সেমিনারে এইচ টি ইমাম-বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে আনা কঠিন

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘সেটেলার’ (পুনর্বাসিত বাঙালি) পাঠানো ছিল এক বিরাট ভুল। কিন্তু যাঁদের পাঠানো হয়েছে এবং অনেক দিন ধরে সেখানে বসবাস করছেন, এখন তাঁদের সরিয়ে আনা কঠিন। এই বাস্তবতা সবাইকে মেনে নিতে হবে।


পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই উন্নয়ন শীর্ষক এক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এইচ টি ইমাম এ কথা বলেন। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার একটি পাঁচতারা হোটেলে দিনব্যাপী ওই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও নেপালভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন (ইসিমোড)’ যৌথভাবে ওই সেমিনারের আয়োজন করে।
দীর্ঘদিন পর সরকার যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়েছে, তখন সেটেলারদের সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার ওই বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ববহ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সেমিনারে অংশ নেওয়া কয়েকজন প্রথম আলোকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের সঙ্গে সেটেলারদের সরিয়ে আনার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ, চুক্তিতে সেটেলারদের সরিয়ে আনার কোনো শর্ত নেই।
তবে সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) কয়েকজন নেতা বলেন, চুক্তিতে উল্লেখ না থাকলেও এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে মৌখিক সমঝোতা হয়েছিল। তা ছাড়া সেটেলারদের ব্যাপারে জেএসএসের আপত্তির কারণেই পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রণয়ন বন্ধ আছে।
সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান বলেছেন, সরকার সার্বিক বিষয় ভেবেচিন্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে অগ্রসর হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণে সরকার সংকল্পবদ্ধ। সংস্কৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি থাকলে তাও পূরণ করা হবে।
সেমিনারে অংশ নেওয়া কয়েকজন প্রথম আলোকে বলেন, চুক্তির অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতি-অধ্যুষিত বিশেষ অঞ্চলের স্বীকৃতি দেওয়া এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ সরকার নেয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সাংসদ যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও শাহ আলম। স্বাগত বক্তব্য দেন সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউএনডিপির দেশীয় পরিচালক স্টেফান প্রিসনার, আইএলওর দেশীয় পরিচালক অন্দ্রে বগুই এবং ইসিমোডের মহাপরিচালক ডেভিড মডেনও বক্তব্য দেন।
সেমিনারের সমাপনী অধিবেশনে সবাই একটি বিষয়ে সহমত প্রকাশ করেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য চুক্তির বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এই অধিবেশনের সভাপতি বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এস এ সামাদ বলেন, ‘চুক্তির বাস্তবায়ন হওয়া উচিত ছিল প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু তা না হওয়ায় দীর্ঘদিনে অনেক ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এখন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।’
কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য তিনটি উপাদান বিবেচনায় নেওয়া হয়—পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজ। কিন্তু চতুর্থ যে বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো মানবাধিকার। কাজেই টেকসই উন্নয়নকে বিবেচনা করতে হবে এগুলোর একটি সমন্বিত ও সামগ্রিক ফলাফলের ভিত্তিতে। সেই বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যে উন্নয়ন হয়েছে, তাকে টেকসই বলা যায় না। উপরন্তু এর সঙ্গে বাড়তি বোঝা হিসেবে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা।
এই অধিবেশনের অন্য বক্তারা নানা বিষয় ব্যাখ্যা করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব উন্নয়ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা যেন স্থানীয় জনগণের প্রকৃত চাহিদা পূরণে সক্ষম এবং পরিবেশ-প্রতিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
উদ্বোধনী ও সমাপনীর মধ্যখানে তিনটি আলাদা অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নকার্যক্রম, এতে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সেখানকার প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা, এসব ক্ষেত্রে সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে নানামুখী আলোচনা হয়।
এই অধিবেশনগুলোতে কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, রাজা দেবাশীষ রায় ও এস এ সামাদ সভাপতিত্ব করেন। সেমিনারে মোট নয়টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়।

No comments

Powered by Blogger.