে খেয়েধেয়ে অনায়াসেই অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল। কোরআনের ভাষায় ‘উত্তম নগরী’ হয়ে উঠেছিল সাবা।
এত নেয়ামত, সমৃদ্ধি এবং সুখী জীবনের পরও সাবা বাসী আল্লাহর নাফরমানি করল। আল্লাহ তাদের কাছে পথপ্রদর্শক পাঠালেন; যিনি তাদের আল্লাহর ইবাদত করার আদেশ দিলেন এবং কৃতজ্ঞতা আদায় করতে বললেন। তারা মুখ ফিরিয়ে নিল। বাঁধ ভাঙার ভয় দেখানো হলো তাদের। ইবনে কাসির ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহের সূত্রে বলেন, তাদের ধর্মগ্রন্থে লেখা ছিল, বাঁধটি ইঁদুরের মাধ্যমে ধ্বংস হবে। ফলে তারা ইঁদুর নিধনের জন্য বিড়াল পুষতে লাগল। তবে আল্লাহর ইচ্ছাকে রোখার সাধ্য কার? সেই বাঁধে এতই ইঁদুর এলো যে বিড়ালেরা হার মানল। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ইঁদুরগুলো বেশ বড় বড় ছিল এবং বাঁধের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত মাটি নষ্ট করে ফেলেছিল। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ ১,১০৯)
বিশাল বাঁধ একদিন ভেঙে পড়ল। সেই জলাধার থেকে বেরিয়ে আসা প্রচণ্ড স্রোত, পথিমধ্যে যতগুলো বাঁধ পেয়েছিল সবগুলো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। মাআরিব ও আশপাশের ভূভাগকে প্লাবিত করলো। সুশোভিত ও মনোরম উদ্যানগুলোকে ডুবিয়ে দিয়ে নষ্ট করে ফেলল। ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হলো। মানুষ মারা পড়ল। যারা শহর ছেড়ে আগে চলে গিয়েছিল তারা বেঁচে রইল। বন্যার পানি ধীরে ধীরে শুকিয়ে এলো। তখন ওই স্বর্গসম উদ্যানগুলোর জায়গায় পাহাড়ের দুই পাশের উপত্যকার উভয় পাশে ঝাউ গাছের ঝাড়, জংলি বরইয়ের ঝোঁপ ও সারি সারি পিলু গাছ উৎপন্ন হলো। আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু তারা (আল্লাহ্র কাছ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিল। কাজেই আমি তাদের বিরুদ্ধে পাঠালাম বাঁধ-ভাঙ্গা বন্যা, আর আমি তাদের বাগান দুটিকে পরিবর্তিত করে দিলাম এমন দুটি বাগানে যাতে জন্মিত বিস্বাদ ফল, ঝাউগাছ আর কিছু কুল গাছ। অকৃতজ্ঞতাভরে তাদের সত্য প্রত্যাখ্যান করার জন্য আমি তাদের এ শাস্তি দিয়েছিলাম। আমি অকৃতজ্ঞদের ছাড়া এমন শাস্তি কাউকে দিই না। তাদের এবং যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ বর্ষণ করেছিলাম সেগুলোর মাঝে অনেক দৃশ্যমান জনপদ স্থাপন করে দিয়েছিলাম এবং ওগুলোর মাঝে সমান সমান দূরত্বে সফর মনজিল করে দিয়েছিলাম। (আর তাদের বলেছিলাম) তোমরা এ সব জনপদে রাতে আর দিনে নিরাপদে ভ্রমণ করো। কিন্তু তারা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের সফর-মঞ্জিলগুলোর মাঝে ব্যবধান বাড়িয়ে দাও। তারা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছিল। কাজেই আমি তাদের কাহিনি বানিয়ে ছাড়লাম (যে কাহিনি শোনানো হয়) আর তাদের ছিন্ন ভিন্ন করে দিলাম। এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা সাবা, আয়াত: ১৬-১৯)
বাঁধটি বর্তমান সানআর মাআরিব প্রদেশের বালাখ হিলস এলাকার ওয়াদি আল-আজানায় অবস্থিত। বাঁধের কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো সেখানে আছে বলে ধারণা করা হয়। (দেশ-দেশান্তর, ৩/৩০৯)
