পুলিশের ভেতরে-বাইরে-পুলিশ চলছে রাজনৈতিক তদবিরে, চাপা ক্ষোভ by কামরুল হাসান

পুলিশের নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতি-বদলি এমনকি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়া—সবকিছুতেই চলছে রাজনৈতিক তদবির। ‘ভালো’ বদলি বা পদোন্নতি পেতে পুলিশ কর্মকর্তারা দৌড়াচ্ছেন রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে সদর দপ্তর।


থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) কথা শোনেন না পুলিশ সুপারদের, এ অভিযোগ অনেক পুরোনো। এখন সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বলছেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কথা শোনেন না। কারণ, তাঁদের বদলি-পদোন্নতি, মিশনে যাওয়া এখন আর সদর দপ্তরের হাতে নেই। পুলিশ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বাহিনীতে এখন দুটি বিষয় নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ রয়েছে। একটি বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতি-বঞ্চিত করা, আরেকটি পুলিশ পরিদর্শক ও উপপরিদর্শকদের পদ উন্নীত না করা।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এএসএম শাহজাহান এ প্রসঙ্গে বলেন, পুলিশের বদলি, পদোন্নতি, মিশনে যাওয়া—এসব স্বচ্ছ না হলে বাহিনীর কাজের ওপর এর প্রভাব পড়বে। এটা অবশ্যই নিয়মিত হওয়া উচিত।
বর্তমান আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, সদর দপ্তরের কথা না শুনলে এত বড় বাহিনী চলছে কী করে। তিনি বলেন, দাবি থাকা অস্বাভাবিক নয়। এ নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু শৃঙ্খলাবহির্ভূত কিছুই হচ্ছে না।
নিয়োগ: ২০১০ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ৪৩৪ জন উপপরিদর্শক (এসআই) নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। লিখিত পরীক্ষার আগেই ১০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও ৩৩ সাংসদ ২০০ প্রার্থীর জন্য সুপারিশ করেন। গত দুই বছরে নিয়োগ পেয়েছেন দুই হাজার ৪২৮ জন এসআই। অভিযোগ উঠেছে, বেশির ভাগ নিয়োগ হয়েছে সরকারি দলের নেতাদের সুপারিশে। নিয়োগের জন্য লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ শাখা সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ৩২ হাজার ৩১ জন পুলিশ নিয়োগের কথা ঘোষণা করে। তিন বছরে ২৭ হাজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকিদের নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা এক লাখ ৪৮ হাজার ২০০। এর মধ্যে কনস্টেবল এক লাখ চার হাজার।
পুলিশ কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব নিয়োগের পুরোটা এখন তাঁদের হাতে নেই। ২০১০ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া তালিকায় দেখা গেছে, এসব নিয়োগে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, মেয়র, সাংসদ, সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, সরকারি দলের নেতা, এমনকি কর্মীরাও তদবির করেছেন।
বেশির ভাগ জেলায় পুলিশ কনস্টেবল পদে লোক নিয়োগ করা হয়েছে সাংসদের দেওয়া তালিকা অনুসারে। একাধিক জেলার পুলিশ সুপার এসব নিয়ে আইজিপির কাছে অভিযোগও করেন। একটি জেলার পুলিশ সুপার নিয়োগ স্থগিতও করেছিলেন। নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা সনদ জাল করার ঘটনাও ঘটেছে। গত বছর এমন একটি ঘটনা ধরা পড়ার পর ২২ জন প্রার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শুধু তাই নয়, জেলায় এসআই পদের কোটা বাড়ানোর ব্যাপারেও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সাংসদেরা তদবির চালিয়েছেন।
সাবেক আইজিপি ইসমাইল হোসেন গত ২ জুন প্রথম আলোর গোলটেবিল আলোচনায় বলেন, পুলিশের নিয়োগ-বদলি স্বচ্ছ নয়। এটা করা হচ্ছে দলের তালিকা অনুসারে। এতে কখনো ভালো পুলিশ আশা করা যাবে না।
আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, সুপারিশ যে কেউ করতে পারেন, সেটা বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সেটাই বড় ব্যাপার। নিয়োগ কমিটি যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দিয়ে থাকে, সুপারিশে নয়।
শান্তিরক্ষা মিশন: পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যেতেও পুলিশ কর্মকর্তারা রাজনৈতিক নেতাদের তদবির নিয়ে হাজির হচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রীতিমতো তালিকা পাঠিয়ে মিশনে লোক পাঠাতে বলা হচ্ছে। শুধু রাজনৈতিক নেতারাই যে তালিকা করছেন তা নয়, অনেক আমলাও নিজের পছন্দের লোকের নাম তালিকায় ঢুকিয়ে দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক তদবিরের কারণে যোগ্য পুলিশ সদস্যরা শান্তিরক্ষা মিশনে যেতে পারছেন না। এ নিয়ে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
জানতে চাইলে পুলিশ প্রশাসনের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়। পুলিশ প্রশাসন বৈধ তালিকা অনুসারেই সদস্যদের শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠায়।
পদ উন্নীতকরণ: প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও পুলিশের পরিদর্শকদের পদমর্যাদা প্রথম শ্রেণী এবং উপপরিদর্শকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন মাঠপর্যায়ের সদস্যরা। পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) থেকে কনস্টেবল পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা মনে করেন, এর পেছনে একজন মন্ত্রীর ভূমিকা রয়েছে।
