দক্ষিণ এশিয়া-পাকিস্তানি রাজনীতির তৃতীয় খেলোয়াড় by মশিউল আলম

পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের অধিকারী রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন বেশ ঘোলাটে। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আবারও হুমকির মুখে, সামরিক বাহিনী আবারও দেশের কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে, সেই ষড়যন্ত্র ঠেকাতে সরকারের লোকজন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাইছে, আর সামরিক বাহিনী বলছে এমন অভিযোগ সত্য নয়—এই ধরনের জল্পনা-কল্পনা, অভিযোগ ও পাল্টা-অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের রাজনৈতিক আবহাওয়া।


পাকিস্তানের ছয় দশকের ইতিহাসের অধিকাংশ সময় কেটেছে সামরিক শাসনের অধীনে। সামরিক বাহিনী দেশটির রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিরাট এক অংশীদার; পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের অধিকারী হওয়ার পর থেকে তাদের সেই অংশীদারির দাবি আরও প্রবল হয়েছে। তবে দেশের ভেতরে সামরিক শাসনবিরোধী জনমত আর বিদেশি দাতাদের চাপের কারণে সামরিক বাহিনী ইচ্ছেমতো ক্ষমতা নিয়ে নিতে পারে না, সে জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। পাকিস্তানি রাজনীতির এ দুই সনাতন অংশীদারের সঙ্গে এবার যুক্ত হতে চাইছে তৃতীয় এক অংশীদার। দেশটির বিচার বিভাগ—প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মুহাম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের বিচার বিভাগ ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত এমন কিছু বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে, যেগুলো সাধারণত প্রশাসনের এখতিয়ারভুক্ত। চিনি ও জ্বালানি তেলের দাম, হিজড়াদের নাগরিক অধিকার, বন্দরনগর করাচির রাস্তাঘাটে যানচলাচলব্যবস্থা ইত্যাদি নানা বিষয়ে রুল জারি করেছে বিচার বিভাগ। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার পাকিস্তান ব্যুরো প্রধান ডিক্ল্যান ওয়াল্শ পাকিস্তানি বিচার বিভাগের এই ‘জুডিশিয়াল অ্যাকটিভিজম’-এর এক নতুন মাত্রা সম্প্রতি লক্ষ করছেন। ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন-এ ২৪ জানুয়ারি তিনি লিখেছেন, দেশটির সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যকার বিরোধের মধ্যখানে ঢুকে পড়েছে বিচার বিভাগ; পাকিস্তানি রাজনীতির তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে নিজের জায়গা করে নিতে চাইছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মুহাম্মদ চৌধুরী, যিনি লৌহদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী বিচারক হিসেবে পরিচিত। ২০০০ সালে তাঁকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ দিয়েছিলেন সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ; তার দুই বছর পর তিনি এমন এক রায় লেখেন, যাতে পারভেজ মোশাররফ ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়ে যান। কিন্তু ২০০৭ সালে তিনি এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেন যে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সর্বময় ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে থাকে। যেমন—আদালত নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও এফবিআইয়ের সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের মিলিত তৎপরতায় বিচারবহির্ভূতভাবে কত লোককে গ্রেপ্তার করে আটকে রাখা হয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে। তা ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারির নির্দেশও দেয় আদালত। ২০০৭ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ বিচারপতি ইফতিখারকে পদচ্যুত করে গৃহবন্দী করার চেষ্টা করলে তার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা রাস্তায় নেমে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আইনজীবীদের সংঘাতের দৃশ্য বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়।
তার দেড় বছর পরে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ পদত্যাগ করেন। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন নিহত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোর স্বামী আসিফ আলী জারদারি। প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মুহাম্মদ চৌধুরীকে তাঁর পদ ফিরিয়ে দিতে জারদারি গড়িমসি করেন। কারণ তাঁর ধারণা, ইফতিখার চৌধুরীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক ভালো, বিরোধী দল পাকিস্তান মুসলিম লিগেরও তিনি ঘনিষ্ঠ লোক। ইফতিখার চৌধুরীর পুনর্নিয়োগের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন শুরু করে বিরোধী দল, সে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন পিএমএলের নেতা নওয়াজ শরিফ। অবশেষে জারদারি ইফতিখার চৌধুরীকে প্রধান বিচারপতির পদটি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন। তার কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট জারদারির বিরুদ্ধে পুরোনো দুর্নীতির মামলা বিচারের পথ প্রশস্ত করে; সরকার বলার চেষ্টা করে যে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জারদারির বিশেষ অধিকার আছে, তাঁর বিচার করা যাবে না। এ নিয়ে সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে রশি টানাটানি চলতে থাকে; ইতিমধ্যে আদালত এমন