নিত্যজাতম্-সমাজের কী চিকিৎসা! by মহসীন হাবিব
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী শবেবরাত হলো ভাগ্যরজনী। পাপমোচনের পরম সুযোগের রাত। বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রায় সব বিশ্বাসী এই রাতে ইবাদত-বন্দেগি, নফল নামাজ আদায় ও কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন হয়। সৎ ও সত্যের পথ অবলম্বনকরত (সুরা অনুযায়ী) সৃষ্টিকর্তার করুণা প্রার্থনা করে। এমন একটি রাতে আল্লাহর করুণা প্রত্যাশী মানুষেরা কতটা অসহিষ্ণু হতে পারে?
১৭ জুলাই ছিল শবেবরাতের রাত। এই রাতে ঢাকার অদূরে আমিনবাজার এলাকায় মসজিদের মাইক থেকে এলাকায় ডাকাত পড়ার ঘোষণা দিয়ে যারা ছয়জন তরুণ ছাত্রকে (যে কারণেই হোক) পিটিয়ে হত্যা করেছে, তারা সবাই হয়তো নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করে অথবা নিজেদের ইসলামের অনুসারী বলে মনে করে। বলা হয়, ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামের নানা পুস্তকে ইসলামের মহানবী (সা.)-এর সহিষ্ণুতার অনেক বর্ণনা রয়েছে। আছে মুসলমানদের জন্য নির্দেশ। তাই ১৭ জুলাই ছয়জন তরুণকে যারা পিটিয়ে হত্যা করেছে, তাদের সঙ্গে ইসলামকে মেলাতে বড়ই কষ্ট হচ্ছে।
পৃথিবীতে সব ধরনের হত্যাকাণ্ডই অতি নিষ্ঠুর, মর্মান্তিক। কিন্তু লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার মতো মর্মান্তিক বোধকরি আর নেই। মৃত্যুর আগে একজন মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণার ধরন একটি বড় বিষয়। সে কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হত্যাকাণ্ডের ধরন অনুসারে বিচারকরা শাস্তির রায় দিয়ে থাকেন। একটি হত্যাকাণ্ড প্রমাণ হলে কারো নূ্যনতম শাস্তি হয়, আবার আরেকটি হত্যাকাণ্ডের জন্য কারো বা সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। আমি পিটিয়ে হত্যা করতে কখনো দেখিনি, কিন্তু পিটিয়ে আধমরা করতে দেখেছি, যা ছিল হত্যারই শামিল। গায়ের রঙ কালো, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ২৫-২৭ বছর বয়সের নিম্নবর্ণের হরিপদ (একটু সহজ ধরনের) নামের ছেলেটিকে যখন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সমর্থক ও পাতি নেতারা হত্যার উদ্দেশ্যে গায়ের জোর দিয়ে মোটা মোটা লাঠি দিয়ে বিষধর সাপ পেটানোর মতো করে পেটাতে থাকে, তখন সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। আজও সেই বীভৎস দৃশ্য আমাকে চমকে দেয়। আর দেখেছিলাম সাংবাদিক গৌতম দাসকে হত্যার পর তাঁর লাশ কিভাবে থেতলে দেওয়া হয়েছে সে দৃশ্য, যার বিচার আজও হয়নি। গৌতমকে গুলি করে বা চাকু দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়নি। শরীরের নানা স্থানে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। প্রসঙ্গত একটি কথা বলি। ১৯৭১ সালে সেই ভয়াবহ যুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার, আলবদররা নির্যাতন করেছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, ধর্ষণের মতো নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে; প্রতিউত্তরে যখন মুক্তিবাহিনী শক্তিশালী হয়ে উঠল তখন বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী অথবা গ্রামবাসীর হাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য ধরা পড়েছে। বিক্ষিপ্তভাবে একজন-দুজন পিটিয়ে হত্যার শিকার হয়েছে। কিন্তু কোথাও একসঙ্গে শত্রুপক্ষের ছয়জনকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা আছে বলে এখন পর্যন্ত শুনিনি।
অনুমান করতে কষ্ট হয় না, ছয়টি ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করতে অনেকগুলো প্রচণ্ড আঘাত করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় লেগেছে। একেকজনকে একটি করে লাঠির বাড়ি দিতেই সে মৃত্যু মুখে ঢলে পড়েনি। নিশ্চয়ই এই তরুণরা চিৎকার করে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল ওই সব মানুষের কাছে, যারা আল্লাহর করুণার আশায় নামাজ ও তেলাওয়াত নিয়ে ব্যস্ত ছিল। ১৭ জুলাই ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে অসংখ্যবার আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে, সেখানে কি কোনো মানুষ ছিল না? আমাদের সমাজে মুরবি্ব বলতে একটি সম্প্রদায় আছে। অসংখ্য মানুষের মধ্যে কি কোনো মুরুবি্ব ছিল না, নাকি কোনো কোনো জনপদ থেকে মুরবি্ব নামের সম্প্রদায় হারিয়ে গেছে?
শারীরিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল জাতি নাকি অধিক নিষ্ঠুর হয়। কথাটি বিশ্বাসে ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু ঘটনা ও মানসিক অবস্থা দেখে ওই অনুমাননির্ভর কথাটি বিশ্বাস করার যুক্তি তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিনের পত্রপত্রিকা খুললে, টেলিভিশনের চ্যানেল খুললে যেসব নিষ্ঠুর, বিকৃত কাহিনী চোখে পড়ে, তা এ দেশে আগে কখনো দেখা যায়নি। রসু খাঁর মতো সিরিয়াল কিলার আধুনিক বাংলাদেশে হয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত দেশগুলোতে হঠাৎ একজন ব্যক্তি উন্মাদ হয়ে হাতে অস্ত্র নিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। স্কুল শুটিং, পাবলিক প্লেসে শুটিংয়ের মতো ভয়ংকর কাণ্ড প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু গ্রামশুদ্ধ মানুষের উন্মাদের মতো আচরণ সেসব দেশে কল্পনার বাইরে। একটি গ্রাম-একটি সমাজ। তাহলে কি এখন আমাদের দেশে একটি সমাজকে অপরাধী সমাজ বলার সময় এসেছে?
এ ধরনের অবক্ষয়ের বিশেষ কিছু কারণ আছে। লক্ষণীয়, মানুষ যখন চিকিৎসকের কাছ থেকে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন দেখতে না পায় তখন নিজেরাই চিকিৎসক বনে যায়। পারতপক্ষে ডাক্তারের মুখাপেক্ষী হতে চায় না। দেশে এখন অসংখ্য মানুষকে দেখা যায় অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ওষুধ নিজেরাই হাতে তুলে নিয়েছে। ঠিক তেমনি আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতার কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ারও প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে এমন বিপত্তি দেখা দিচ্ছে।
আরো একটি কারণ আছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মানুষের বিবেক গঠনের প্রধান উপাদান। বাংলাদেশে সুস্থ শিক্ষা ও সুস্থ সংস্কৃতির প্রসার থমকে গেছে। ঘরে ঘরে হিন্দি সিনেমার পেটাপিটির দৃশ্য দখল করে নিয়েছে। এর চেয়ে কি যাত্রাপালার বিবেকের বিবেক আমাদের জন্য অনেক ইতিবাচক ছিল না? দেশের গ্রামাঞ্চলের যুবকদের কাছ থেকে যাত্রাপালার বিনোদন কেড়ে নিয়ে তুলে দেওয়া হয়েছে মোবাইল ফোনে নীল ছবি। অধিকন্তু খুব সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রযুক্তির সামাজিক ব্যবহার কমে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। আগে সিনেমা হলে ৪০০ লোক একসঙ্গে সিনেমা উপভোগ করত, যাত্রাপালায় পাটি পেতে পাশাপাশি গা মিলিয়ে বসে বিবেকের ভূমিকার অভিনয় দেখত। এখন একা ইন্টারনেট ব্যবহারের রেওয়াজ। কেউ গিয়ে পাশে দাঁড়ালে তা হয় বিরক্তির কারণ। ফলে সামাজিক জীবনে যে বৈকল্যের সৃষ্টি হয়েছে, তার বাতাস আমিনবাজারের ওই সমাজের ভেতরেও প্রবেশ করেছে।
পুনশ্চ: ওমেদ আলী ছিল ক্লাসে ফার্স্ট বয়। অসম্ভব মেধাবী ছেলেটি সারাক্ষণ লেখাপড়া করত। লেখাপড়াই ছিল তার একমাত্র নেশা। দরিদ্র ঘরের সন্তান। পুষ্টিকর খাবার বা সুস্থ বিনোদনের কোনো আয়োজন ওমেদ আলীর জন্য ছিল না। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। ওমেদ আলী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। মফস্বল শহরের ঘটনা। তখন দেখেছি নিয়মিত ওমেদ আলীকে চার-পাঁচজন সুঠাম দেহের মানুষ ধরে নিয়ে পানিতে চুবাত। পুকুর পাড়ে তখন মানুষ ভিড় করে থাকত। শিশুরা সে দৃশ্য দেখে আনন্দ পেত। আর বড়রা এটাকেই চিকিৎসা বলে মনে করত। এটাই যদি মানসিক ভারসাম্য হারানোর চিকিৎসা হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশে কোনো কোনো সমাজ বা জনপদকে এ চিকিৎসা দেওয়া যেত। কিন্তু সমাজকে পানিতে নিয়ে চুবানোর উপায় কী?
