এমভি নাসরিন ট্র্যাজেডির দিন আজ-এত দুর্ঘটনার পরও মানা হয় না নৌ-নিরাপত্তার নিয়মনীতি by অরূপ দত্ত

২০০৩ সালের ৮ জুলাই ঘটেছিল দেশে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় নৌ-দুর্ঘটনাটি। এমভি নাসরিন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল আট শতাধিক মানুষ। কিন্তু সেই মর্মন্তুদ ঘটনার আট বছর পরও নৌ-নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার হয়নি। তখন থেকে ঘটেছে আরও তিন শতাধিক নৌ-দুর্ঘটনা, যার প্রধান কারণ নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা।


পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালের জুলাইতে এমভি নাসরিন বিপর্যয়ের পর সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলোতে প্রাণ হারায় তিন হাজার ৫২২ জন।
এমভি নাসরিনসহ বিভিন্ন লঞ্চ দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়েছে। নৌযানের নির্মাণ ত্রুটি দূর করা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও ডেকে মালামাল বহন বন্ধ করা, পর্যাপ্ত লাইফবয়া, প্লাস্টিক বল, দড়ি ইত্যাদি রাখা, দোষীদের শাস্তি দেওয়াসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। নেই কারও কঠোর শাস্তি পাওয়ার নজির।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান মো. শামছুদ্দোহা খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে প্রধানত মাস্টার-চালকদের অবহেলার কারণে। যেমন, সম্প্রতি চাঁদপুরে এক নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে ক্যাপ্টেনের পরিবর্তে সুকানি লঞ্চ চালাচ্ছিল বলে।’
জাহাজ মালিকদের সংগঠন অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যা-প) সংস্থার সহসভাপতি শাহাবুদ্দিন মিলন বলেন, ‘মাস্টার-চালকদের অবহেলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে এটা ঠিক। কিন্তু সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরও লোকবলের অভাবের অজুহাতে নৌ-নিরাপত্তার দিকটি ঠিকভাবে দেখে না।’
বক্তৃতার প্রয়োগ নেই: গত ২৯ এপ্রিল সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর আয়োজিত নৌ-নিরাপত্তা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলা হয়েছিল, বর্ষা মৌসুমে লঞ্চ টার্মিনালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কোস্টগার্ডের বাড়তি সদস্য সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবেন। কিন্তু গত বুধবার দুপুরে পুরো ঢাকা সদরঘাট টার্মিনাল ঘুরে মাত্র চারজন কোস্টগার্ড দেখা যায়। তবে টার্মিনালে কর্মরত অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একজন কর্মী বলেন, আরও কয়েকজন কোস্টগার্ড সদস্য নদীতে টহলে রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বা পরিদর্শকদের পালাক্রমে সার্বক্ষণিকভাবে মোতায়েন থাকার কথা থাকলেও একাধিক দিন টার্মিনালে গিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের দেখা মেলেনি।
গত বুধবার ঢাকা সদরঘাট টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, ঘাটে ভেড়া বেশির ভাগ লঞ্চেই পর্যাপ্ত প্লাস্টিক বল, লাইফবয়া ইত্যাদি নেই। এমভি সাগরের সামনে সাইনবোর্ডে লেখা আছে এতে ৭৫টি লাইফবয়া রয়েছে। কিন্তু ঝুলতে দেখা যায় মাত্র ২৫টি। কর্মী পরিচয়দানকারী এফ রহমানকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, বাকিগুলো ভেতরে আছে। কিন্তু তিনি সেগুলো দেখাতে পারেননি।
একটিকে ঠেলে অন্য লঞ্চের ঘাটে ভেড়ার বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা চলে সব সময়। বুধবার বেলা তিনটার দিকে দেখা যায়, ৫ নম্বর ঘাটে ভেড়ার সময় এমভি সৈকত দুই পাশের দুটি লঞ্চ এমভি নুসরাত-২ ও স্বর্ণদীপকে ধাক্কা দিল। এতে যাত্রীদের কয়েকজন ডেকে ছিটকে পড়েন।
বরিশাল, হুলারহাট, পটুয়াখালীগামী প্রতিটি লঞ্চেই অতিরিক্ত মাল বহন করতে দেখা যায়। ডেকের ওপর যথারীতি মালামাল তোলা হচ্ছে। সম্প্রতি এক দিন এমভি সাগর-৫, এমভি সৈকত, তরিকা-২ এসব লঞ্চে ডেকের মধ্যে কাপড়ের গাঁট, টিন ইত্যাদি বহন করতে দেখা যায়।
অভিযান প্রায় নেই: নৌবন্দরগুলোতে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম একরকম বন্ধ। নৌপথে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী ছাড়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সূত্র এ কথা জানিয়েছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর জোবায়ের আহমদ বলেন, ‘অভিযান একেবারে হয় না, তা ঠিক নয়। কয়েক দিন আগে অভিযানের জন্য বরিশালে দল পাঠানো হয়েছে। তবে আমাদের মাত্র একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পরিদর্শক থাকায় জোরালোভাবে অভিযান পরিচালনা করা যায় না।’

No comments

Powered by Blogger.