সরল গরল-তুঘলকি ঢাকা ভাগ আধা তুঘলকি হরতাল by মিজানুর রহমান খান

ম্রাট মোহাম্মদ বিন তুঘলক কিন্তু মোটেই হাবাগোবা লোক ছিলেন না। অদ্ভুত কোনো কাণ্ডকারখানা দেখলে আমরা বলি, ‘তুঘলকি কাণ্ড’। তিনি দার্শনিক ছিলেন, সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। একবার তাঁর মনে হলো, রাজধানীটা দিল্লি থেকে সরিয়ে দাক্ষিণাত্যের দেবগিরিতে (বর্তমান মহারাষ্ট্র) স্থানান্তর করবেন।


তাঁর মাথায় যেহেতু ঢুকেছে, সুতরাং এটা হতে হবে। কোনো সমীক্ষা হয়নি, কোনো পর্যালোচনা নয়, হঠাৎ বাদশাহ নামদারের ফরমানে রাজধানী স্থানান্তরিত। ওই দেবগিরির খতনাকরণ হয়েছিল দৌলতাবাদ। কিন্তু এলাকাটি রাজধানী করার উপযোগী ছিল না। ফলে রাজধানী গঠন ও শাসনকার্য পদে পদে বিপদগ্রস্ত হলো।
এ গল্প আমাদের স্মরণে এসেছে রাজধানী ঢাকার তুঘলকি বিভক্তিকরণে। বিভক্তিকরণ তুঘলকি। কিন্তু সবকিছু সবার মানায় না, তাই এর প্রতিবাদে বিএনপির হরতাল করা আধা তুঘলকি। এটা বলছি এ কারণে যে দুই দলই নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণের মুঠো আলগা করতে অনিচ্ছুক। সন্দেহাতীতভাবে তারা ‘স্থানীয় শাসনে’র চরম বিরোধী। এক ঢাকায় তারা মানুষকে সেবা দেয়নি। দুই ঢাকাতেও তারা সেবা দেবে না। উপজেলা পরিষদকে পঙ্গু করার তুঘলকি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিএনপিকে আমরা দেশব্যাপী হরতাল করতে দেখিনি। আবার আজ যে কারণে হরতাল, সেই হরতাল একদিন আওয়ামী লীগকে একই দাবিতে আমরা করতে দেখতে পারি। দুই দলের ভাঁওতাবাজি দেখতে দেখতে মানুষ তিতিবিরক্ত।
প্রদেশ করে দেশশাসন বাংলাদেশ গোড়াতে ভাবেনি। ভেবেছে এককেন্দ্রিক সরকারব্যবস্থা। তবে ক্ষমতা যাতে কুক্ষিগত না থাকে, সে জন্য বাহাত্তরের সংবিধানপ্রণেতারা স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে অনেক গুরুত্ব দেন। ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে লেখা হলো, স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিরা ‘স্থানীয় শাসন’ দেবেন। ব্রিটেন ও উন্নত দেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা যা কার্যকরভাবে করে আসছিল, সেটাই সংবিধানে লেখা হলো। কিন্তু শাসকের মানসিকতায় তা অনুসরণের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। তাই ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীতে এ দুটি অনুচ্ছেদের বিলুপ্তি ঘটে। ১৬ বছর পরে তা ১৯৯১ সালে ফিরে আসে। এরপর আমরা ১৯৯২ সালে কুদরত-ই-ইলাহি পনির বনাম বাংলাদেশ মামলায় একটি মাইলফলক রায় পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই রায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নামের দুই নারদ মিলেমিশে পদ্ধতিগতভাবে তছনছ করেছে এবং এখনো করছে। কিন্তু এ নিয়ে ওরা কিন্তু পরস্পরের বিরুদ্ধে কাদা-ছোড়াছুড়ি কিংবা নর্তনকুর্দন করে না। আদালতের যে রায় নিজেদের কাজে লাগে না, সেই রায় তারা যে এককাট্টা হয়ে দুমড়েমুচড়ে দিতে পারে, কাগজের ঠোঙা বানিয়ে তাতে চানাচুর খেতে পারে, এটা তারই দৃষ্টান্ত।
আমাদের তারকাখচিত তৎকালীন আপিল বিভাগে ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বিচারপতি এ টি এম আফজাল, বিচারপতি মোস্তাফা কামাল ও বিচারপতি লতিফুর রহমান। তাঁরা ১৯৯২ সালের ৩০ জুলাই সর্বসম্মতভাবে দুই শর্তে রায় দিলেন। প্রথমত, আগামী চার মাসের মধ্যে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে ‘প্রশাসনিক একাংশ’ ঘোষণা করা এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে সব স্তরের স্থানীয় সরকার শুধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে করতে হবে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এ রায় কার্যকর করতে গিয়ে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ভণ্ডামি করেও দিব্যি পার পেয়ে যাচ্ছে। তারা প্রথম কতগুলো বছর অ্যাটর্নি জেনারেলকে দিয়ে মিথ্যা বলিয়ে সময় বাড়িয়ে নিয়েছে। তারপর দেখেছে দূর ছাই, আর কত! এরপর তারা ওটা ভুলে গিয়ে শান্তিতে আছে।