লেখক : সাংবাদিক, mohshinhabib@yahoo.com
পৃথিবীতে সব ধরনের হত্যাকাণ্ডই অতি নিষ্ঠুর, মর্মান্তিক। কিন্তু লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার মতো মর্মান্তিক বোধকরি আর নেই। মৃত্যুর আগে একজন মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণার ধরন একটি বড় বিষয়। সে কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হত্যাকাণ্ডের ধরন অনুসারে বিচারকরা শাস্তির রায় দিয়ে থাকেন। একটি হত্যাকাণ্ড প্রমাণ হলে কারো নূ্যনতম শাস্তি হয়, আবার আরেকটি হত্যাকাণ্ডের জন্য কারো বা সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। আমি পিটিয়ে হত্যা করতে কখনো দেখিনি, কিন্তু পিটিয়ে আধমরা করতে দেখেছি, যা ছিল হত্যারই শামিল। গায়ের রঙ কালো, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ২৫-২৭ বছর বয়সের নিম্নবর্ণের হরিপদ (একটু সহজ ধরনের) নামের ছেলেটিকে যখন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সমর্থক ও পাতি নেতারা হত্যার উদ্দেশ্যে গায়ের জোর দিয়ে মোটা মোটা লাঠি দিয়ে বিষধর সাপ পেটানোর মতো করে পেটাতে থাকে, তখন সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। আজও সেই বীভৎস দৃশ্য আমাকে চমকে দেয়। আর দেখেছিলাম সাংবাদিক গৌতম দাসকে হত্যার পর তাঁর লাশ কিভাবে থেতলে দেওয়া হয়েছে সে দৃশ্য, যার বিচার আজও হয়নি। গৌতমকে গুলি করে বা চাকু দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়নি। শরীরের নানা স্থানে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। প্রসঙ্গত একটি কথা বলি। ১৯৭১ সালে সেই ভয়াবহ যুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার, আলবদররা নির্যাতন করেছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, ধর্ষণের মতো নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে; প্রতিউত্তরে যখন মুক্তিবাহিনী শক্তিশালী হয়ে উঠল তখন বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী অথবা গ্রামবাসীর হাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য ধরা পড়েছে। বিক্ষিপ্তভাবে একজন-দুজন পিটিয়ে হত্যার শিকার হয়েছে। কিন্তু কোথাও একসঙ্গে শত্রুপক্ষের ছয়জনকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা আছে বলে এখন পর্যন্ত শুনিনি।
অনুমান করতে কষ্ট হয় না, ছয়টি ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করতে অনেকগুলো প্রচণ্ড আঘাত করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় লেগেছে। একেকজনকে একটি করে লাঠির বাড়ি দিতেই সে মৃত্যু মুখে ঢলে পড়েনি। নিশ্চয়ই এই তরুণরা চিৎকার করে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল ওই সব মানুষের কাছে, যারা আল্লাহর করুণার আশায় নামাজ ও তেলাওয়াত নিয়ে ব্যস্ত ছিল। ১৭ জুলাই ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে অসংখ্যবার আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে, সেখানে কি কোনো মানুষ ছিল না? আমাদের সমাজে মুরবি্ব বলতে একটি সম্প্রদায় আছে। অসংখ্য মানুষের মধ্যে কি কোনো মুরুবি্ব ছিল না, নাকি কোনো কোনো জনপদ থেকে মুরবি্ব নামের সম্প্রদায় হারিয়ে গেছে?
শারীরিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল জাতি নাকি অধিক নিষ্ঠুর হয়। কথাটি বিশ্বাসে ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু ঘটনা ও মানসিক অবস্থা দেখে ওই অনুমাননির্ভর কথাটি বিশ্বাস করার যুক্তি তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিনের পত্রপত্রিকা খুললে, টেলিভিশনের চ্যানেল খুললে যেসব নিষ্ঠুর, বিকৃত কাহিনী চোখে পড়ে, তা এ দেশে আগে কখনো দেখা যায়নি। রসু খাঁর মতো সিরিয়াল কিলার আধুনিক বাংলাদেশে হয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত দেশগুলোতে হঠাৎ একজন ব্যক্তি উন্মাদ হয়ে হাতে অস্ত্র নিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। স্কুল শুটিং, পাবলিক প্লেসে শুটিংয়ের মতো ভয়ংকর কাণ্ড প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু গ্রামশুদ্ধ মানুষের উন্মাদের মতো আচরণ সেসব দেশে কল্পনার বাইরে। একটি গ্রাম-একটি সমাজ। তাহলে কি এখন আমাদের দেশে একটি সমাজকে অপরাধী সমাজ বলার সময় এসেছে?
এ ধরনের অবক্ষয়ের বিশেষ কিছু কারণ আছে। লক্ষণীয়, মানুষ যখন চিকিৎসকের কাছ থেকে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন দেখতে না পায় তখন নিজেরাই চিকিৎসক বনে যায়। পারতপক্ষে ডাক্তারের মুখাপেক্ষী হতে চায় না। দেশে এখন অসংখ্য মানুষকে দেখা যায় অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ওষুধ নিজেরাই হাতে তুলে নিয়েছে। ঠিক তেমনি আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতার কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ারও প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে এমন বিপত্তি দেখা দিচ্ছে।
আরো একটি কারণ আছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মানুষের বিবেক গঠনের প্রধান উপাদান। বাংলাদেশে সুস্থ শিক্ষা ও সুস্থ সংস্কৃতির প্রসার থমকে গেছে। ঘরে ঘরে হিন্দি সিনেমার পেটাপিটির দৃশ্য দখল করে নিয়েছে। এর চেয়ে কি যাত্রাপালার বিবেকের বিবেক আমাদের জন্য অনেক ইতিবাচক ছিল না? দেশের গ্রামাঞ্চলের যুবকদের কাছ থেকে যাত্রাপালার বিনোদন কেড়ে নিয়ে তুলে দেওয়া হয়েছে মোবাইল ফোনে নীল ছবি। অধিকন্তু খুব সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রযুক্তির সামাজিক ব্যবহার কমে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। আগে সিনেমা হলে ৪০০ লোক একসঙ্গে সিনেমা উপভোগ করত, যাত্রাপালায় পাটি পেতে পাশাপাশি গা মিলিয়ে বসে বিবেকের ভূমিকার অভিনয় দেখত। এখন একা ইন্টারনেট ব্যবহারের রেওয়াজ। কেউ গিয়ে পাশে দাঁড়ালে তা হয় বিরক্তির কারণ। ফলে সামাজিক জীবনে যে বৈকল্যের সৃষ্টি হয়েছে, তার বাতাস আমিনবাজারের ওই সমাজের ভেতরেও প্রবেশ করেছে।
পুনশ্চ: ওমেদ আলী ছিল ক্লাসে ফার্স্ট বয়। অসম্ভব মেধাবী ছেলেটি সারাক্ষণ লেখাপড়া করত। লেখাপড়াই ছিল তার একমাত্র নেশা। দরিদ্র ঘরের সন্তান। পুষ্টিকর খাবার বা সুস্থ বিনোদনের কোনো আয়োজন ওমেদ আলীর জন্য ছিল না। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। ওমেদ আলী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। মফস্বল শহরের ঘটনা। তখন দেখেছি নিয়মিত ওমেদ আলীকে চার-পাঁচজন সুঠাম দেহের মানুষ ধরে নিয়ে পানিতে চুবাত। পুকুর পাড়ে তখন মানুষ ভিড় করে থাকত। শিশুরা সে দৃশ্য দেখে আনন্দ পেত। আর বড়রা এটাকেই চিকিৎসা বলে মনে করত। এটাই যদি মানসিক ভারসাম্য হারানোর চিকিৎসা হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশে কোনো কোনো সমাজ বা জনপদকে এ চিকিৎসা দেওয়া যেত। কিন্তু সমাজকে পানিতে নিয়ে চুবানোর উপায় কী?
লেখক : সাংবাদিক, mohshinhabib@yahoo.com
No comments