অর্থমন্ত্রী মুহিতের সাফ কথা ॥ দারিদ্র্য ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানালেন প্রধানমন্ত্রী-লন্ডনে গ্লোবাল নিউট্রিশন সম্মেলনে ভাষণ by ওবায়দুল কবির

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারিদ্র্য ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা আজ আর কেবল কোন একক দেশের জাতীয় ইস্যু নয়। বরং এর প্রভাব বিশ্বের সর্বত্রই। সমগ্র বিশ্বকে তাদের সম্পদ কাজে লাগানো, অভিজ্ঞতা, গবেষণালব্ধ ফলাফল ও প্রযুক্তি ভাগাভাগি


এবং এসব ইস্যুতে কৌশলগত বিভিন্ন দিকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নে নিজেদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল নিউট্রিশন সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণে ক্ষুধা এবং অপুষ্টি দূরীকরণে সহায়ক নীতি হিসেবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত প্রচেষ্টা নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এসব উদ্যোগের মধ্যে খাদ্যশস্যের আঞ্চলিক মজুত, খাদ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা বা কোন কারণে নিষেধাজ্ঞা থাকলে সে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারমূলক সুযোগের নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে গ্লোবাল নিউট্রিশন সম্মেলনে ভাষণদানকালে বলেছেন, মানবজীবনে ক্ষুধা সম্ভবত তীব্র যন্ত্রণা ও বেদনাদায়ক একটি অভিজ্ঞতা। ‘ক্ষুধা ও অপুষ্টি’ মানুষের জীবনে একটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য চ্যালেঞ্জ যা মানুষকে প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এক শ’ কোটি ক্ষুধার্ত ও পুষ্টিহীন মানুষ এই পৃথিবীকে বিপন্ন করে তুলছে। এদের ৯৭ ভাগ লোক বসবাস করে উন্নয়নশীল দেশে। এই মানুষগুলো ব্যাপক আকারে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে এবং এমনকি এদের মৃত্যু ঝুঁকিও রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, অপুষ্টির শিকার শিশুদের শরীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। তীব্র ক্ষুধার কারণে উন্নয়নশীল দেশে বসবাসকারী ১৪ কোটি ৬০ লাখ লোকের ওজন কম। উন্নয়নশীল দেশে স্কুলমুখী হওয়ার আগেই ১৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি শিশুর শারীরিক ও মানষিক বিকাশ ব্যহত হওয়ার মুখোমুখি। গ্লোবাল হাঙ্গার সূচকে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বে অপুষ্টির শিকার শিশুদের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াই শীর্ষ স্থানে রয়েছে। নিউট্রিশন সংক্রান্ত জাতিসংঘের স্ট্যান্ডিং কমিটির (এসসিএন) দেয়া তথ্যমতেও পৃথিবীতে রোগশোক সৃষ্টির সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পুষ্টিহীনতা।
প্রধানমন্ত্রী গ্লোবাল নিউট্রিশন সম্মেলনে যোগ দিতে তিন দিনের সরকারী সফরে শনিবার বিকেলে লন্ডনে পৌঁছলে তাঁকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানানো হয়। রবিবার সেন্ট প্যানক্রাস রেঁনেসা হোটেল থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সরকারী বাসভবন ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে আয়োজিত গ্লোবাল হাঙ্গার সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে অনুষ্ঠানের কো-চেয়ার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও ব্রাজিলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট মাইকেল তেমের ভাষণ দেন।
সম্মেলনে যোগদান শেষে প্র্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডন অলিম্পিকের সমাপনী অনুষ্ঠানেও যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, এ্যাম্বাসেডর এট লার্জ মোঃ জিয়াউদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী কাল মঙ্গলবার ১৪ আগস্ট সকালে দেশে ফিরবেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে আরও বলেন, বিশ্বে অপুষ্টির শিকার শিশুদের মধ্যে ৬ ভাগ বাংলাদেশে। আমাদের সরকারের বাস্তবমুখী নীতিমালা ও পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে প্রতিদিন দরিদ্র লোকের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০১৫ সালের মধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এমডিজি) ১৪ ভাগের যে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, তা আমরা পূরণ করতে পারব বলে মনে করছি। আমাদের সরকারের গত সাড়ে তিন বছরে অপুষ্টির শিকার দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪২ ভাগ থেকে কমিয়ে ৩৬ ভাগে আনতে সক্ষম হয়েছে। আমরা আশা করছি ২০১৫ সালের মধ্যে কম ওজনের শিশুদের সংখ্যা ৩৬ দশমিক ৫ ভাগে নামিয়ে আনতে পারব।
