ভোগান্তিবিহীন নিরাপদ যাত্রার আশায় ... by নিয়ামত হোসেন

ঈদের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের স্রোত যাবে রাজধানী থেকে নানা দিকে। ট্রেনে বাসে লঞ্চে যাবে অধিকাংশ মানুষ। এই সময় যাত্রী সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে, কোন পথেই ভিড় সামলানো যায় না, চাহিদা মতো সবাইকে টিকেট দেয়া যায় না। যানের সংখ্যা যত বাড়ানো হোক, তাতেও কুলায় না।


তাই টিকেট পেয়ে একদিকে অনেক মানুষ আনন্দিত হন। আবার না পেয়েও অনেকেই হতাশা হয়ে অন্য পথে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই কয়েকটা দিন ঘটে এমন সব ঘটনা। দুই ঈদের সময় যাত্রীদের এত ভিড়। যাত্রী সংখ্যার চেয়ে যান তথা যানের আসন সংখ্যা কম হওয়াতেই এই সমস্যা হয়, তারপর ঠাসাঠাসি গাদাগাদি করে গেলেও লঞ্চেও থাকে খানিকটা ভয়; দেখা যায় কোন ধারণক্ষমতার চাইতে বেশি যাত্রী এবং মাল নিয়েছে। বাসে গেলেও রাস্তার দুর্দশা বা যানজটের কারণে বাড়ে দুশ্চিন্তা। প্রতিবারই এমন দুশ্চিন্তা ও দুর্ভোগ থাকে কম বেশি। এবারও সড়ক মেরামত এবং যাত্রীদের যাত্রা সহজ ও নিরাপদ করার জন্য সরকারীভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেল। দেখা যাক যাত্রী সাধারণের দুর্ভোগ কমলে সেটাই হবে লাখ লাখ মানুষের আনন্দ।
ঢাকা থেকে মানুষের ব্যাপক হারে মফস্বলে বাড়িতে ফেরার প্রসঙ্গ উঠে বছরে দু’বার দুই ঈদে। যেহেতু লাখ লাখ মানুষের যাওয়া, তাই আয়োজনও হয় বিরাট। ব্যবস্থা-অব্যবস্থাও ছোটখাটো নয়। পুরো বিষয়টাই মিডিয়ায় উঠে আসে। মিডিয়ায় এই দু’বারের যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তাতে দেখা যায় দুটি চিত্রই মোটামুটি অভিন্ন। বিভিন্ন দিন বিভিন্ন যানের আগাম টিকেট ছাড়া হয়। যেখানেই আগাম টিকেট সেখানেই আগাম ভিড়। সকালে টিকেট বিক্রি শুরু হবে তো রাত থাকতে লোকে লাইন দেয়। লাইনে দাঁড়ানোর জায়গা বিক্রিও হয়। কেউ একজন দাঁড়িয়ে গেছে লাইনে, সে টিকেট কিনবে না, কিন্তু তার অবস্থানটি বিক্রি করবে। যিনি দেরি করে এসেছেন তিনি অনেক সময়ই আগেই দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির কাছ থেকে তাঁর দাঁড়ানোর অবস্থানটি কিনে নিলেন। তাঁকে এজন্য আর বেশি পিছনে যেতে হলো না। সামনে জায়গা পেয়ে গেলেন। তার টিকেট পাওয়া অনেকটা নিশ্চিত হলো। বেশি পেছনে পড়ে গেলে কাউন্টারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে যদি শোনা যায়, ‘আর টিকেট নেই, শেষ হয়ে গেছে’ তাহলে লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করাটাই বৃথা গেল। টিকেট পাওয়ার আশায় লাইনে দাঁড়ানোর জায়গা কেনা, ইট দিয়ে জায়গা ‘পাকা’ করে রাখাÑএসব ব্যবস্থা অনেকদিন ধরে চালু।
দুই ঈদে ঘরে ফেরার টিকেট সংক্রান্ত যে খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় সে সবে দেখা যায় মোটামুটি একটি খবর : টিকেটের জন্য হাহাকার। ঘরে ফিরতে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা পরিবার যে জিনিসটা চান সেটা হচ্ছে আগে টিকেটের ব্যাপারটিতে নিশ্চিত হওয়া।
