উৎসব-ফ্রেমে ফ্রেমে আগামী স্বপ্ন by বৃত্বা রায় দীপা

ফ্রেমে ফ্রেমে আগামী স্বপ্ন’ স্লোগান নিয়ে পঞ্চমবারের মতো শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশ। ২১ থেকে ২৭ জানুয়ারি শিশুদের জন্য এই বিশ্ব আসরের আয়োজন করেছে চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি। প্রথমবারের মতো এই উৎসবের সূচনা হয় ২০০৮ সালে। এরপর থেকে প্রতিবারই এই উৎসবে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়ে উৎসবটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে ও শিশুদের আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছে।


এবারের উৎসবে নতুন মাত্রা হিসেবে যা যোগ হয়েছে তা হলো, ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট এই পাঁচটি নগরে একই সঙ্গে উৎসব চলছে। এবারের উৎসবে ৪০টি দেশের ২০০টি শিশু চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রদর্শনী চলছে সকাল ১১টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনই নয়, আছে সেমিনার—চলচ্চিত্রবিষয়ক কর্মশালা—দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বের সঙ্গে শিশুদের নির্ভেজাল আড্ডা। আর এ সবকিছুতে অংশ নিতে সারা দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ও চলচ্চিত্র নির্মাণ করে নির্বাচিত হয়ে এসেছে ১৩০ জন শিশু-প্রতিনিধি। তাদের মধ্যে সুবিধাবঞ্চিত শিশু এবং ভিন্নভাবে শারীরিক সক্ষম শিশুও আছে।
এ উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ হলো এক ঝাঁক শিশু ভলান্টিয়ার। ৫ থেকে ১৮ বছরের এই নিবেদিতপ্রাণ ভলান্টিয়ারদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে থাকে উৎসব প্রাঙ্গণ। এদের কথা হলো, ‘আমাদের উৎসব, আমরাই সব কাজ করব।’ আর তাই প্রতিবারের মতো এবারও উৎসবের ছবি বাছাই, অফিস ব্যবস্থাপনা, উৎসব স্যুভেনির ও প্রতিদিনের বুলেটিন প্রকাশ, ছবি তোলা ও রিপোর্টিং, শহরজুড়ে পোস্টার লাগানো, প্রেস ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যোগাযোগ, প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার ছবি বাছাই, প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি বোর্ড, ছবির প্রজেকশন, টিকিট বিক্রি, সেলস সেন্টার পরিচালনা, সেমিনার ব্যবস্থাপনা, উপস্থাপনা, প্রদর্শনী হল ও উৎসব প্রাঙ্গণের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, খাবার পরিবেশন সবখানেই অসাধারণ দক্ষতায় শতভাগ কাজ করেছে শিশুরা। ওদের সম্মিলিত শ্রম মেধায় জমে উঠেছে রংধনুর রঙে রাঙা শিশু চলচ্চিত্রের এই বিশ্ব আসর।
উৎসবের আড্ডা ও সেমিনার পর্বে দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বরা হাজির হচ্ছেন শিশুদের কাছে। সরল-সোজা প্রশ্ন কিন্তু তার উত্তর দিতে রীতিমতো ঘেমে যাচ্ছেন বক্তারা! আর নির্মল আড্ডা চলছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তৈরি হচ্ছে চিন্তার মেলবন্ধন।