অপুষ্টিরোধে তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এক-তৃতীয়াংশ নারী অপুষ্টির শিকার এবং গর্ভবতী নারীদের বড় একটি অংশ রক্তশূন্যতায় ভোগে। শিশু ও মাতৃত্বকালীন অপুষ্টি কমিয়ে আনতে আমাদের সরকার শিশুদের জীবনের প্রথম এক হাজার দিন এবং গর্ভাবস্থা থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত মায়েদের নজরদারির আওতায় রেখেছি। তিনি বলেন, প্রসবউত্তর সন্তানের পুষ্টিমান বজায় রাখা ও প্রসবকালে অপুষ্টির শিকার শিশুর হার কমিয়ে আনার জন্য মেয়েদের দেরিতে বিয়ে দেয়াকে আমরা উৎসাহিত করছি।
শেখ হসিনা বলেন, সামগ্রিকভাবে আমরা যে বহুমুখী প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছি তার কারণে দারিদ্র্য ১০ ভাগ হ্রাস করতে সফল হয়েছি। এ লক্ষ্যে যে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে নগদ ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচী, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প, গ্রামাঞ্চলে গৃহায়ন প্রকল্প, বিধবা ও বৃদ্ধাদের বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত, শারীরিক-মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে এমন প্রান্তিক লোকদের জন্য নানা সহায়তা কর্মসূচী ইত্যাদি। এসব কর্মসূচী হাতে নেয়ার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৫ ভাগে নামিয়ে আনা।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই সক্রিয় ১১ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে অপুষ্টি হ্রাস এবং বিদ্যমান স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের পুষ্টিমান বজায় রাখার জন্য আমরা ৫ বছরব্যাপী ন্যাশনাল নিউট্রিশন সার্ভিস (এনএনএস) চালু করেছি। খাদ্য নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য চর্চা, পানি ও স্যানিটেশন, টিকাদান কর্মসূচী ও স্বাস্থ্য শিক্ষার উন্নয়নে আমরা ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
তিনি বলেন, এর আগেরবার আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম (১৯৯৬-২০০১) তখন বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। তার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বাংলাদেশকে ‘সেরেস’ পদক প্রদান করে। বর্তমান সরকারের আমলে অনাবৃষ্টি ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু উচ্চ পুষ্ঠিমানসমৃদ্ধ বিভিন্ন ধরনের ধানসহ খাদ্য পণ্যের উৎপাদনের জন্য আমরা নানামুখী গবেষণাকর্ম চালিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ আবারও ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নানামুখী পদক্ষেপের কারণে বর্তমান সরকারের আমলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ ভাগ অর্জন সম্ভব হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যু সংক্রান্ত এমডিজি-৪ এবং মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার সংক্রান্ত এমডিজি-৫ এর লক্ষ্য অর্জন করা। তিনি বলেন, আমাদের টার্গেট হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যসীমা থেকে তুলে আনা।
বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে শেখ হাসিনা বলেন, সমুদ্রের পানির স্তর ও বিশ্বের তাপামাত্রা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জের মুখে আমাদের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা আজ আর কেবল কোন জাতীয় ইস্যু নয়। তিনি বলেন, সমগ্র বিশ্বকে তাদের সম্পদ কাজে লাগানো, অভিজ্ঞতা, গবেষণালদ্ধ ফলাফল ও প্রযু্িক্ত ভাগাভাগি করা এবং এসব ইস্যুতে কৌশলগত বিভিন্ন দিকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নে নিজেদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।
শেখ হাসিনা জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করে বলেছেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যাচ্ছে, লবণাক্ত পানি ঢুকে ফসল উৎপাদনকে ব্যহত করা ছাড়াও দফায় দফায় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছে এবং এর ফলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে শষ্য উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং এর ফলে শষ্য ও মাংসের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। মানুষের ভোগের ক্ষমতা হ্রাস পাবে।
শেখ হাসিনা বলেন, কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ১০ ভাগ ফসল উৎপাদন কমে গেছে। অর্থাৎ জলবায়ুর কারণে ৪০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য কম উৎপন্ন হচ্ছে। এটা জিডিপির ২ দশমিক ৫ ভাগ। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও অনেক বৃদ্ধি পেত। শেখ হাসিনা বলেন, এসব সমস্য কাটিয়ে উঠতে অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের ব্যাপকভিত্তিক যথাযথ মনযোগ দিতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.