সেজন্য অগ্রিম টিকেট কিনতে চান তাঁরা। বিভিন্ন পরিবহন সংস্থা সেজন্যই অগ্রিম টিকেট ছাড়ে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অগণিত মানুষ টিকেট পায় না। হতাশ হয়ে পড়ে। নানা সময়ে দেখা গেছে, যাত্রীরা টিকেট পায়নি অথচ কালোবাজারে তা বিক্রি হচ্ছে। সেখানে টিকেট কিনতে হয় দ্বিগুণ-তিনগুণ দাম দিয়ে। কালোবাজারি ঠেকানোর জন্য পরিবহন সংস্থা কোন ব্যবস্থা নেয় না তা বলা যাবে না। তবে বেশির ভাগ সময়ে দেখা গেছে কালোবাজারি কম-বেশি প্রতিবছরই হয়েছে। কিছু লোক মুখিয়ে থাকে এত যাত্রী টিকেট কিনতে আসবে, এই তো সুযোগ। কিছু টিকেট কিনে নিয়ে এই সুযোগে টু-পাইস কামিয়ে নেয়া যাক। এই হচ্ছে অবস্থা। এই হচ্ছে মোটামুটি চিত্র। ঈদে ট্রেন বাস লঞ্চ ইত্যাদির আগাম টিকেট বিক্রি হয়। এবারও তাই হবে। এবারও মানুষ চেষ্টা করবে টিকেট সংগ্রহের জন্য। ছুটবে তাই বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারে কাউন্টারে।
এখানে একটা বিষয় সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে ভাবা প্রয়োজন। দুই ঈদে নিশ্চিতরূপে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ বাসে লঞ্চে রেলে করে নানা গন্তব্যে যাবে। পরিবহন সংস্থাগুলোর ব্যবসায়িক দিক থেকে আয়ের একটা বিরাট সুযোগ এ সময়। এ সময় যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দানের সুযোগও আসে। কোন সংস্থা কত সুন্দরভাবে আরামের সঙ্গে নিরাপদে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর এই কাজটি করতে পারে সেটাই দেখার বিষয়। যাত্রীদের যত ভাল সুবিধা ও আরামের ব্যবস্থা যে সংস্থা করতে পারবে, ব্যবসায় তার লাভও হবে, সুনামও বাড়বে। এজন্য যাত্রীসেবার মান যত বেশি সম্ভব বাড়ানো উচিত। ন্যায্য তথা নির্ধারিত ভাড়া যাতে সব ক্ষেত্রে নেয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত হয় সেটা দেখা উচিত। কিন্তু তারপরও দেখা গেছে, কোন কোন সংস্থা টিকেটের দাম বাড়িয়ে দেয়। যেখানে ব্যবসা ভাল হচ্ছে সেখানে ভাড়া বৃদ্ধি কেন? বরং পারলে এ সময় যাত্রীদের ভাড়ার ব্যাপারে ‘ছাড়’ দেয়া উচিত।
এবার টিকেটের ব্যাপারে যেসব রিপোর্ট পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোতে রয়েছে রেলের টিকেট সঙ্কটের কথা। ট্রেন মানুষের একটা প্রিয় যান। দুনিয়ার কোন কোন দেশে ট্রেনের উন্নয়ন এত হয়েছে যার তুলনায় আমাদের ট্রেন অনেক পিছিয়ে। এককালে ট্রেন চলত মূলত কয়লায়। বহু দেশে ট্রেন চলে এখন বিদ্যুতে। ট্রেন শুধু মাটির ওপর দিয়েই চলে না, মাথার ওপর দিয়েও চলে, মাটির নিচ দিয়েও চলে, বলতে গেলে সাগরের নিচ দিয়েও চলে। ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে যে রেলপথ নিচ দিয়ে গেছে মূলত সেটিকে সাগরতলের ট্রেন বললে ভুল বলা হবে না। ট্রেন শুধু স্বচ্ছন্দ ভ্রমণের জন্যই নয়, তুলনামূলকভাবে নিরাপদও। বিদেশে ট্রেনে যাওয়ার আরাম বিমানে যাওয়ার আরামের মতোই। ট্রেনের এই অগ্রগতির যুগে আমরা অনেক পিছিয়ে। মাটির তলায় ট্রেন বা মেট্রোরেল দুনিয়ার অনেক শহরেই আছে, আমাদের ঢাকা নগরীতে এত কালেও হলো না, যাতে হয় তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে প্রাথমিকভাবে। দেখা যাক, কবে হয়।
আমাদের ট্রেন ব্যবস্থার উন্নয়ন চায় দেশবাসী। শুধু উন্নয়নই নয়, সম্প্রসারণও চায়। ঢাকার আশপাশের জেলা ও বিভিন্ন এলাকা থেকে সহজেই ট্রেন অল্প সময়ে ঢাকায় আসতে পারে। বহু লোক ঢাকার বাইরে থেকে এসে অফিস করতে পারবে এখানে। সেজন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে রেলপথের সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে, নতুন নতুন লাইন স্থাপন করতে হবে। নতুন নতুন রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে ঢাকার ওপর মানুষের চাপ কমবে, রাজধানীর আবাসিক সঙ্কটও অনেকখানি কমবে, এখানকার পরিবেশেরও উন্নতি হবে। যাই হোক, ঈদ উপলক্ষে এবারও অতিরিক্ত ট্রেন দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। ব্যাপক সংখ্যক মানুষ যাতে রেলের দেয়া সুবিধা ভোগ করতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