উৎসবের দ্বিতীয় বছর থেকে শুরু হয়েছে শিশু নির্মাতাদের (অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সী) নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতা। সেরা ছবিগুলো পুরস্কৃত হচ্ছে। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো, প্রতিবছরই শিশু নির্মাতাদের ছবি উল্লেখযোগ্য হারে জমা পড়ছে। শিশুরা মনের আনন্দে তৈরি করছে যেকোনো দৈর্ঘ্যের, যেকোনো মাধ্যমে নির্মিত সিনেমা। সে প্রতিযোগিতার বিচারকও শিশুরাই। কেননা, তারাই সবচেয়ে ভালো বুঝবে কোন ছবিগুলো তাদের ভালো লেগেছে। এখানে চাপিয়ে দেওয়ার বালাই নেই, নেই নিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ি। মেপে দেওয়া কোনো লক্ষণরেখাও নেই। এই তিন বছরে বাংলাদেশের শিশুরা নির্মাণ করেছে বিশ্বমানের বেশ কিছু ছবি। কে জানে আজকের এই খুদে নির্মাতাদের মধ্যেই ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে এমন কেউ, যে একদিন অর্জন করবে অস্কার বা বদলে দেবে চলচ্চিত্রের ধারণা।
এখন এমন একসময়ের মধ্য দিয়ে আমরা চলছি, যখন ছোট থেকে বড়—সব শহরেই নিউক্লিয়ার পরিবারের প্রভাবে শিশুরা প্রতিদিন একা থেকে আরও একা হয়ে পড়ছে। সে একা ঘুমায়, একা স্কুলে যায়, একা একা খেলে। এর মধ্য দিয়ে শিশু তার অজান্তে হারিয়ে ফেলছে সামষ্টিক বোধ, যা শৈশবেই জন্ম নেয় প্রতিটি মানুষের মধ্যে। যে সামস্টিক বোধ ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে উঠত স্কুলের মাঠে ফুটবল বা দাঁড়িয়াবান্দা খেলার মধ্য দিয়ে।
শুধু নিজে নয়, জেতাতে হবে দলকে। এর মধ্যে দিয়ে শিশু শিখত অংশভাগিতা। সামষ্টিক স্বার্থের কাছে হার মানত একা বড় হওয়ার চিন্তা। আজকের বাস্তবতায় একা শিশুটি ক্রমাগত হয়ে পড়ছে এক স্বার্থপর যন্ত্র-মানুষ।
এই সময় শিশুকে শেখায় ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’কে পাশ কাটিয়ে কী করে ‘বেস্ট অব দ্য বেস্ট’ হতে হবে, হতেই হবে। না হলে জীবন বৃথা। বাবা-মায়ের স্বপ্ন মিথ্যে। তখন বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে যায় একই প্রতিযোগিতার চির প্রতিদ্বন্দ্বী। এই সময় যখন শিশুর সৃজনশীলতা আর স্বাভাবিক লালিত্য কেড়ে নিয়ে তাকে বানায় এক দারুণ রকম রোবট মানুষ, ঠিক তখন শিশুদের জন্য এই আয়োজন। বেড়ে উঠুক শিশু তার স্বাভাবিক সৃজনশীলতা নিয়ে, জেগে উঠুক তার বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধ। প্রসঙ্গত বলছি, গত বছর অনুষ্ঠিত চতুর্থ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের একটি ঘটনা। ‘হোয়ার ইজ উংকিস হর্স’ দেখার পর প্রদর্শনী হলের পাশে আকুল হয়ে কাঁদতে দেখেছি উৎসবে আমন্ত্রিত এক সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে। উংকির বেদনা তার চোখের জলে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ভাষা হয়নি সেখানে কোনো প্রতিবন্ধক। অনুভূতি প্রাণে প্রাণে মিলিয়ে দিয়েছে। উৎসবের একটি বড় সার্থকতা এটিই। এই সবুজ ছোট্ট গ্রহ-গ্রামে সাদা, কালো, বাদামি সবাই আমরা পড়শি, এই চেতনার আলোর হাত ধরে পৌঁছে যাক সে সমতার বিশ্বে। এই উৎসব শিশুকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, স্বপ্ন বুনতে শেখায়, স্বপ্ন নির্মাণ করতে শেখায়, স্বপ্নে স্বপ্নে ডানা মেলতে শেখায়।
বৃত্বা রায় দীপা: চিত্রনির্মাতা, সংগঠক, চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি।
b.roydipa@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.