পদমর্যাদার উন্নয়ন-সংক্রান্ত ফাইল ওই মন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ের টেবিলে পড়ে আছে বলে দাবি করে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুবার বলার পরও এ-সংক্রান্ত ফাইল অর্থমন্ত্রীর টেবিলে পড়ে আছে। এ নিয়ে তাঁরা ওই মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছেন বলেও জানান।
পুলিশ সদর দপ্তরের নিয়োগ ও মানবসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক আতিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের পদোন্নতির বিরোধিতা করে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সেটা ফেরত পাঠিয়ে অবিলম্বে এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বিষয়টি নিয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শহীদুল হকের সঙ্গে দেখা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে শহীদুল হক বলেন, ‘আমার সঙ্গে দেখা করে তাঁরা ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। পুলিশ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। সে অনুযায়ী তাদের কাজ করার পরামর্শ দিয়েছি।’
বদলি-পদোন্নতি: কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার অভিযোগ, পুলিশের বদলি ও পদোন্নতিতে এখন পুলিশ প্রশাসনের কোনো হাত নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতারা চাপ দিয়ে বদলি করতে বাধ্য করছেন। সর্বশেষ ১৪৬ কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। এতে ৪৩ জনকে ডিঙিয়ে ৩৯ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। সংসদ ভবনের সামনে প্রকাশ্যে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে নির্যাতনকারী কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদকে পদোন্নতি দিতে ৪৩ জনকে ডিঙানো হয়েছে। তেজগাঁও বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার হারুন এখন লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সবচেয়ে বড় অসন্তোষ বিভাগীয় পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি না দেওয়া নিয়ে। ইন্সপেক্টর থেকে সহকারী পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি নিয়ম অনুসারে একই বছরে পদোন্নতিপ্রাপ্ত বিভাগীয় কর্মকর্তারা বিসিএসের মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের ওপরে জ্যেষ্ঠতা পাবেন। কিন্তু চলতি বছর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের। এখন ২৫তম বিসিএসে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তাকে জ্যেষ্ঠতা দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যার কারণে বঞ্চিত হবেন বিভাগীয় পদোন্নতি পাওয়া ৪৩ জন কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রসচিব সি কিউ কে মুশতাক আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, বদলি, পদোন্নতি—এসব নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ থাকতে পারে। তবে পর্যায়ক্রমে এসব ঠিক করা হচ্ছে। কাউকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না। তবে নিয়োগ ও মিশনে যাওয়ার ব্যাপারে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা ঠিক নয়। নিয়মের বাইরে কিছুই করা হচ্ছে না।
থানা প্রশাসন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কিংবা পুলিশের মহাপরিদর্শকের কথাও অনেক সময় শুনছেন না থানার ওসি কিংবা কর্মকর্তারা। তাঁরা যোগাযোগ রাখছেন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে। ফলে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এখন সরকারি দলের আশীর্বাদপুষ্ট লোকদেরই প্রাধান্য। রাজধানীর থানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, রাজনৈতিক তদবির ছাড়া মামলা হচ্ছে না। আসামি গ্রেপ্তার, মামলা থেকে আসামির নাম বাদ দেওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুই হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। ওসি নিয়োগ, বদলি, থানা বদল সবকিছুই করছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। রাজনৈতিক তদবিরে বদলি হওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতনদের মানতে চান না। তাঁরা নিজেদের সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে করছেন। এ ধরনের মধ্যম শ্রেণীর কর্মকর্তারা বাহিনীতে নানা ধরনের সংকট তৈরি করছেন বলে অনেকে মনে করছেন।
তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম বলেন, থানার ওসিরা কথা শোনেন না, এ অভিযোগ সঠিক নয়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ধানমন্ডি থানার সদ্য বদলি হওয়া ওসি মনিরুজ্জামান একজন সাংসদকে লাঞ্ছিত করেছিলেন। পরে দুর্ঘটনায় একজন সাংবাদিক নিহত হওয়ার পর ওই ওসি সাংবাদিকদের সঙ্গেও মারমুখী আচরণ করেন। পরে সাংবাদিকেরা প্রায় এক মাস আন্দোলন, থানা ঘেরাও করার পর তাঁকে সরানো হয়। অভিযোগ আছে, ধানমন্ডি এলাকার সাংসদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে তাঁকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কিছু করতে পারছেন না।
ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার ওসিকে বদলির পর রাজনৈতিক চাপে আবারও তাঁকে আগের পদে বহাল করতে বাধ্য হয়েছিলেন ঢাকা রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি মোখলেসুর রহমান।

No comments

Powered by Blogger.