রাজ্য হিসেবে সাবার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় দাউদ (আ.)-এর জাবুরে। এ থেকে প্রমাণিত হয় সাবার সমৃদ্ধির যুগের সূচনা হয়েছিল ১ হাজার খ্রিস্টাপূর্বাব্দ। (আজ-জাবুর, ৭২/১০)। সাইয়েদ সুলাইমান নদভির মতে, সাবার উন্নতি ও সমৃদ্ধির সূচনাকাল কিছুতেই ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে নয়। (আল-কুরআনের ভৌগোলিক ইতিহাস, সাইয়েদ সুলাইমান নদভি, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ১, পৃ ৩০৬)
রোমান ইতিহাসবিদদের মতে, সাবার শাসনকাল দুই স্তরে বিভক্ত। প্রত্যেক স্তরের শাসনকাল দুটি ভিন্ন ভিন্ন যুগে বিভক্ত। প্রথম স্তরের প্রথম যুগ খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১১০০ সাল থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সালে এসে শেষ হয়েছে। ধারণা করা হয়, এটা ছিল সাবার শাসনকালের উৎকর্ষের যুগ। সুলাইমান (আ.)-এর যুগের সাবার রানি বিলকিস এই যুগের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট। প্রথম স্তরের দ্বিতীয় যুগ খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সাল থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালে এসে শেষ হয়েছে। বাঁধ ভাঙা বন্যা এবং সাবা জাতির বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়া এই যুগের ঘটনা। দ্বিতীয় স্তরের প্রথম যুগ খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালে শুরু হয়ে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে এসে সমাপ্ত হয়েছে। দ্বিতীয় স্তরের দ্বিতীয় যুগ ৩০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে শুরু হয়ে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে এসে শেষ হয়েছে। (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৯, পৃ ৭২)
লেখক: আলেম

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1266)
-
▼
2025
(3280)
-
▼
May
(344)
-
▼
May 01
(18)
- অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের প্রথম ইট স্থাপন করবে পাক স...
- গাজায় আরও ১৪ হত্যা, দুর্ভিক্ষাবস্থা
- ভারতের ১৭২টি, পাকিস্তানের ১৭০টি পারমাণবিক অস্ত্র: ...
- কাশ্মীর হামলার পর চাপে ভারতের মুসলিমরা, বেড়েছে দম...
- অবৈধ নির্বাচনের ‘বৈধ’ মেয়রগণ by সোহরাব হাসান
- ইথিওপিয়া হিজরতের গল্প by সাব্বির জাদিদ
- পাকিস্তানকে যেভাবে জবাব দিতে হবে ভারতকে by শশী থারুর
- কোরআনের কাহিনি: বাঁধভাঙা বন্যার গল্প by রায়হান রাশেদ
- ফিলিস্তিনি মুসলিমরা কেন নির্যাতিত? by মোহাম্মদ আবু...
- ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কী অত্যাসন্ন? জাতিসংঘ ও যুক্ত...
- দুই সন্তান নিয়ে কঠিন যুদ্ধে লাকি by ফাহিমা আক্তার ...
- বৈধ গর্ভপাতের জন্য টার্গেট নারী চিকিৎসক
- মানবিক করিডরে ঢাকার সায়, আপত্তি মিয়ানমার জান্তার: ...
- স্কুল থেকে ফেরার পথে রাহাতকে পিটিয়ে নদীতে ফেলে হত্যা
- প্রতিনিয়ত যুদ্ধের হুমকি আমাদের ঘিরে থাকে
- ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা রাশেদ খানের: ‘মুখে গামছা ঢ...
- দোহার নবাবগঞ্জের আতঙ্ক ‘হাফপ্যান্ট বাহিনী’ by শামী...
- ‘২২৭ জনকে হত্যার লাইসেন্স পেয়ে গেছি’ অডিওটি শেখ হা...
-
▼
May 01
(18)
-
▼
May
(344)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment