বিএনপির দাবি অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য-যুদ্ধাপরাধের বিচার

ন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বন্ধের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছে। এত দিন ট্রাইব্যুনালের গ্রহণযোগ্যতা, বিচারের মান, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মানবাধিকার রক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল দলটি। শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাইব্যুনালের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে অবিলম্বে এর কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছে। যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ এই দলটির সঙ্গে যুক্ত।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ মিত্রতার বিষয়টিও অজানা নয়। সব আড়াল-আবডালে সরিয়ে বিএনপি যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিল, যা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল, যদিও এ-সংক্রান্ত আইন অতীতে কোনো সরকারই বাতিল করেনি। বর্তমান সরকার এই অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে বিচারের গ্রহণযোগ্যতা, স্বচ্ছতা, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মানবাধিকার ও আত্মপক্ষ সমর্থন নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো শুরু থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। দীর্ঘ ৪০ বছর পর এ ধরনের বিচার আয়োজনের কাজটি কঠিন। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো বিবেচনার বাইরে ছিল না।
একাত্তরে এ দেশের জনগণের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের যে ঘটনা ঘটেছে, তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা জাতীয় কর্তব্য। দেশের অভ্যন্তরীণ বিচারকাঠামোর আওতায় এ বিচার শুরু হলেও এর আন্তর্জাতিক মান, বিচারের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতার বিষয়গুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। বিচারের মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও উপেক্ষণীয় নয়। ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে এর মান উন্নয়নে যেসব পরামর্শ এসেছে, তার অনেক কিছুই আমলে নিয়ে গত জুলাই মাসে ট্রাইব্যুনালের বিধিমালায় ২৩ দফা সংশোধনী আনা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দুটি সংশোধনীর মাধ্যমে সাক্ষীদের সুরক্ষা ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জামিন পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
সরকার ও দেশের বিভিন্ন মহল থেকে এ বিচারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে বিধি সংশোধন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বলেছেন, ট্রাইব্যুনাল ‘বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত’ মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে। কিন্তু এর পরও প্রতিটি দেশের বিচারব্যবস্থা নিজেদের মতো করেই চলে। কোনো দেশের বিচারব্যবস্থায় অন্য কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপেরও কোনো সুযোগ নেই।
এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বন্ধে যে দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির কাছ থেকে পাওয়া গেল তা তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই প্রমাণ। মুখে যা-ই বলুক, দলটি যে একাত্তর সালে ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অনুষ্ঠানের বিরোধী, তা এখন স্পষ্ট হলো। তবে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, এ বিচার বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বিএনপির আহ্বান জানানো। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বিচারব্যবস্থায় অন্য কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের সুযোগ না থাকার পরও এ ধরনের আহ্বান যুদ্ধাপরাধের বিচারকাজে বাধা সৃষ্টিরই নামান্তর।

No comments

Powered by Blogger.