আগামী বছরের ৩০ জুলাই স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে এই সেরা রায়টি লঙ্ঘন (বর্তমানে জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) করার ২০তম বার্ষিকী আমরা উদ্যাপন করতে পারি। এ রায় আজ আলোচনায় আনার আরেকটি কারণ, ঢাকা ভাগ করা নিয়ে শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কিছু বক্তব্যের উত্তর দেওয়া। সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সিটি করপোরেশন ভাগ করা নতুন নয়। লন্ডনে দুটি করপোরেশন, ম্যানিলায় চারটি পৌরসভা, সিডনিতে পৌরসভা একাধিক।’ এক শহরে একাধিক মেয়র থাকার তথ্য সঠিক বলে যদি আমি থেমে যাই, তাহলে আমার অবস্থা সেই অভাগা পণ্ডিতের মতো হতে পারে।
দুই গ্রামের দুই পণ্ডিত। কে সেরা, তা নিয়ে তর্ক। ঠিক হলো প্রকাশ্যে জ্ঞানের লড়াইয়ে হারজিত ঠিক হবে। গাছতলায় নিরক্ষর অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ভিড় জমাল। প্রথম পণ্ডিতের প্রশ্ন, ‘বলুন তো, হর্নস অব ডিলেমা মানে কী?’ দ্বিতীয় পণ্ডিত চেঁচিয়ে উত্তর দিলেন, ‘উভয়সংকট।’ এরপর দ্বিতীয় ও ধূর্ত পণ্ডিতের প্রশ্ন, ‘বলুন তো, আই ডোন্ট নো এর মানে কী?’ প্রথম পণ্ডিত সহজ উত্তর ভেবে আরও জোরে চেঁচিয়ে বললেন, ‘আমি জানি না।’ জনতা এটা তাঁর অজ্ঞতা ভেবে দ্বিতীয় পণ্ডিতকেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে মেনে নিলেন। তাঁরই জয়ধ্বনি গেয়ে বাড়ি ফিরলেন। আমাদের সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিদেশে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বেশ চড়া সুরে ঢাকা ভাগের সপক্ষে বিদেশি দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছেন এবং এর বিরোধিতাকারীদের ‘জ্ঞানপাপী’ বলছেন। কিন্তু আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই, ঢাকা ভাগের মতো কোনো নজির আমরা পাইনি। তাঁদের বক্তব্য সত্যের অপলাপ।
১৯৯২ সালে আপিল বিভাগ স্থানীয় সরকারের কার্যাবলি কী হবে, সে বিষয়ে ১০৬৬ সালের ‘নরম্যান বিজয়’ থেকে প্রায় হাজার বছরের ব্রিটিশ বিবর্তন আলোচনা করেছিলেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ লিখেছিলেন, ‘এককেন্দ্রিক সরকারব্যবস্থাসংবলিত ইংল্যান্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের ইউনিট হিসেবে “জেলা প্রশাসন” বলে কিছু নেই। রাজধানীর বাইরে কেন্দ্রীয় সরকারের উপস্থিতি একেবারেই ক্ষীণ। স্থানীয় সরকারের কতিপয় স্তর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের রাজনৈতিক পরিপক্বতা, প্রশাসনিক সামর্থ্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গড়ে তুলেছেন, যেখানে বস্তুত কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় সব ক্ষমতাই তাঁরা অনুশীলন করেন। এমনকি পুলিশ প্রশাসনও স্থানীয় সরকারের কাছে স্থানান্তর করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ স্থানীয় সংস্থার পুলিশ বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে চিফ কনস্টেবল অব পুলিশের তদারকিতে পরিচালিত হয়ে থাকে। আসলে যেসব বিষয় সমগ্র দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক বিবেচ্য হয়, সেগুলোতেই শুধু কেন্দ্রীয় সরকার তার ক্ষমতা কাজে লাগায়। এসব সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর কার্যক্রম ও ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়ার উপায় নেই। এসব কখনো বিলুপ্ত হয় না, কিংবা কেন্দ্রীয় সরকার অস্থায়ীভাবেও কখনো তার দায়দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় না। এখানেই ইংল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য। ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই আমরা দেখছি, স্থানীয় সরকারের সংস্থাগুলো ক্ষমতাসীন সরকার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে মাঝেমধ্যে করতলগত করে থাকে। এই অন্তর্বর্তী সময়টা তারা আমলাদের দিয়ে চালিয়ে থাকে।’
