বিশ্বব্যাংক ॥ নায়ক কিংবা খলনায়ক by মিলু শামস

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের একচল্লিশ বছর পরও সাধারণ মানুষের কাছে এর ভাবমূর্তি খলনায়কের। গত শতকের পঞ্চাশের দশকের সেই ক্রুগ মিশন থেকে শুরু করে সবুজ বিপ্লব, দারিদ্র্যদূরীকরণ কার্যক্রম, নব্বইয়ে গ্যাট চুক্তি, দুই হাজার এক-এ দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল সব শেষ পদ্মা সেতু প্রকল্প বাতিল এ পুরো পথপরিক্রমায় সাধারণ মানুষের কাছে এর ভাবমূর্তির তেমন পরিবর্তন হয়নি।


যদিও যে পটভূমিতে এবং যাদের জন্য এর জন্ম হয়েছিল সেখানে নায়কের ভাবমূর্তিই ছিল উজ্জ্বল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিপর্যস্ত ইউরোপের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জরুরী তাগিদ থেকে এর আবির্ভাব। উনিশ শ’ পঁয়তাল্লিশ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়েছিল ছেচল্লিশের ছাব্বিশ জুন। তার আগে বিশ্বের চুয়াল্লিশটি দেশের সাত শ’ প্রতিনিধি সম্মেলনে বসেছিলেন সে সময়ের মার্কিন বাণিজ্য সচিব হেনরি মর্গেন থাউসের নেতৃত্বে। আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলের ওই সম্মেলনে অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটাতে ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। বিশ্বব্যাংক বলতে আজ যে প্রতিষ্ঠান আমরা চিনি তা ওই সিদ্ধান্তেরই ফলিত রূপ। সারা পৃথিবীর এক শ’ আটাশিটি দেশের সদস্যপদ নিয়ে গঠিত বিশ্ব ব্যাংকের সদস্য সংখ্যা শুরুতে ছিল আটত্রিশ। গঠনতন্ত্রের নিয়মানুযায়ী প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র দু’শো পঞ্চাশটি ভোট প্রয়োগ করতে পারলেও আসলে ভোট দেয়ার শতকরা আশি ভাগ ক্ষমতা পশ্চিমা ধনী দেশগুলোর এবং ব্যাংক পরিচালনার মূল চাবিকাঠি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। তাই নায়কের ভাবমূর্তি সবসময় সংরক্ষিত থেকেছে ধনী দেশের মধ্যে। যারা এ ভাবমূর্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের মতো প্রান্তস্থ পুঁজির দেশগুলোতে হাজির হয়েছে ‘যখন যেমন তখন তেমন’-এ রকম কৌশল নিয়ে। রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সব সরকারকে সমর্থন দিয়েছে তারা। এক ধরনের পিঠ চাপড়ানো বাহবা দিয়ে খুশিতে রেখে কৌশলে নিজেদের কাজ সেরেছে। রাষ্ট্রীয় খাতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে তৈরি প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিল। আবার পনেরো আগস্টের পর জারি হওয়া সামরিক শাসনেরও প্রশংসা করে তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সেই প্রশংসার বেনো জলে আশির দশকে ‘কাঠামো পুনর্বিন্যাসে’র নামে শুরু হয় অশিল্পায়ন ও রাষ্ট্রের পরিপূরক হিসেবে বিশ্ব সংস্থার ভিত শক্ত করার প্রক্রিয়া। অবশেষে গ্যাট চুক্তি যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব অর্থনীতিকে একটি একক ধারার সঙ্গে যুক্ত করে। বিশ্বপুঁজিবাদী প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বব্যাংককে এড়িয়ে চলা কঠিন হয়। দেশের শাসক শ্রেণীর দোদুল্যমানতা, মেরুদ-হীনতা ও অধস্তন মানসিকতা সহায়ক হিসেবে কাজ করে। মাত্র কয়েক হাজার ডলারের জন্য আত্মসম্মান বিক্রির অনেক উদাহরণ আছে। শুরুতে পিঠ চাপড়ে গাল ভরা বুলি আওড়ালেও ঋণ দেয়ার বেলায় বিশ্বব্যাংক তাদের নীতি থেকে এক চুল নড়েনি কখনও। কঠিন শর্ত আরোপ করে ঋণ দিয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে শর্তের বোঝা চাপিয়েছে। এক চল্লিশ বছরে বাংলাদেশকে প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের বেশি ঋণ দিলেও এর জন্য বাংলাদেশকে মূল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অন্ধের মতো মেনে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন অনেক প্রকল্প হাতে নেয়ায় বাংলাদেশ মূলত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজারে পরিণত হয়েছে। এর পটভূমি নির্মিত হয়েছিল ষাট দশকে। সবুজ বিপ্লবের নামে সে সময় যে ঋণ দিয়েছিল তা ছিল আসলে পশ্চিমা দেশগুলোর সার, কীটনাশক, বীজ ও গভীর অগভীর নলকূপ বিক্রির ক্ষেত্র তৈরির অন্য নাম। ক্রমশ এসব উপকরণের ব্যবহার বাড়ায় কৃষিতে ভর্তুকি তুলে নেয়ার প্রসঙ্গটি সামনে আসে। বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড, পেট্রোলিয়াম করর্পোরেশন ইত্যাদি সংস্থা দুর্বল করে এখানে ব্যবসার সুযোগ করে নিয়েছে। বাংলাদেশের পাট খাতের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। পাট খাত সংস্কার প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে ব্যাংক বলেছিল, এর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশকে ‘শিল্পায়ন’ সহায়তা দেয়া হবে। তারা বলেছিল, এ ঋণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে সরকারী মিলকারখানার বেসরকারী প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা; যা বাংলাদেশের বেসরকারী খাতের উন্নয়ন প্রতিশ্রুতিকে এগিয়ে নেবে। এই মিষ্টি কথার আড়ালে আসলে পাট খাতের বারোটা বাজার প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়েছিল; যার চূড়ান্ত রূপ ছিল জুট সেক্টর এ্যাডজাস্টমেন্ট নামের এক প্রজেক্ট। প্রকল্পে অনেক বড় অঙ্কের ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিভিন্ন শর্তের বেড়াজালে আটকিয়ে অসমাপ্তভাবে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। ঋণ না পেলেও শর্তগুলো সব পালন করতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ। অনিবার্য পরিণতিÑধ্বংসের মুখে পাট খাত। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে লোকসান কমানোর শর্তে এর পর একের পর এক পাটকল বন্ধ করে। ছাঁটাই হয় হাজার হাজার শ্রমিক। সারা পৃথিবীতে যখন পাটের চাহিদা বাড়ছে সে সময় দূরন্ত গতিতে এগিয়ে যাওয়ার বদলে সোনালী আঁশের বাংলাদেশের পাট শিল্প পুরোপুরি বিধ্বস্ত। এ ধরনের ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে খলনায়কের ভাবমূর্তিই প্রতিষ্ঠিত করে। বৃহৎ ব্যবসার স্বার্থরক্ষা এবং নিজেদের আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করার অব্যাহত প্রক্রিয়ায় ধনীদের কাছে নায়ক ভাবমূর্তি স্থায়ী হলেও অনুন্নত দেশে তা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বোধহয় পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।
