জ্বালানি-পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পথে যাত্রা by মুশফিকুর রহমান

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে তীব্রমাত্রার না হলেও ঘন ঘন ভূমিকম্পন অনুভূত হচ্ছে বলেই যে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের’ বিরোধিতার কথা উঠছে, তা নয়। বরং বিরোধীরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা, চুক্তির স্বচ্ছতা, পরিবেশ নিয়ে উৎকণ্ঠা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলছে। অবশ্য এখন অবধি প্রায় অর্ধশতকের পুরোনো ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প’ বাস্তবায়নে সামান্য বাধাই অপসারিত হয়েছে।


রাশিয়ার ‘রসআটম’-এর সঙ্গে গত ২ নভেম্বর স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তিসহ ইতিপূর্বে স্বাক্ষরিত অন্যান্য সমঝোতা প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পথে সামান্য পথ অতিক্রম মাত্র। প্রকল্পের জন্য যে বিপুল ব্যয় হবে, তার জোগান কে দেবে, প্রকল্পের অর্থায়ন ও তহবিল সংগ্রহ কৌশল নির্ধারণ, প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত স্থানের উপযোগিতা পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন, প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা ও ব্যবস্থাপনা কৌশল, কোন ধরনের প্রযুক্তি (নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ) ব্যবহূত হবে, কারিগরি প্রশিক্ষণসহ কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য জনবল তৈরির পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায় নির্ধারণসহ অসংখ্য বিষয় এখনো নিশ্চিত ও চূড়ান্ত করা হয়নি। খুবই মসৃণভাবে প্রকল্প এগোলে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের তহবিল পেতে কোনো সমস্যা না হলেও আগামী ১০-১২ বছর আগে রূপপুর প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানে গত ১১ মার্চ ২০১১ যে প্রলয়ংকরি ভূমিকম্প ও সুনামি আঘাত হেনেছে, এর ধাক্কা কেবল জাপানের ফুকুশিমা দাইচির প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎচুল্লির শীতলীকরণ ব্যবস্থা অচল ও চুল্লির বিস্ফোরণ ঘটায়নি; সারা পৃথিবীতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের শঙ্কা ও উদ্বেগকে বড় মাপে আলোড়িত করেছে। জার্মানি তার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ২০২২ নাগাদ বন্ধ করার নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউরোপসহ পৃথিবীর অনেক দেশ পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে আসতে চাইছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি শঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, পরমাণু বিদ্যুৎভীতির কারণে ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বে পারমাণবিক শক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা (বর্তমানে বিশ্বে চলমান ৪৪০টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ রি-অ্যাক্টর থেকে পৃথিবীর মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ১৫ শতাংশ উৎপাদিত হয়) বর্তমানের মতো প্রায় একই অবস্থানে থাকবে (পরমাণু শক্তিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লেও পরমাণু বিদ্যুতের অবস্থান ১৫ শতাংশ থাকবে), যদিও জ্বালানির উৎপাদন চাহিদা প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়বে। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্ধিত চাহিদার সিংহভাগ জোগান দেবে। এতে গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎপাদন আনেক বেড়ে যাবে এবং বায়ুমণ্ডলের অনাকাঙ্ক্ষিত উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত হবে। মূল্য ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এই সময়ে বর্তমানের প্রায় ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে বড়জোর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে। ক্রমেই বেড়ে চলা জ্বালানি ও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বিদ্যমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ স্থাপনা থেকে সম্মিলিত পশ্চাদ্পসরণ অথবা বিদ্যমান পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তর তাই অবাস্তব ভাবনা।
সস্তায় জ্বালানির চাহিদা পূরণে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই অক্সাইডসহ গ্রিনহাউস গ্যাসের বাড়তি নিঃসরণ সীমিত করতে প্রায় ‘দূষণমুক্ত’ ও ‘নির্ভরযোগ্য’ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি হিসেবে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা গত পঞ্চাশের দশকে যাত্রা শুরু করেছে, ফুকুশিমা দাইচি দুর্ঘটনা তার যাত্রাপথ অনেকটুকু জটিল করেছে। অবশ্য সমর্থকদের দাবি, দীর্ঘ পথযাত্রায় পরমাণু বিদ্যুৎ অনেক বেশি ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট করেছে, পৃথিবীকে অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন থাকতে সহায়তা করেছে, মানুষের জন্য সস্তা বিদ্যুৎ ও স্বচ্ছন্দের জীবন নিশ্চিত করেছে। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি-মাইল, ১৯৮৮ সালে ইউক্রেনের চেরনোবিল এবং ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমায় তিনটি বড় দুর্ঘটনা ছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা ঘটেনি। এমনকি, অন্যান্য শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানির তুলনায় বড় তিনটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা নগণ্য। এ প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর ভয় সাধারণভাবে মানুষকে বিমানবন্দরের যাত্রাপথের বিপদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ভাবায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিমানযাত্রা অন্য সব বাহনের তুলনায় বেশি নিরাপদ।
