নৌ চুক্তি না থাকায় মিয়ানমারের পণ্য কম দামে আনা যাচ্ছে না-কাজে লাগছে না দেশি জাহাজ ব্যবহারের সুযোগ by আসিফ সিদ্দিকী,

মিয়ানমার থেকে নিত্যপণ্য বিশেষ করে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন তুলনামূলক কম দামে আমদানির যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও সেই সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না নৌ চুক্তির অভাবে। আর এক কারণে মিয়ানমার থেকে পণ্য আমদানিতে দেশিয় ৩০০ জাহাজ ব্যবহারের সুযোগও কাজে লাগছে না। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দেড় থেকে তিন হাজার টন ধারণক্ষমতার এসব জাহাজের পণ্য পরিবহন ক্ষমতা মোট ৯ লাখ টন।


এই জাহাজগুলো এখন দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ পথে পণ্য পরিবহন করছে।এদিকে পণ্য পরিবহনে দেশিয় জাহাজ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার লিখিত দাবি জানিয়েছে জাহাজ মালিকদের দুটো সংগঠন বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও কোস্টাল শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কোস্টাল শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান গাজী বেলায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করা গেলে দেশিয় জাহাজে অনেক কম সময়ে ও কম খরচে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হবে। এর প্রভাব পড়বে চাল, ডাল, রসুন, পেঁয়াজ ও আদাসহ নিত্যপণ্যের খুচরা বাজারে। তা ছাড়া দেশীয় জাহাজে পণ্য পরিবহন ভাড়া দেশের মধ্যে থাকবে।' জানা গেছে, বাংলাদেশ ২০১০-১১ অর্থবছরে মিয়ানমার থেকে ১৭২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। এই বিপুল পণ্য সরাসরি টেকনাফ বা চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে পারে না। তৃতীয় দেশ অর্থাৎ সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড হয়ে এসব পণ্য কনটেইনারে করে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। মিয়ানমার থেকে নিত্যপণ্য বিশেষ করে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন খুব কম দামে আমদানির যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও সেই সুযোগ কাজে লাগানো হচ্ছে না।
মিয়ানমারের পণ্য সিঙ্গাপুর বন্দর হয়ে বাংলাদেশে আনতে গিয়ে বাড়তি জাহাজ ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালক নুরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কনটেইনারে না এনে মিয়ানমার থেকে এসব পণ্য সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে আনা গেলে অনেক কম দামে পণ্য বাজারে সরবরাহ করা যেত। ভাড়া কম হলে স্বাভাবিকভাবেই নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল হতো।'
বর্তমানে মিয়ানমার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছোট জাহাজে করে প্রথমে টেকনাফ স্থলবন্দরে আসে। সেখান থেকে পণ্য খালাস করার পর তা ট্রাকে করে চট্টগ্রাম বা দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে পণ্য পরিবহনে খরচ বেশি হওয়ায় আমদানিকারকরা খুব বেশি উৎসাহ দেখান না। ফলে মিয়ানমার থেকে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির বিশাল সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
আমদানিকারকরা জানান, মিয়ানমারের পণ্য দেশের ছোট আমদানিকারকরা মাত্র ৫০০ টনের ছোট জাহাজে করে সরাসরি আমদানির সুযোগ পান। দেশের সোনালী ব্যাংক থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার ডলারের ব্যাংক ড্রাফট দিয়ে এই পণ্য আমদানি করতে হয়। এই ছোট জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে পারে না। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী দেড় থেকে তিন হাজার টনের ৩০০ জাহাজকে মিয়ানমার থেকে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দিলে সেগুলো সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর কিংবা লাইটার জেটি ভিড়তে পারত। এমনকি সেগুলো দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক কম খরচে আমদানি পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হতো। জাহাজমালিকরা জানান, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রটোকলের আওতায় নৌ পথে বছরে প্রায় দুই লাখ টন ভারতীয় পণ্য দেশে আসার সুযোগ রয়েছে। দেশের প্রায় তিন শ জাহাজ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পণ্য পরিবহন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশ কাগর্ো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও কোস্টাল ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অধীন মোট দুই হাজার জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে কুতুবদিয়া ও সোনাদিয়া এলাকায় অবস্থানরত মাদার ভ্যাসেল বা বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে বন্দরে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ডেপুটি সেক্রেটারি মাহবুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কুতুবদিয়া থেকে মিয়ানমারের সিতু (আকিয়াব) বন্দর পর্যন্ত সমুদ্র পথের দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। আমাদের জাহাজগুলো চট্টগ্রাম থেকে ১৯০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে নির্বিঘ্নে পণ্য পরিবহন করতে পারলে মিয়ানমার থেকে পণ্য আনা কঠিন কোনো কাজ নয়। আর দেড় থেকে দুই হাজার টনের আমাদের জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশনাল জাহাজগুলোর তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। তার পরও সরকার চাইলে আমাদের জাহাজগুলোকে আমরা আন্তর্জাতিক মানের সমতুল্য করব।'

No comments

Powered by Blogger.