এ্যালার্জিক রাইনাইটিস

এ্যালার্জি বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের কাছে এক অসহনীয় ব্যাধি। এ্যালার্জি হাঁচি থেকে শুরু করে খাদ্য ও ওষুধের ভীষণ প্রতিক্রিয়া ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। হাঁচি হলো এবং এবং নাক দিয়ে পানি পড়ল, এটা কোন রোগ হলো? প্রথম প্রথম কেউই এ লক্ষণগুলোকে রোগ বলে মনে করেন না।


সবাই স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে করেন এবং মনে করেন আপনা-আপনিতেই সেরে যাবে কিন্তু যখন তখন হচ্ছে বিশেষত পুরনো জিনিসপত্র পরিষ্কার করতে গেলে বা ফুলের গন্ধ নেয়ার সময় বা ফুলের বাগানে পায়চারি করার সময় এবং প্রায় সময় যখন অনবরত হাঁচি বা নাক বন্ধ হয়ে যায় তখন এ লক্ষণগুলোকে রোগ হিসাবে ভাবতে শুরু করেন এবং নিজে নিজেই অথবা ওষুধের দোকানদারের সাথে আলাপ করে দু-একটি এন্টিহিস্টামিন খেতে শুরু করেন। এন্টিহিস্টামিন খেলে অবশ্য রোগের লক্ষণ কিছুটা উপশম হয়। কিন্তু যখন বার বার হয় তখন স্থানীয় যে কোন ডাক্তার এবং পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তখন এন্টিহিস্টাসিনের পাশাপাশি স্প্রে আকারে স্টেরয়েড নাকের নাসারন্ধ্রে ব্যবহার করতে বলেন। এতে অবশ্য রোগী পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি ভাল অনুভব করেন। কিন্তু দুঃখ হলো বাস্তব সত্য যে যতদিন নেসাল স্টেরয়েড ব্যবহার করেন তত দিনই ভাল থাকেন, যেই নাকের স্প্রে বন্ধ করেন তার সাথে সাথে না হলেও কিছুদিন পরই শুরু হয় তার সেই পূর্বাবস্থা, এগুলো হলো আপনি এ্যালার্জিজনিত রোগে বিশেষত এ্যালার্জিক রাইনাইটিস রোগে ভুগছেন ধরে নিতে হবে। তাহলে এই এ্যালার্জিক রাইনাইটিস রোগটি কি, কেন হয় এবং কিভাবে এড়ানো যায় তা নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।
এ্যালার্জিক রাইনাইটিস রোগটি হলো এ্যালার্জিজনিত নাকের প্রদাহ। উপসর্গগুলো হচ্ছে অনবরত হাঁচি, নাক চুলকানো, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, কারো কারো চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যায়।
প্রকারভেদ:
সারা বছর সার্বক্ষণিক এ্যালার্জিক রাইনাইটিস : সারা বছর ধরেই এই রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। বিশেষ করে পুরাতন ধুলাবালি (যাতে মাইট থাকে), ছত্রা বা পোষা প্রাণীর লোম সংস্পর্শে এলেই এর লক্ষণ শুরু হয়।
ঋতুনির্ভর এ্যালার্জিক রাইনাইটিস : অনেক ঋতুতে ফুলের রেণু আধিক্য থাকে এবং ঐ রেণুর সংস্পর্শ এলেই রোগের লক্ষণগুলো দেখা দেয়। সাধারণত গ্রীষ্মের শেষে এবং বর্ষা ও শরতে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
বার বার রোগাক্রান্ত হওয়ার মাত্রা : যদিও বাংলাদেশে কতজন এই রোগে ভুগে থাকেন তার সঠিক তথ্য নেই তবে মোট জনগণের ১০-১৫ ভাগ ভুগে থাকেন বলে অনেকের ধারণা। বিশ্বের কোন দেশ, বিশেষত অস্ট্রেলিয়াতে ৩০ ভাগ জনগণ এ রোগে ভুগে থাকেন।
যদিও এ রোগের লক্ষণ যে কোন বয়সেই দেখা দিতে পারে তবে শিশুদেরই এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায় বেশি।
যদিও এ রোগটি বংশানুক্রমিক তথাপি বার বার একই এলারজেনের সংস্পর্শে এলেই রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাছাড়া নতুন পোষ্য প্রাণী অথবা বাসস্থান পরিবর্তনে নতুন পরিবেশে এ্যালার্জিক রাইনাইটিস রোগের লক্ষণ প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
কিভাবে এ্যালার্জি নাকে উপসর্গগুলো ঘটায় : যে সমস্ত রোগীর বংশানুক্রমিকভাবে এ্যালার্জি হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু কিছু এলারজেনের সংস্পর্শে এলে রক্তে আইজিই এর মাত্রা অনেক বেড়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গাতে বিশেষত নাকে অবস্থিত মাস্টসেল নামক এক ধরনের কোষের সঙ্গে লেগে থাকে। কোনভাবে শরীর আবার এই এলারজেনের সংস্পর্শে এলে মাস্টসেলগুলো ভেঙ্গে যায় এবং এর থেকে ভাসো একটিভএমাইনো নির্গত হয় এবং এই রাসায়নিক পদার্থগুলো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং উপসর্গগুলো ঘটায়।
