অ্যাকোনকাগুয়া চূড়ায় ওয়াসফিয়া-সাত চূড়ার দ্বিতীয় চূড়ায় by পল্লব মোহাইমেন

৬ ডিসেম্বর ২০১১। স্থানীয় সময় বেলা তিনটা ২৫ মিনিট। আর্জেন্টিনার অ্যাকোনকাগুয়া পর্বতচূড়ায় উড়ল লাল-সবুজের পতাকা। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের চার দশক পূর্তির দিনে দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বতচূড়ায় এই পতাকা উড়িয়েছেন ওয়াসফিয়া নাজরীন।


‘খুবই আনন্দ লাগছিল। হিসাবমতো আমাদের আরও দুই দিন পর চূড়ায় ওঠার কথা, কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর উদ্যাপনের জন্যই তাড়াহুড়া করেছিলাম। কষ্ট হয়েছে, তবু বিজয় দিবসে অ্যাকোনকাগুয়ার চূড়ায় উড়িয়েছি দেশের পতাকা। আমার এই আবেগের প্রতি আমাদের দলের বাকিরাও সমর্থন দিয়েছিল।’ আলাপচারিতায় কথাগুলো জানালেন ওয়াসফিয়া। অ্যাকোনগুয়া জয় করে যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে ২২ জানুয়ারি ঢাকা এসেছেন। ২৩ জানুয়ারি কথা হয় তাঁর সঙ্গে।
স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তির দিনে গত বছরের ২৬ মার্চে অনলাইনে বাংলাদেশের এই নারী পর্বতারোহী ঘোষণা দেন সেভেন সামিট জয় করার। এর মাস কয়েক পরে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে ‘বাংলাদেশ অন সেভেন সামিটস’ কর্মসূচির। এ কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ২ অক্টোবর ওয়াসফিয়া জয় করেন আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া কিলিমানজারো। অ্যাকোনকাগুয়া জয়ের মাধ্যমে সেভেন সামিট অর্থাৎ সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বত চূড়ার দুটি জয় করলেন।
অ্যাকোনকাগুয়ার উচ্চতা ছয় হাজার ৯৬২ মিটার (২২ হাজার ৮৪১ ফুট)। পৃথিবীর প্রায় দক্ষিণ প্রান্তে। এশিয়ার বাইরে এটাই সর্বোচ্চ চূড়া। ‘সাধারণত যে রুট ব্যবহার করা হয়, আমরা সেটা না করে কঠিন পথটাই বেছে নিয়েছিলাম এই অভিযানে।’ কারণ? ওয়াসফিয়া জানালেন ‘আমার গাইড ও প্রশিক্ষক নিউজিল্যান্ডের জেমি ম্যাকগিনেস কঠিন রুট বেছে দিয়েছিলেন। এভারেস্ট অভিযানের প্র্রস্তুতি হিসেবে এটা কাজে দেবে।’ পর্বতারোহণে ‘অ্যালপাইন স্টাইল’ নামের পদ্ধতি আছে। ওয়াসফিয়া বললেন, ‘এবারের অভিযানে মোটামুটিভাবে অ্যালপাইন স্টাইল অনুসরণ করেছি। গাইডসহ আমরা পাঁচজন ছিলাম দলে। এর মধ্যে আমি একমাত্র নারী। আমরা অ্যাকোনকাগুয়া অভিযানে কোনো পোর্টার সঙ্গে নিইনি। ফিক্সড রোপ ব্যবহার করিনি। আর এই অভিযানে কোনো বাড়তি অক্সিজেন নেওয়া হয়নি। অ্যাকোনকাগুয়ার বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশ কম। তাই বলতে পারেন শেষের কয়েক শ মিটার কষ্ট হয়েছে বেশ।’ দলের একজন পর্বতারোহী চূড়ার কাছের ক্যাম্পে গিয়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। তাঁকে নিয়ে চূড়া আরোহণ মানে সামিট করাটা খুব সাবলীল ছিল না ওয়াসফিয়াদের জন্য।
আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মোনদোজা। অ্যাকোনকাগুয়ার কাছের শহর এটা। এর উচ্চতা ৭৫০ মিটার। ৪ ডিসেম্বর এখান থেকেই শুরু হয় ওয়াসফিয়া নাজরীনের অভিযান। যে রুটে তিনি গিয়েছেন, সেটার নাম পোলিশ গ্লেসিয়ার রুট। এর বেসক্যাম্প প্লাজা আর্জেন্টিনা। ‘এটি চার হাজার ২০০ মিটার উঁচুতে। ৯ ডিসেম্বর আমরা পৌঁছে যাই বেসক্যাম্পে।’ এরপর ওয়াসফিয়া উঠতে থাকেন ক্যাম্প-১ (পাঁচ হাজার মিটার), ক্যাম্প-২ (পাঁচ হাজার ৫০০ মিটার) পেরিয়ে ক্যাম্প-৩ মানে পাঁচ হাজার ৯৫০ মিটার উচ্চতার শেষ ক্যাম্পে। এখান থেকেই অ্যাকোনকাগুয়ার শীর্ষে ওঠা শুরু হয়, যাকে পবর্তারোহীরা বলেন সামিট পুশ।
‘১৬ ডিসেম্বর ভোর চারটায় সামিট পুশ শুরু করি আমরা। দলের একজন অসুস্থ, তাঁকে নিয়েই আমরা এগোতে থাকি। পাঁচটা দলকে দেখি সামিট না করেই ফিরে যেতে।’ তখন কিছুটা হতাশাই গ্রাস করেছিল ওয়াসফিয়াকে। ‘শেষ পর্যন্ত চূড়ায় উঠতে পারব তো! কিন্তু কীভাবে কীভাবে উঠে গেলাম অ্যাকোনকাগুয়ার চূড়ায়। সেখানে দুটি ক্রশ পোঁতা আছে। একটা পুরোনো, একটা নতুন। দুটির সঙ্গেই ছবি তুললাম। প্রচুর ভিডিও করলাম। একই দিন আরও তিনটি দল চূড়া জয় করেছিল।’ জয় করার পর চূড়ায় একটু বেশি সময়ই ছিলেন ওয়াসফিয়া। প্রায় ঘণ্টা খানেক। যে কারণে নামাটা আরও বেশি কষ্টকর হয়েছিল তাঁর জন্য।
‘নামার সময় ঝড়ের মধ্যে পড়েছিলাম আমরা। আশপাশের পথ দেখতেও সমস্যা হচ্ছিল। আমাদের দলের একজন হঠাৎ করে পাথরের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। বুঝলাম উচ্চতাজনিত শারীরিক অসুস্থতা ধরেছে তাঁকে।’
বিভ্রম দেখা দিয়েছিল ওয়াসফিয়ার নিজের মধ্যেও। নামার সময় হঠাৎ দেখলেন পিটার প্যান পাশে তাঁর সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আগের দিন দলের অন্যদের সঙ্গে কার্টুন চরিত্র পিটার প্যান নিয়ে অনেক গল্প করেছিলেন ওয়াসফিয়া। ‘আমার মস্তিষ্কের একদিক যেন দেখছে পিটার প্যানকে, আরেক দিক আবার বলছে না, এটা বাস্তব না। গাইডকে জানাতে তিনি বললেন, নেমে গেলেই ঠিক হয়ে যাবে। আমরা রাত সাড়ে আটটার দিকে ফিরে এলাম ক্যাম্প-৩-এ।’
কী করছেন এখন? ওয়াসফিয়ার উত্তর, প্রতিদিন প্রশিক্ষণ। এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি। ঢাকায় একজন ব্রিটিশ প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত অনুশীলন চলছে তাঁর। জানালেন, এভারেস্ট অভিযানের খরচাপাতি এখনো সংগ্রহ হয়নি। তহবিল সংগ্রহের চেষ্টাও করতে হচ্ছে জোরেশোরে। মাস খানেক পর নেপালে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে থাকবেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২৯ মার্চ শুরু হবে ওয়াসফিয়ার এভারেস্ট অভিযান!

No comments

Powered by Blogger.