আমাদের দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার পক্ষে অন্যতম জোরালো যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে যে, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি এখন অনেক পরিপক্ব, নিরাপদ আর নির্ভরযোগ্য। তা ছাড়া, ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভর জ্বালানি তেলভিত্তিক ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে এর প্রয়োজন আছে। বিশেষত, জ্বালানি তেলের দ্রুত মূল্য ওঠানামা ও দীর্ঘ মেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ঝুঁকি, তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী জ্বালানি ব্যবহার অবকাঠামো গড়া দরকার। তা ছাড়া উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বর্ধিত জ্বালানি চাহিদা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পিত উদ্যোগ না নিলে আমাদের পুরো উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা ব্যাহত হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির জোগান পাওয়ার অন্যান্য বিকল্পের মধ্যে দীর্ঘদিনে গ্যাসের ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি এবং ক্রমশ দেশি ‘সস্তা’ গ্যাস দুর্লভ হয়ে ওঠায় জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেশি কয়লা সম্ভাবনাময় হলেও ক্লান্তিহীন রাজনৈতিক বিতর্কে পড়ে নিকট ভবিষ্যতে এর লাভজনক উত্তোলন সম্ভাবনা তিরোহিত। ফলে, চাহিদা পূরণে অবধারিত হয়েছে আমদানি করা ব্যয়বহুল ও প্রধানত পরিশোধিত জ্বালানি তেল। আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা আমাদের মতো অর্থনীতিতে ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়তে পারিনি; তাই ছোট ছোট জাহাজে জ্বালানি তেল তুলনামূলক বেশি খরচে কিনে আনতে বাধ্য হচ্ছি। নাজুক এই ব্যবস্থায় একক জ্বালানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ থেকেও পরমাণু বিদ্যুৎকে একটি অবলম্বন ভাবা হচ্ছে। যদিও ১০ বছর পর চাহিদা বৃদ্ধির নিরিখে রূপপুরের পরিকল্পিত এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র (পরবর্তী সময়ে আরও এক হাজার মেগাওয়াটের প্লান্ট যোগ হবে) সামান্যই স্বস্তি দেবে।
পাবনার রূপপুরে যখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ ১৯৬৩ সালে নেওয়া হয়েছিল, প্রায় একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পথে যাত্রা শুরু করে। এখন দক্ষিণ কোরিয়ায় ২১টি চলমান পারমাণবিক বিদ্যুৎপ্লান্ট দেশের চাহিদার প্রায় ৩৯ শতাংশ সরবরাহ করে। আরও ছয়টি পারমাণবিক চুল্লি সেখানে নির্মণাধীন। চীন ইতিমধ্যে ২৪টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং আরও ৭৭টি প্লান্ট নির্মাণ করছে। পাকিস্তান দুটি পারমাণবিক প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং আরও একটির নির্মাণ শুরু করেছে। ভারতে ১৯টি পারমাণবিক (ছয়টি কেন্দ্র) বিদ্যুৎ প্লান্ট থেকে চার হাজার ৫৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, উত্তর প্রদেশ ও গুজরাটে অবস্থিত বর্তমান প্লান্টগুলোর সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে আরও দুই হাজার ৬২০ মেগাওয়াট নির্মাণাধীন প্লান্ট যোগ হবে। এ ছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হরিপুরসহ ওডিশা, হরিয়ানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে আরও নতুন সাতটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য স্থান চিহ্নিত করেছে। ভারতে পরমাণু শক্তি থেকে মোট উৎপাদিত বিদ্যুৎশক্তির ৪ শতাংশ বর্তমান সক্ষমতা আগামী ২৫ বছরে ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এশিয়ার অন্যান্য দেশও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পৃক্ত হয়েছে। সুতরাং, আমাদের দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা করা বা না করার ওপর আমাদের পরিবেশ ও তেজস্ক্রিয়তার দূষণভিতি রোধ করা সম্ভব নয়।
১৯৮৭ সালে গবেষণা ও কৃষি, চিকিৎসার কাজে ব্যবহূত তেজস্ক্রীয় আইসোটপ উৎপাদনের প্রয়োজনে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন সফলভাবে একটি ছোট পারমাণবিক রি-অ্যাক্টর পরিচালনা করে আসছে। সেই বিবেচনায় এ দেশে কিছু সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে। এখন বরং আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক ভাবনা হওয়া উচিত, তৃতীয় বা পরবর্তী প্রজন্মের তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি কত দামে আমরা পাব (সাধারণত জীবাশ্ম জ্বলানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ব্যয় দুই দেকে আড়াই গুণ বেশি ব্যয়বহুল), বিদ্যুৎ উৎপাদনমূল্য তাতে ইউনিট-প্রতি কত দাঁড়াবে, নিরাপদে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল আমরা কীভাবে ও কত দিনে প্রস্তুত করতে পারব, পুরো প্রকল্পের জন্য অনুকূল শর্তে বিনিয়োগ কীভাবে সম্ভব হবে ইত্যাদি। আমরা চাই বা না চাই, হেলাফেলা করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ বা পরিচালনা করতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ব সংস্থাসমূহ আমাদের অনুমতি দেবে না । বরং এ ক্ষেত্রে বিশ্ব সম্প্রদায়ের বাড়তি নজরদারি আমাদের যথাযথভাবে সামাল দেওয়ার মতো যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। নইলে, প্রকল্প শুরু করেও তা আলোর মুখ দেখবে না।
ভূমিকম্পের ভয়ে আমরা আতঙ্কিত হতে যত আগ্রহী, সেই তুলনায় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে মানসম্মত স্থাপনা নির্মাণ, নগর পরিকল্পনার ন্যুনতম শৃঙ্খলা মানতে সামান্য উৎসাহী। প্রলয় থেকে বাঁচতে উটপাখি হওয়া তো সমাধান নয়, বরং দক্ষ হয়ে ওঠা, সাহসের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা বেশি কার্যকর। পারমাণবিক বিদ্যুতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও সে রকম এক দুঃসাহসী কিন্তু অর্জনযোগ্য স্বপ্ন।
ড. মুশফিকুর রহমান: পরিবেশ বিষয়ক লেখক।

No comments

Powered by Blogger.