এ রোগের সম্ভাব্য কারণগুলো হলো : মাইট (যা পুরাতন ধুলা বালিতে থাকে) ঘরের ধুলা ময়লা, ফুলের রেণু, প্রাণীর পশম বা চুল, প্রসাধন সামগ্রী।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কি? রক্ত পরীক্ষা বিশেষত ইয়োসিনোফিলের মাত্রা বেশি আছে কিনা তা দেখা।
সিরাম আইজিই এর মাত্রা : সাধারণত এ্যালার্জি রোগীদের ক্ষেত্রে আইজিই এর মাত্রা বেশি থাকে।
স্কিন প্রিক টেস্ট : এই পরীক্ষায় রোগীর চামড়ার ওপর বিভিন্ন এলারজেন দিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং এই পরীক্ষাতে কোন কোন জিনিসে এ্যালার্জি আছে ধরা পড়ে। সাইনাসের এক্স-রে:
সমন্বিতভাবে এ রোগের চিকিৎসা হলো:
এলারজেন পরিহার : যখন এ্যালার্জির সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় তখন তা পরিহার করে চললেই সহজ উপায়ে এ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ওষুধ প্রয়োগ : ওষুধ প্রয়োগ করে সাময়িকভাবে এ্যালার্জির উপশম অনেকটা পাওয়া যায়। এ রোগের প্রধান ওষুধ হলো এন্টিহিস্টামিন ও নেজাল স্টেরয়েড। এন্টিহিস্টামিন, নেসাল স্টেরয়েড ব্যবহার রোগের লক্ষণ তাৎক্ষণিকভাবে উপশম হয়। যেহেতু স্টেরয়েডের বহুল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া তাই এ ওষুধ এক নাগাড়ে বেশিদিন ব্যবহার করা যায় না। যতদিন ব্যবহার করা যায় ততদিনই ভাল থাকে এবং ওষুধ বন্ধ করলেই আবার রোগের লক্ষণগুলো দেখা দেয়।
এ্যালার্জি ভ্যাকসিন বা ইমুনোথেরাপি : এ্যালার্জি দ্রব্যাদি থেকে এড়িয়ে চলা ও ওষুধের পাশাপাশি ভ্যাকসিন বা ইমুনোথেরাপি এ্যালার্জিক রাইনাইটিস রোগীদের সুস্থ থাকার অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি। এ্যালার্জি ভ্যাকসিনের মূল উদ্দেশ্য হলো যে মাইট দ্বারা এ্যালার্জিক রাইনাইটিস সমস্যা হচ্ছে সেই মাইট এ্যালারজেন স্বল্পমাত্রায় প্রয়োগ করাহয়। ক্রমান্বয়ে সহনীয় বেশি মাত্রায় দেয়া হয় যাতে শরীরের এ্যালার্জির কোন প্রতিক্রিয়া দেখা না দেয় কিন্তু শরীরের ইমিউন সিস্টেমের পরিবর্তন ঘটায় বা শরীরের এ্যালার্জির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলে অর্থাৎ আইজিই-কে আইজিজি-তে পরিণত করে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি এ্যালার্জির ওষুধ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যদিও ওষুধে উপসর্গের কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসে কিন্তু এ্যালার্জির কোন পরিবর্তন করতে পারে না, বিশেষত স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ এ্যালার্জির জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক। যেহেতু এই ওষুধ বেশিদিন ধরে ব্যবহার করতে হয় তা এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ ধরনের এ্যালার্জিক রাইনাইটিসের ক্ষেত্রে ইমুনোথেরাপি বা ভ্যাকসিন বেশি কার্যকর।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বিশেষ উন্নত দেশগুলোতে ও পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই ভ্যাকসিন পদ্ধতির চিকিৎসাকে এ্যালার্জিক রাইনাইটিস রোগের অন্যতম চিকিৎসা বলে অভিহিত করেন। এটাই এ্যালার্জিক রাইনাইটিস রোগীগের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ থাকার একমাত্র চিকিৎসা পদ্ধতি।
আগে ধারণা ছিল এ্যালার্জি একবার হলে আর সরে না। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। প্রথম দিকে ধরা পড়লে এ্যালার্জিজনিত রোগ একেবারে সারিয়ে তোলা সম্ভব। অবহেলা করলে এবং রোগ অনেক দিন ধরে চলতে থাকলে নিরাময় করা কঠিন হয়ে পড়ে। উন্নত দেশের সকল প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা বর্তমানে বাংলাদেশেই রয়েছে। তাই সময়মতো এ্যালার্জি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দেয়া উচিত।
ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

দি এ্যালার্জি এ্যান্ড এ্যাজমা সেন্টার
ফোন : ৮১২৯৩৮৩

No comments

Powered by Blogger.