রোহিঙ্গা ইস্যুতে আবার চাপে বাংলাদেশ-ওআইসিতে আলোচনা লন্ডনে বিক্ষোভ by মেহেদী হাসান

মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় না দেওয়া এবং এ দেশে অবস্থানরত অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাসংশ্লিষ্ট তিনটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া ইস্যুতে আবারও চাপের মুখে পড়েছে সরকার। গত রবিবার লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হোটেলের সামনে রোহিঙ্গাদের পক্ষে প্রায় ২০০ ব্যক্তি সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে।


পরে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী অ্যান্ড্রু মিচেল বিষয়টি তুললে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বাংলাদেশকে না বলে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে সৌদি আরবের মক্কায় চলমান ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনেও রোহিঙ্গা ইস্যুটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উঠতে পারে। মুসলমান দেশগুলোর ওই সম্মেলনে বাংলাদেশে আশ্রয়প্রার্থী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ফিরিয়ে দেওয়ার সমালোচনা হতে পারে। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যৌক্তিক কারণেই বাংলাদেশ এবার রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়নি। তবে আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে বাংলাদেশ মানবিক আচরণ করেছে। রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে এ বোঝা টানতে পারে না।
গত জুন মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত শুরু হলে বাংলাদেশে আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিতে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী দেশ ও দেশের জোটগুলো বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ জানিয়ে দেয়, নতুন করে শরণার্থী নেওয়া এ দেশের পক্ষে আর সম্ভব নয়। ২৯ হাজার শরণার্থীসহ প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গার চাপ সামলাতে বাংলাদেশ হিমশিম খাচ্ছে।
সীমান্তে রোহিঙ্গাদের উসকে দেওয়ার অভিযোগে চলতি মাসের শুরুর দিকে মুসলিম এইড, ডক্টরস উইদাউট বর্ডার ও অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার নামের তিনটি এনজিওর কাজ বন্ধের নির্দেশ দেয় সরকার। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স সরকারের ওই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়ে তা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
জানা গেছে, সর্বশেষ গত রবিবার লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থানকারী হোটেল সেন্ট প্যানক্রাস রেনেসাঁর সামনে বাংলাদেশ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছিল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে অপ্রত্যাশিত। হিযবুত তাহ্রীর ব্রিটেনের সদস্য বলে নিজেদের পরিচয় দেওয়া ওই বিক্ষোভকারীরা সীমান্ত খুলে না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। পাশাপাশি মিয়ানমারের মুসলমানদের সাহায্য করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিও আহ্বান জানায়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, লন্ডন অলিম্পিকের শেষ দিন উৎসব আমেজে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা ও দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে ওই বিক্ষোভ।
এদিকে আজ মঙ্গলবার থেকে সৌদি আরবের মক্কায় দুই দিনব্যাপী ওআইসির চতুর্থ বিশেষ সম্মেলনে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন ইস্যুর পাশাপাশি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অবস্থা বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে কূটনীতিকরা ধারণা করছেন। সৌদি আরব ইতিমধ্যে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য আর্থিক সহযোগিতা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য ওআইসির পক্ষ থেকে সাহায্য পাঠানোর ব্যাপারেও মিয়ানমার সরকারের অনুমতি মিলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত সমালোচিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি জোর দিয়ে তুলবে। বাংলাদেশ চায়, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হোক। কিন্তু মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ না নিয়ে নতুন করে শরণার্থী নেওয়ার আহ্বানকে বাংলাদেশ সমর্থন করে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, শরণার্থীবিষয়ক সনদে স্বাক্ষরকারী না হয়েও বাংলাদেশ আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করছে। কয়েক দশক ধরে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার পরও যদি বাংলাদেশের ওপর নতুন করে চাপ দেওয়া হয়, তবে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। বরং এ সমস্যা সমাধানে সবার এগিয়ে আসা উচিত।

No comments

Powered by Blogger.