পুঁজিবাদী বিশ্বের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছেও বিশ্বব্যাংকের আসল চেহারা উন্মোচিত। দেশের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে অসম্মানজনক আচরণ ও মোড়লগিরিতে তারাও বিরক্ত। বাংলাদেশের এখন যা অবস্থা এবং বিশ্ব পুঁজি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে যে অবস্থান তৈরি হয়েছে তাতে বিশ্বব্যাঙ্ককে উপেক্ষা করা বেশ কঠিন। বিশেষ করে শাসকশ্রেণীর শ্রেণীচরিত্র অপরিবর্তিত রেখে তা করা অসম্ভব। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে নানা ধরনের উপঢৌকনের টোপ গিলে তৃপ্তির ঢেঁকুরই তোলা যায় মেরুদ- সোজা করে ঘুরে দাঁড়ানো যায় না। বিশেষত এদের সঙ্গে যখন রয়েছে নানা নাম ও উপাধির সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। এদের আবির্ভাবও তো প্রকারান্তরে ওই বিশ্বব্যাঙ্কেরই কৌশলের ছল। এদেশে বেসরকারী সংস্থার আত্মবিকাশের মধ্য দিয়ে এদের আগমনের সূচনাপর্ব নির্মাণ হয়। বিশ্ব সংস্থাকে রাষ্ট্রের পরিপূরক করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে এদের অবস্থানের ভিত শক্ত হয়েছে। তারপর সামরিক শাসনের রমরমে জমানায় বিশ্বব্যাঙ্কের ‘সহায়তা’ দু’কূল ছাপিয়ে বয়ে গেছে। তারই ধারাবাহিকতায় এগুতে এগুতে আজকের ‘ট্রেজারি মডেল’-এ এসে ঠেকেছে।
বামপন্থী মহলে একটা কথা উচ্চারিত হয় বিশ্বব্যাঙ্ক যার বন্ধু তার শত্রুর দরকার হয় না। এ কথার সত্য-মিথা বিশ্বব্যাঙ্কের কাজের ধারাবাহিকতার মধ্যেই প্রমাণিত। কে কিভাবে নেবেন সেটা তার দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক অবস্থান ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে। তবে বিশ্বব্যাঙ্কের এক সময়ের চীফ অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ বলেছিলেন, বিশ্বব্যাঙ্ক ও তার সহযোগী সংস্থা আইএমএফের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠতার ফল ভাল হয় না। অনুগত থেকে যারা এদের পরামর্শ বা উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছে, সেসব দেশের অর্থনীতি ধসে পড়েছে। সরকারও নড়বড়ে হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা বেড়েছে। এ লক্ষণগুলো বাংলাদেশের আর্থ-রাজনীতিতে আছে কি-না সতর্কতার সঙ্গে তা খেয়াল রাখা দরকার।
আন্তর্জাতিক বাজারে ভারসাম্য রাখতে গত বছর আইএমএফের কাছ থেকে এক শ’ কোটি ডলার এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি নিতে বাংলাদেশ সরকারকে ছয় মাসে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছিল; যার ভুক্তভোগী হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। তাদের কাছে বিশ্বব্যাঙ্ক খলনায়ক ছাড়া আর কি ভাবমূর্তিতে উপস্থিত হতে পারে? জাতীয় সম্পদকে আন্তর্জাতিক পুঁজির দখলে নিতে যত রকম কৌশল আছে তার সবই প্রয়োগ করে তরতর করে সাফল্যের সিঁড়ি ডিঙ্গাচ্ছে এ সংস্থা। আর তাদের এ কৌশল বাস্তবায়নে সহায়তা দেয়া দেশীয় সুবিধাভোগীরা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বাচ্ছন্দের মোহে জেনেশুনে দেশকে ভয়াবহ শূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের কাছে এ সংস্থা নায়ক হতেই পারে। নায়ক আর খলনায়কে দ্বন্দ্ব তো স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ আর সুবিধাভোগীর সম্পর্কও তাই। এ দ্বন্দ্ব প্রকট হতে হতে যদি কোন দিন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রচলিত কাঠামো ভেঙ্গে নতুন কাঠামো জনগণের সত্যিকারের অংশগ্রহণর কাঠামো তৈরি হয়, শক্ত মেরুদ-ের শাসকশ্রেণী প্রতিষ্ঠিত হয় সেদিন বিশ্বব্যাঙ্কের মোড়লগিরির হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। তার আগে তাদের সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থেকে মাঝে মধ্যে গলাধাক্কা খেতেই হবে।

No comments

Powered by Blogger.