কিছু উদ্যোগ নেয়, যার ফলে তার প্রতি জনগণের সমর্থন বেড়ে যেতে থাকে। উচ্চপদস্থ আমলা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়, ইসলামাবাদে ম্যাকডোনাল্ডসের একটি রেস্টুরেন্ট ও জার্মান একটি সুপার মার্কেট খোলার বিরুদ্ধে রায় দেয়, হিজড়াদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে এবং লাহোরের একটি প্রধান সড়কে গাছ কাটার বিরুদ্ধে রুল জারি করে। এসবের মধ্য দিয়ে আদালত শহুরে মধ্যবিত্ত পাকিস্তানিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে; সরকার ও রাজনীতিকদের দুর্নীতি, জনস্বার্থবিরোধী রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বেকারত্ব ইত্যাদি সমস্যায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ যুবসমাজের মধ্যে বিচার বিভাগের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। এদেরই একটি বড় অংশ সম্প্রতি সমর্থন জোগাচ্ছে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের দল তেহরিক-ই ইনসাফের প্রতি। তা ছাড়া পারভেজ মোশাররফের সময় থেকেই যে আইনজীবী সমাজ ইফতিখার চৌধুরীর পক্ষে ছিল, তারা এখনো তাঁর সঙ্গেই রয়েছেন। আইনজীবী সমাজ ও বিচার বিভাগের সমর্থকেরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির দুর্নীতিবাজ এবং অথর্ব সরকারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগ গণতন্ত্রকে বাড়তি শক্তি জোগাচ্ছে। পাকিস্তানের বিচারকেরা মনে করেন, সামরিক স্বৈরশাসক পারভেজ মোশাররফকে ক্ষমতা থেকে হঠানোর সেসব দিন থেকেই পাকিস্তানের জনগণ তাঁদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব অর্পণ করেছে। দাঙ্গা পুলিশের নির্যাতনে রক্তাক্ত বিচারকদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে জনগণ তাঁদের গণতন্ত্র দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়েছে।
সর্বসম্প্রতি যে দুটি বিষয়ের কারণে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট আবার আলোচনায় উঠে এসেছে, তার একটি হলো: এক বড় ধরনের দুর্নীতির মামলার বিষয়ে জবানবন্দি দিতে খোদ প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে সুপ্রিম কোর্টে তলব। সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করেছে, তিনি জবানবন্দি দিতে না এলে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হবেন। অন্যটি হলো: বহুলপ্রচারিত ‘মেমোগেট’। গত বছর ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বাহিনী ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার পর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জারদারি সরকারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হুসেন হাক্কানি প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির নির্দেশে মার্কিন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল মাইক মুলেনের উদ্দেশে একটি চিঠি লেখেন এবং মনসুর আইজাজ নামের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এক আমেরিকান ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সেটি মাইক মুলেনের কাছে পৌঁছান। চিঠিতে মাইক মুলেনকে অনুরোধ করা হয়, পাকিস্তানের বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র থেকে বিরত থাকতে মার্কিন প্রশাসন যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কায়ানি ও আইএসআইয়ের প্রধান জেনারেল পাশার প্রতি একটি ‘কড়া, জরুরি ও সোজাসাপ্টা’ বার্তা পাঠায়। এ খবর বা গুজব ফাঁস হয় গত নভেম্বর মাসে, তারপর তোলপাড় ওঠে। রাষ্ট্রদূত হুসেন হাক্কানি পদত্যাগ করেন। প্রেসিডেন্ট জারদারি বলেন, কাউকে দিয়ে চিঠি লেখানোর প্রয়োজন তাঁর নেই, এটা তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা। সেনাপ্রধান আশরাফ কায়ানি দাবি করলেন, তাঁরা সরকার উৎখাতের কোনো ষড়যন্ত্র করেননি; এই ঘটনার তদন্ত করতে হবে। ঘটনার তদন্তের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন পড়ে।
বেসামরিক সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার এই দ্বন্দ্বে ঢুকে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেল পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট—প্রেসিডেন্ট জারদারিকে যার মোটেও পছন্দ নয়। ইতিমধ্যে তার পক্ষপাতিত্বের কিছু অভিযোগ উঠেছে: জারদারিকে দুর্নীতির মামলায় কাবু করতে চায়, কিন্তু তাঁর প্রতিপক্ষ নওয়াজ শরিফকে কয়েকটি অপরাধের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। নওয়াজ শরিফ ও ইমরান খান—রাজনৈতিক ময়দানের এই দুই শক্তিমান খেলোয়াড়কে এক পাশে আর সামরিক বাহিনীকে অন্য পাশে রেখে প্রধান বিচারপতি ইফতিখার চৌধুরী জারদারি সরকারের বিরুদ্ধে যে খেলা খেলতে উদ্যত হয়েছেন, সেটাকে অনেকেই পাকিস্তানের জন্য আরেক নতুন বিপজ্জনক ব্যাপার হিসেবে দেখছেন। সাবেক একজন আইনজীবী, ২০০৭ সালে যিনি বিচারপতি ইফতিখার চৌধুরীর পক্ষে লড়াই-সংগ্রাম করেছিলেন, ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন-এর কাছে মন্তব্য করেছেন, ‘বিচারকেরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নন; কিন্তু তাঁরা নিজেদেরকে এমনই ক্ষমতাবান মনে করছেন, যেন তাঁরাই দেশের একমাত্র পবিত্র প্রতিষ্ঠান। এটা স্বৈরশাসকদের মনোভাব। সব স্বৈরশাসক মনে করেন, একমাত্র আমিই পরিষ্কার, একমাত্র আমিই সঠিক কাজটা করতে পারি। বিচার বিভাগের জন্য এ রকম প্রবণতা ভীষণ বিপজ্জনক।’
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.