এভারেস্টজয়ী-স্মৃতির শহরে ওয়াসফিয়া by নিজাম সিদ্দিকী

ওয়াসফিয়া নাজরীন। এভারেস্টজয়ী এ নারীর পাহাড়ের সঙ্গে সখ্য সেই ছোটবেলায়। থাকতেন চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী সড়কের ‘ফেনারিজ হিলে’। নগর হলেও আশপাশে সব পাহাড়। ফলে বন্ধুতার হাত বাড়িয়েছেন পাহাড়ের সঙ্গেই। শৈশবে বাটালি ও দেব পাহাড়ে ওঠা ছিল তাঁর শখ। একসময় এ শখ পাহাড় জয়ের নেশায় পরিণত হয়।


স্থির করলেন লক্ষ্য—‘জয় করব সাত মহাদেশের সাতটি পাহাড়। চূড়ায় ওড়াবো লাল-সবুজের পতাকা।’ এর পরের গল্প স্বাধীনচেতা ওয়াসফিয়ার শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। জয় করলেন এভারেস্টসহ তিনটি মহাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার পাহাড়ের চূড়া। ওয়াসফিয়া সম্প্রতি ঘুরে গেলেন তাঁর স্মৃতির শহর চট্টগ্রাম। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের একসেস অ্যাকাডেমির শিক্ষা সমাপনী ও বিশদ বাংলা আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি চট্টগ্রাম আসেন।
ওয়াসফিয়া বলেন, ‘আমার সুন্দর দিনগুলো কেটেছে চট্টগ্রামে। আমাদের বাসার কাছের পাহাড়ের পাশের ড্রেনগুলো দিয়ে আমি আর আমার ভাই নিচে নামতাম। আবার পাহাড়ের নিচ থেকে ওপরে উঠতাম। তবে এখন আমার কাছে মনে হয়, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোকে খুব ছোট, টিলার মতো।’
ওয়াসফিয়ার শিক্ষার হাতেখড়িও এই চট্টগ্রামে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি (বাওয়া) বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হন। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত এখানে পড়াশোনা করেছেন। অষ্টম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত তিনি ঢাকার স্কলাস্টিকা স্কুলে পড়েন। ‘ও’ লেভেলে পড়াশোনা শেষে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার অ্যাগনস স্কট কলেজ থেকে সামাজিক মনোবিজ্ঞান ও স্টুডিও আর্টে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। পরে স্টুডিও আর্টের ওপর পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডে। মজার ব্যাপার ছিল, এ দুটি দেশেই তাঁর বাসা ছিল পাহাড়ের কোলঘেঁষে।
দেশে থাকতেও পাহাড়প্রেমী এ নারীর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে। বিশেষ করে রাঙামাটি জেলায় মা-বাবার সূত্রে পরিচিত ছিলেন অনেকেই। কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষগুলোকে। এখনো ছুটে যান তাঁদের কাছে। বললেন, ‘পাহাড় (এভারেস্ট) থেকে আসার পর যাওয়া হয়নি, এর আগে সর্বশেষ গত বছর মার্চে গিয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, সরাসরি যোগাযোগ না হলে কোনো কাজ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না।’ এখনো যুক্ত আছেন গারো ও ঢাকার বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের কার্যক্রমে।
সেভেন সামিটস ও ওয়াসফিয়ার স্বপ্ন: ওয়াসফিয়া ‘বাংলাদেশ অন সেভেন সামিটস’ নামে পাহাড় অভিযানের ঘোষণা দেন গত বছরের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে। সাতটি মহাদেশের পাহাড়চূড়ায় ওঠার পরিকল্পনা করা হয়।
এ বিষয়ে ওয়াসফিয়া বলেন, ‘আমার লক্ষ্য সাতটি মহাদেশের পাহাড়চূড়ায় উঠে গত ৪০ বছরে আমাদের নারীদের অবদানের কথা তুলে ধরা।’ ওয়াসফিয়া গত বছরের ২ অক্টোবর আফ্রিকা মহাদেশের কিলিমানজারো, ১৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাকোনকাগুয়া ও এ বছরের ২৬ মে এভারেস্ট জয় করেন। বাকি রয়েছে ইউরোপের মাউন্ট এলব্রাস, ওশেনিয়ার পুনকেক জায়া, অ্যান্টার্কটিকার ভিনসন্ট মাসিফ এবং উত্তর আমেরিকার মাউন্ট ম্যাকিনলি।
ইতিমধ্যেই ‘সেভেন সামিটস ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠন গড়েছেন। ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পর্বতারোহণের পাশাপাশি মেয়েদের আউটডোর স্পোর্টসের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। শতভাগ বৃত্তিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে এখানে। আগামী বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এর কার্যক্রম শুরু হবে। বিদেশি প্রশিক্ষকদের আনার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। ঢাকার বাইরেও এ প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জায়গা খোঁজা হচ্ছে। ওয়াসফিয়া স্বপ্ন দেখেন, আগামী শতাব্দী হবে মেয়েদের পদচারণে মুখর শান্তির একটি শতাব্দী। কারণ, আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বের মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে।

No comments

Powered by Blogger.