সিলেটের যোগাযোগ সমস্যা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন by ড. নিয়াজ আহম্মেদ
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজে এবং দ্রুত গমনাগমন সময়ের যেমন সাশ্রয় হয়, তেমনি পণ্যসামগ্রীও সহজে, দ্রুত ও কম খরচে আনা-নেওয়া সম্ভব হয়। এ কথা সত্য, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
এ সময়ের মধ্যে সিলেটের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভৈরব সেতু, বাইপাস সড়ক এবং সিলেটে তামাবিল সড়কের উন্নয়ন হয়েছে। সিলেট বিভাগের চারটি জেলার মধ্যে তিনটি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কম-বেশি উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবহেলায় রয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা। যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক কোনো উন্নয়ন স্বাধীনতার পর থেকে গ্রহণ না করায় সুনামগঞ্জ জেলা উন্নয়নবঞ্চিতই রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি কোনো ক্ষেত্রেই সুনামগঞ্জ জেলা সামনের দিকে এগোতে পারেনি।
সিলেটের সঙ্গে সুনামগঞ্জ জেলার রয়েছে সরাসরি সড়কপথ। কিন্তু রাস্তা প্রশস্ত না হওয়ায় এবং কিছু ব্রিজ ও কালভার্ট ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটে। সুনামগঞ্জ জেলার সঙ্গে ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই। সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ সুনামগঞ্জবাসীর অনেক দিনের দাবি। সম্প্রতি ব্রিজের কাজ শুরু হয়েছে। ব্রিজ হওয়ার মাধ্যমে আশা করা যায়, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রক্ষা করা যাবে। আবার সিলেট শহর থেকে ছাতক উপজেলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু মাঝখানে নদী, তারপর দোয়ারাবাজার উপজেলা। এখানেও ব্রিজ না থাকায় দুর্ভোগের শেষ নেই। মোটকথা, সুনামগঞ্জের সঙ্গে চারটি উপজেলার সড়ক পথে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই।
সুমানগঞ্জ জেলা হাওরঅধ্যুষিত হওয়ায় বছরে ছয় মাস পানিতে তলিয়ে থাকে। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট যা আছে, তা-ও পানিতে ডুবে যায়। এ অবস্থায় ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। একে তো এ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম, তারপর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। শিক্ষার নাজুক অবস্থার জন্য এ অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করতে পারছে না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেই ঝরে পড়ছে। আর্থিক দিক থেকে সচ্ছল এবং সচেতন জনগোষ্ঠী সুনামগঞ্জ শহরে এসে লেখাপড়া করছে। কিন্তু বাকিরা রয়েছে অবহেলায়।
যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় উপজেলাগুলোতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে থাকতে অনীহা প্রকাশ করেন। কারো নতুন পোস্টিং হলে তদবিরের মাধ্যমে অন্যত্র চলে যেতে চান। ডাক্তার, এমনকি শিক্ষকরা পর্যন্ত থাকতে চান না। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল টাঙ্গুয়ার হাওর দেখার। তাহিরপুর হয়ে সেখানে যেতে হয়। তাহিরপুরে একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে চার-পাঁচজনের বেশি শিক্ষক নেই। শুধু সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণদশা ও ভালো আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় বদলি হয়ে শহরে চলে আসেন।
হাওর অঞ্চলের মানুষদের বেশি সমস্যার পড়তে হয়_স্বাস্থ্য বিষয়ে। বর্ষা মৌসুমে নৌকা কিংবা ট্রলারযোগে যাতায়াত করা যায়, কিন্তু শুকনো মৌসুমে একমাত্র বাহন মোটরসাইকেল। তা-ও রাস্তা কাঁচা হওয়ায় মোটরসাইকেলে চড়তে সমস্যা হয়। জরুরি কোনো শারীরিক সমস্যায় উপজেলা সদর থেকে জেলা শহরে আসা অনেকটা দুষ্প্রাপ্যমাত্র। না দেখে বিশ্বাস করা দুরূহ, হাওর অঞ্চলের মানুষরা কী কষ্টে জীবনযাপন করছে। প্রতিবছর এ অঞ্চলের কৃষকদের ফসল ওঠার মৌসুমে চিন্তার শেষ নেই। এ সময় আকস্মিক বন্যা হলে তাদের সবকিছু শেষ হয়ে যায়। সারা বছর তাদের কষ্টের শেষ থাকে না। ফসল রক্ষা বাঁধগুলো অরক্ষিত না থাকলে কিংবা ভেঙে পড়লে সব কিছু শেষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকে। কখনো কখনো তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে ব্যাপক ফসলহানী ঘটে। এ জন্য প্রয়োজন টেকসই বাঁধ, যা সহজে ভেঙে যেতে না পারে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় কৃষি ছাড়া অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে না। হাওর অঞ্চল হওয়ায় কিছু লোক মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, কিন্তু সেখানেও রয়েছে দৌরাত্ম্য, পেশিশক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব। জলমহাল ইজারা নিয়ে প্রকৃত জেলে ও প্রভাবশালীদের মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব লেগে থাকে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষকে জীবিকার প্রয়োজনে শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা হলো একটি দেশের প্রাণ, উন্নয়নের চাবিকাঠি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও সুনামগঞ্জ জেলা অন্ধকারে রয়ে গেছে। মাত্র কয়েকটি ব্রিজই পারে পুরো সুনামগঞ্জকে বদলে দিতে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামোসহ সব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের জন্য দরকার ঘাট, ব্রিজ ও কালভার্টের উন্নয়ন। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের কাছে আকুল আবেদন জানাব, ভাটি অঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করুন, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করুন, হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে শক্তিশালী করুন। দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর দিকে একটু তাকান।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