বাস যোগাযোগের একটা বড় মাধ্যম। এদেশে বাসের অনেকখানি উন্নতি হলেও বাস চলাচলের রাস্তার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। গত ঈদ-উল-ফিতরের সময় ভাঙ্গা রাস্তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে। এবার রাস্তার অবস্থা অতটা খারাপ নয়। এবার লোক অনেকখানি ক্লেশবিহীনভাবে বাসে করে বাড়ি ফিরতে পারবে বলে আশা করা যায়। বাসের টিকেট যদি কাউন্টারে না পেয়ে কালোবাজারে অত্যধিক দামে কিনতে হয় তাহলে ক্লেশ বাড়বে বৈ কমবে না। এই বিষয়টি বিশেষভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেখা উচিত।
লঞ্চ দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান বাহন। সদরঘাট থেকে দেশের নানা স্থানে লঞ্চ ছাড়বে। লঞ্চের টিকেট নিয়েও প্রায় প্রতিবছর হাহাকার হয়। সেখানেও কাউন্টারে অনেক সময় টিকেট থাকে না, কালোবাজারে টিকেট পাওয়া যায়। এবার সব পরিবহনই বাড়ানো হয়েছে। সেজন্য যাতে সুষ্ঠুভাবে সব যাত্রী যেতে পারে তার ব্যবস্থাটি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
লাখ লাখ লোক দুই ঈদে ঢাকার বাইরে যায়। কোন বছর কত লোক ঢাকার বাইরে গেল তার যেমন কোন সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না, তেমনি কোন ঈদে কত লোক গেল তারও পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয়, কোরবানির ঈদেই বেশি লোক যায়। গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে কোরবানির ঈদ উদযাপন করাটাই আসল লক্ষ্য। সেজন্য অনেকেই যান এই ঈদে। এবারও যাবেন অনেকেই। এত মানুষের জন্য যানবাহন এবং প্রথমত সেসবের টিকেটের ব্যবস্থা করা বিশেষ জরুরী। এখন শুরু হয়ে গেছে টিকেট সংগ্রহের পালা। মানুষের ছোটাছুটি বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে চিন্তা।
প্রতিবছরই কিছু না কিছু দুর্ভোগ মানুষকে পোহাতেই হয়। কোন বছর বেশি কোন বছর কম। রাস্তার ভাঙ্গাচোরা অবস্থাটা বহু মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ। তারপরও অতি দ্রুত রাস্তা মেরামত করার উদ্যোগ নিয়ে মোটামুটি চলার উপযোগী করা হচ্ছে ঈদের আগেই। রাস্তার সংস্কারও করা হয়েছে। আশা করা যায়, ভালভাবেই যাওয়া যাবে। ঈদ প্রায় আসন্ন। বহু মানুষ বহু পরিবার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঘরে ফেরার জন্য। রেল বাস লঞ্চে করে অধিকাংশ মানুষ ঘরে ফিরবে। এখন যাতে ভাড়া বাড়ানো না হয়, অধিক যানের যাতে নিশ্চয়তা থাকে, ঠাসাঠাসি গাদাগাদি করে যাতে যাত্রী বোঝাই করা না হয়, পথে কোন প্রকার চাঁদাবাজির মধ্যে কাউকে পড়তে না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীদের কোনভাবেই যাতে কোন প্রকার দুর্ভোগ বা বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ ঘরে ফিরছে আনন্দের জন্য, কোন প্রকার বিড়ম্বনা যাতে এই ঘরে ফেরার আনন্দকে ম্নান করতে না পারে সেটা নিশ্চিত রাখতে হবে। সেটাই এখন জরুরী।

No comments

Powered by Blogger.