দুই অতিরিক্ত সচিব দিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনের করতলগতকরণ ওই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই ঘটেছে। সুতরাং অন্ধকে হাইকোর্ট দেখানোর মতো আমাদের ইংল্যান্ড দেখানো হাস্যকর। এক কোপে দুই ভাগ হয়নি লন্ডন, সিডনি, ম্যানিলা বা অন্য কোনো শহর। লন্ডনের আসল মেয়র একজনই। সব লন্ডনির মেয়র একজনই, তিনি বরিস জনসন। এর মধ্যে আছে টাওয়ার হ্যামলেট বরো, যার প্রথম নির্বাচিত মেয়র বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লুৎফর রহমান। অন্য সব বরোর মনোনীত বা নিযুক্ত মেয়র বা লর্ড মেয়র আছে। এমনিতে ব্রিটেনের বড় শহরের মেয়রকে লর্ড মেয়র এবং ছোট শহরের মেয়রকে মেয়র বলা হয়। কেউ কারও বস বা অধীনে নন। প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কার্যক্রম নির্দিষ্ট। কারও ক্ষমতা কারও সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বৃহত্তর লন্ডন শহরের একাধিক লর্ড মেয়র ও মেয়র রয়েছে। এখন যদি সামগ্রিক সরকার কাঠামো এবং তাদের দায়দায়িত্ব ও স্বাধীনতা বিবেচনা না করে বলা হয়, লন্ডনে একাধিক মেয়র থাকলে ঢাকায় থাকতে পারবে না কেন, তাহলে তাতে ওই পণ্ডিতের ধূর্ততা ফুটে ওঠে। সবচেয়ে বড় যুক্তি ‘নগর সরকারের’ ধারণা প্রত্যাখ্যানে দুই বড় দল এককাট্টা। এমনকি বিএনপি গতকাল নাগরিক সমাজের বিরল সমর্থনে হরতাল করতে সক্ষম হলেও তারা কিন্তু নগর সরকার বা স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে মুখে কুলুপ এঁটেই আছে।
সংসদের আইনে ঢাকা ভাগের যুক্তি: ‘জনসংখ্যা এক কোটির ওপরে। একটি কেন্দ্র থেকে তাদের সেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। ফলে জনসাধারণ কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা পাচ্ছে না।’ কিন্তু দেড়-দুই কোটি জনসংখ্যার বহু শহর এক মেয়রে চলছে। ২০৫০ সালে সিডনির জনসংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত হবে। সে জন্য সেখানে নগর পৌরসভা বা কাউন্সিলগুলো একত্রকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। সিডনির মেয়রের সরকারি খেতাব ‘দি রাইট অনারেবল লর্ড মেয়র অব সিডনি’ এবং তিনি একজনই। ম্যানিলার নগর সরকার যথেষ্ট বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। রাজধানীসহ ১৭টি শহর নিয়ে গঠিত মেট্রোপলিটন ম্যানিলা ডেভেলপমেন্ট অথরিটির জবাবদিহি রাষ্ট্রপতির কাছে। মূল রাজধানী ম্যানিলার মেয়র একজনই। সুতরাং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যদি আমাদের একটু বুঝিয়ে বলেন, তাহলে আমরা আলোকপ্রাপ্ত হতে পারি।
শুধু কোরবানির গরুর রক্ত পরিষ্কার করার কাজে নিয়োজিত এমন ঢাকাই মেয়র দুনিয়ায় বিরল। কিন্তু তাঁর ক্ষমতায়ন নিয়ে কোনো চিল্লাপাল্লা শুনি না।
সৈয়দ আবুল মকসুদসহ পাঁচজন বুদ্ধিজীবীর স্বশাসিত নগর সরকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা পূরণে হরতাল না করে প্রয়োজন ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ এবং কুদরত-ই-ইলাহি পনির মামলার রায় অনুসরণ করা। পরিহাস হলো, এই দুটির কোনোটিই তাঁদেরও দাবিদাওয়ার বিষয় নয়।
তাই বলি, উপযুক্ত কারণ না দর্শিয়ে ঢাকা ভাগ তুঘলকি হলেও এর বিরোধিতায় বিএনপির হরতাল করা আধা তুঘলকি। সুপ্রিম কোর্টের রায় না মেনে তৃণমূলে সাচ্চা গণতন্ত্র গেলাতে বিএনপি টাউটনির্ভর ‘গ্রাম সরকার’ করেছিল।
সাহিত্যমোদী তুঘলক গরুর পালের মতো দিল্লির বাসিন্দাদের জবরদস্তি খেদিয়ে তাঁর সাধের রাজধানী দৌলতাবাদে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে ছিল পানির প্রচণ্ড অভাব। পানি না পেয়ে বহু লোকের মৃত্যু ঘটেছিল। তুঘলকের জেনারেলরাও খেপেছিলেন। তাই মাত্র দুই বছরের মধ্যে তুঘলক তাঁর রাজধানী আবার দিল্লিতে ফিরিয়ে এনেছিলেন। ওই ঘটনার ৬৮৪ বছর পরের বাংলাদেশে আমরা অবশ্য জানি না, দুই ঢাকা কয় বছরে একত্র হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.