neayahmed_2002@yahoo.com
সিলেটের সঙ্গে সুনামগঞ্জ জেলার রয়েছে সরাসরি সড়কপথ। কিন্তু রাস্তা প্রশস্ত না হওয়ায় এবং কিছু ব্রিজ ও কালভার্ট ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটে। সুনামগঞ্জ জেলার সঙ্গে ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই। সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ সুনামগঞ্জবাসীর অনেক দিনের দাবি। সম্প্রতি ব্রিজের কাজ শুরু হয়েছে। ব্রিজ হওয়ার মাধ্যমে আশা করা যায়, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রক্ষা করা যাবে। আবার সিলেট শহর থেকে ছাতক উপজেলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু মাঝখানে নদী, তারপর দোয়ারাবাজার উপজেলা। এখানেও ব্রিজ না থাকায় দুর্ভোগের শেষ নেই। মোটকথা, সুনামগঞ্জের সঙ্গে চারটি উপজেলার সড়ক পথে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই।
সুমানগঞ্জ জেলা হাওরঅধ্যুষিত হওয়ায় বছরে ছয় মাস পানিতে তলিয়ে থাকে। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট যা আছে, তা-ও পানিতে ডুবে যায়। এ অবস্থায় ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। একে তো এ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম, তারপর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। শিক্ষার নাজুক অবস্থার জন্য এ অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করতে পারছে না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেই ঝরে পড়ছে। আর্থিক দিক থেকে সচ্ছল এবং সচেতন জনগোষ্ঠী সুনামগঞ্জ শহরে এসে লেখাপড়া করছে। কিন্তু বাকিরা রয়েছে অবহেলায়।
যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় উপজেলাগুলোতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে থাকতে অনীহা প্রকাশ করেন। কারো নতুন পোস্টিং হলে তদবিরের মাধ্যমে অন্যত্র চলে যেতে চান। ডাক্তার, এমনকি শিক্ষকরা পর্যন্ত থাকতে চান না। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল টাঙ্গুয়ার হাওর দেখার। তাহিরপুর হয়ে সেখানে যেতে হয়। তাহিরপুরে একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে চার-পাঁচজনের বেশি শিক্ষক নেই। শুধু সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণদশা ও ভালো আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় বদলি হয়ে শহরে চলে আসেন।
হাওর অঞ্চলের মানুষদের বেশি সমস্যার পড়তে হয়_স্বাস্থ্য বিষয়ে। বর্ষা মৌসুমে নৌকা কিংবা ট্রলারযোগে যাতায়াত করা যায়, কিন্তু শুকনো মৌসুমে একমাত্র বাহন মোটরসাইকেল। তা-ও রাস্তা কাঁচা হওয়ায় মোটরসাইকেলে চড়তে সমস্যা হয়। জরুরি কোনো শারীরিক সমস্যায় উপজেলা সদর থেকে জেলা শহরে আসা অনেকটা দুষ্প্রাপ্যমাত্র। না দেখে বিশ্বাস করা দুরূহ, হাওর অঞ্চলের মানুষরা কী কষ্টে জীবনযাপন করছে। প্রতিবছর এ অঞ্চলের কৃষকদের ফসল ওঠার মৌসুমে চিন্তার শেষ নেই। এ সময় আকস্মিক বন্যা হলে তাদের সবকিছু শেষ হয়ে যায়। সারা বছর তাদের কষ্টের শেষ থাকে না। ফসল রক্ষা বাঁধগুলো অরক্ষিত না থাকলে কিংবা ভেঙে পড়লে সব কিছু শেষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকে। কখনো কখনো তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে ব্যাপক ফসলহানী ঘটে। এ জন্য প্রয়োজন টেকসই বাঁধ, যা সহজে ভেঙে যেতে না পারে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় কৃষি ছাড়া অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে না। হাওর অঞ্চল হওয়ায় কিছু লোক মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, কিন্তু সেখানেও রয়েছে দৌরাত্ম্য, পেশিশক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব। জলমহাল ইজারা নিয়ে প্রকৃত জেলে ও প্রভাবশালীদের মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব লেগে থাকে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষকে জীবিকার প্রয়োজনে শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা হলো একটি দেশের প্রাণ, উন্নয়নের চাবিকাঠি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও সুনামগঞ্জ জেলা অন্ধকারে রয়ে গেছে। মাত্র কয়েকটি ব্রিজই পারে পুরো সুনামগঞ্জকে বদলে দিতে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামোসহ সব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের জন্য দরকার ঘাট, ব্রিজ ও কালভার্টের উন্নয়ন। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের কাছে আকুল আবেদন জানাব, ভাটি অঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করুন, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করুন, হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে শক্তিশালী করুন। দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর দিকে একটু তাকান।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
neayahmed_2002@yahoo.com
No comments