ফাজিলে উত্তীর্ণদের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ!-* ফাজিল (স্নাতক সমমান) স্তরে ৩০০ নম্বরের কোর্স কম পড়ায় ভর্তির জন্য অযোগ্য -* ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, ফাজিল কোর্স এখন ১৪০০ নম্বরেরই by অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য

মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য এবার বন্ধ হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা। চলতি বছর স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তির জন্য প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে সুস্পষ্টভাবে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সুযোগ না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ আরো কমে গেল। কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছর আগে থেকেই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়।


জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এক হাজার ১০০ নম্বরের সিলেবাস পড়ে ফাজিল (স্নাতক সমমান) পাস করে। আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা এক হাজার ৪০০ নম্বরের সিলেবাস পড়ে ডিগ্রি পাস করে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ফাজিল স্তরে ৩০০ নম্বরের সিলেবাস কম পড়ায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তির জন্য তাঁদের বিবেচনা করা হয়নি।
ফাজিল ডিগ্রি প্রদানকারী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করছে, ২০০৭ সাল থেকে ফাজিল স্তরে এক হাজার ৪০০ নম্বরের সিলেবাসই পড়ানো হচ্ছে।
মাদ্রাসার শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানে সরকার মাদ্রাসার শিক্ষাকে মূলধারার সমমান করার চেষ্টা চালাচ্ছে, সেখানে বিপরীত স্রোতে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০ সালের স্নাতকোত্তর প্রথম পর্বের ভর্তির জন্য আবেদনপত্র আহ্বান করে গত ২২ নভেম্বর। এ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের আবেদন করতে হবে আগামী ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, 'ডিগ্রি (পাস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণসহ ২০০৯ সাল বা তৎপূর্বে সার্টিফিকেট কোর্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা এ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে ভর্তির জন্য বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড হতে ফাজিল বা কামিল ডিগ্রি এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল (স্পেশাল) সনদ গ্রহণযোগ্য হবে না।' জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ভর্তি বিজ্ঞপ্তিটি স্নাতকোত্তর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) ড. এস এম আবু রায়হানের সই করা।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বলছেন, ফাজিল ও কামিল সাধারণ শিক্ষার যথাক্রমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সমমানের। তাহলে ফাজিল পাস করে কেন তাঁরা সাধারণ শিক্ষায় স্নাতকোত্তর করতে পারবেন না।
আবুল বাশার নামের একজন শিক্ষার্থী বলেন, 'আমরা এক হাজার ৪০০ নম্বরের সিলেবাস পড়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছি। এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাধারণ শিক্ষায় স্নাতকোত্তর করার ইচ্ছা। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের ভর্তির জন্য আবেদন করারই সুযোগ দেয়নি।' তিনি আরো বলেন, 'সরকার যেখানে আমাদের সনদকে সাধারণ শিক্ষার সমমান করে দিয়েছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা আমলেই নিচ্ছে না। এটা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতারণা নয় কি?'
জানতে চাইলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মোসলেম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ফাজিল পাস করা শিক্ষার্থীদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তির সুযোগ না দিয়ে অন্যায় করেছে। তাদের এ অন্যায়ের জন্য ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আমরা মামলা করতে পারি।' তিনি আরো বলেন, সরকার যেখানে মাদ্রাসার শিক্ষার ফাজিলকে সাধারণ শিক্ষার ডিগ্রির (স্নাতক) সমমান হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে, সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ রকম আদেশ দেয় কিভাবে? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের আদেশ অমান্য করেছে।
এর জবাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) ড. এস এম আবু রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণ শিক্ষায় ডিগ্রি পাস করতে হলে এক হাজার ৪০০ নম্বরের সিলেবাস পড়তে হয়। এ শিক্ষাবর্ষের ভর্তির জন্য মাদ্রাসা থেকে পাস করা যেসব শিক্ষার্থী আবেদন করবেন তাঁরা এক হাজার ১০০ নম্বরের সিলেবাস পড়ে ফাজিল পাস করেছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তিন বছরে ডিগ্রি পাস করলেও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দুই বছরে ফাজিল পাস করেছেন। এজন্যই ভর্তির জন্য মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিবেচনা করা হয়নি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মিথ্যা কথা বলছে। ২০০৭ সাল থেকে যাঁরা ফাজিল পাস করছেন, তারা সবাই এক হাজার ৪০০ নম্বরের সিলেবাস পড়েছেন। এক হাজার ৪০০ নম্বরের সিলেবাস পড়ানোর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশও রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেও সে আদেশের কপি পাঠানো হয়েছে।
আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, 'ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্ম যদি এতই স্বচ্ছ হতো তাহলে এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়) চিঠি লিখল না কেন? আমার জানা মতে, এ বিষয় নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো চিঠি আসেনি।'
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছে 'জমিয়াতুল মুদাররেসিন'। সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা সাবি্বর হোসেন মুনতাজি কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কোণঠাসা করার জন্যই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ কাজ করেছে। তিনি বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সরকারের সিদ্ধান্ত মেনেই এক হাজার ৪০০ নম্বরের ফাজিল কোর্স পড়েছেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছেন না। অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে দাখিল (এসএসসি), আলিম (এইচএসসি), ফাজিল (স্নাতক) ও কামিল (স্নাতকোত্তর) শ্রেণীর ডিগ্রি দেওয়া হতো মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে। প্রত্যেকটি পরীক্ষার সনদ পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের দুই বছর পড়তে হতো। ফাজিল শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের এক হাজার ১০০ নম্বরের সিলেবাস নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে ফাজিল ও কামিল ডিগ্রি দেওয়ার জন্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০০৭ সাল থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ফাজিল শ্রেণীর সিলেবাস এক হাজার ১০০ নম্বরের পরিবর্তে এক হাজার ৪০০ নম্বর করে। ওই বছরই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসার ফাজিল শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য এক হাজার ৪০০ নম্বরের ফাজিল (স্পেশাল) পরীক্ষা নেয়। পরের বছর থেকে ফাজিল শ্রেণীর পরীক্ষা এক হাজার ৪০০ নম্বরের হয়ে আসছে। ফলে মাদ্রাসার ফাজিল শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতকোত্তর শিক্ষা নিতে পারেন। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য সে সুযোগ রাখল না।

No comments

Powered by Blogger.