কল্পকথার গল্প-যেভাবে অন্ধ হয় ক্ষমতার চোখ by আলী হাবিব

শুরুতেই একটু রাজনীতি কপচে নেওয়া যাক। সেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের গল্প। জোসেফ স্ট্যালিন দোর্দণ্ড প্রতাপে ক্ষমতায়। তিনি গেলেন এক স্কুল পরিদর্শনে। ক্ষমতাধরদের স্কুল পরিদর্শনে যাওয়া মানেই তো এক এলাহি ব্যাপার! সে আমলে আমাদের দেশেও স্কুল ইন্সপেক্টর ছিল একটা ভীতিকর ব্যাপার। ইন্সপেক্টর স্কুলে আসার আগে স্কুলঘর ধুয়েমুছে সাফ করা হতো। স্কুলের ছেলেমেয়েদের শিখিয়ে-পড়িয়ে রাখা হতো।


সেদিন এলাকায় সাজ সাজ রব পড়ে যেত। অনেকটা রাজকীয় চালে ইন্সপেক্টর আসতেন। ক্লাসে ক্লাসে যেতেন। মণ্ডা-মিঠাই খেতেন। তো, স্ট্যালিন যখন স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছেন, স্বাভাবিকভাবেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের শিখিয়ে-পড়িয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি একটা ক্লাসে ঢুকলেন। শিক্ষার্থীরা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানাল। তিনি সবাইকে বসতে বললেন। একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'তোমার বাবা কে?' ছেলেটিকে আগে থেকেই তো সব শিখিয়ে রাখা ছিল। সে নির্ভয়ে জবাব দিল, 'স্যার, আমার বাবা জোসেফ স্ট্যালিন। আমাদের সবার বাবা।' ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন তিনি। এবার পাশের ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার মা কে?' ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে জবাব দিল, 'এই দেশ। দেশ আমাদের সবার মা।' স্ট্যালিনের মুখে হাসি। তিনি এবার ক্লাসের শেষের দিকের বেঞ্চের একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?' ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে ঝটপট জবাব দিল, 'যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এতিম হতে চাই স্যার।' স্ট্যালিন-উত্তর যুগে খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নেই এ গল্প চালু ছিল।
এমন জবাব শোনার পর স্ট্যালিনের চেহারা কেমন হয়েছিল সেটা জানা যায়নি। তবে এটা ঠিক, এমন পরিস্থিতিতে রাজনীতিবিদরা সামলে নিতে পারেন। সেই দক্ষতা তাঁদের আছে। এবার আরেকটা গল্প। দলের মধ্যে গণতন্ত্রচর্চা নিয়ে কথা বলছিলেন দুই রাজনীতিবিদ। একজন ব্রিটেনের, অন্যজন ভারতীয়। ব্রিটেনের রাজনীতিবিদ বলছিলেন, 'দলের মধ্যে স্বাধীন মতপ্রকাশের ব্যাপারে আমি দলীয় ফোরামে কথা বলেছি। বলেছি, দলের নীতি নির্ধারণে সাধারণ কর্মীদের মতামতের মূল্য দিতে হবে। শুরুতে ব্যাপারটিতে কেউ আগ্রহ না দেখালেও এখন নীতি নির্ধারণের ব্যাপারে সাধারণ কর্মীদের কথা শোনা হচ্ছে।' এবার ভারতীয় রাজনীতিকের কথা বলার পালা। তিনি বললেন, 'আমিও নীতি নির্ধারণের ব্যাপারে দলীয় ফোরামে কথা বলেছি। প্রথম দিন কথা বলার পর কোনো পরিবর্তন দেখিনি। দ্বিতীয় দিন কথা বললাম। বেশ জোর গলাতেই তুলে ধরলাম আমার প্রস্তাব। না, কোনো পরিবর্তন নেই। এবার তৃতীয় দিন বললাম। তৃতীয় দিনের পরিবর্তনটা টের পেলাম। চোখ মেলে দেখলাম আমি হাসপাতালের বিছানায়, ডান চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে।'
গল্প হোক গণতন্ত্র নিয়ে। নির্বাচন কমিশনে নির্বাচনের আগে সভা বসেছে। আমাদের দেশেও নির্বাচন কমিশন আছে। নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক আছে। তো, এক দেশের নির্বাচন কমিশন একটি নির্বাচনী সভা ডেকেছে। নির্বাচনে যাঁরা প্রার্থী, তাঁরা পরস্পরের মত তুলে ধরবেন। সেখানে সাতজন প্রার্থী। সবাই নিজ নিজ দলের পক্ষে, নিজেদের পক্ষে কথা বললেন কণ্ঠে সবটুকু মধু ঢেলে। প্রার্থীরা নিজেদের প্রতিশ্রুতির কথা জানালেন। সেখানে দর্শকরাও ছিলেন। তাঁদেরও কথা বলার সুযোগ ছিল। প্রার্থীদের কথা বলা শেষ হলে দর্শক সারি থেকে একজন কথা বলার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, 'ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ এ জন্য যে তিনি আমাদের গণতন্ত্র নামের একটা জিনিস দিয়েছেন। গণতন্ত্র টিকে থাক দীর্ঘদিন।' তাঁর এই কথা শুনে নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা ওই দর্শকের কাছে জানতে চাইলেন, 'আপনি গণতন্ত্রের এত ভক্ত কেন?' ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, 'গণতন্ত্র আছে বলেই আমি অন্তত ছয়জন মিথ্যুককে ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারব।'
তাহলে গণতন্ত্র হচ্ছে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে রাখার একটা উপায়। ক্ষমতায় আনার উপায়ও কিন্তু গণতন্ত্র। অবশ্য আমাদের দেশে এর ব্যতিক্রম যে ঘটেনি, তা নয়। ভিন্ন পথেও ক্ষমতায় চেপে বসার উদাহরণ বাংলাদেশে আছে। অনেক ভ্রাতাই জাতির ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ভিন্ন পথে। পরে অবশ্য খোলনলচে বদলে গণতান্ত্রিক হয়ে যেতে বাধেনি তাঁদের। আবার গণতান্ত্রিক পন্থায় নয়, ভিন্ন পন্থায় ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার উদাহরণও তৈরি হয়েছে। যদিও এখন 'সে দিন হয়েছে বাসি।' কিন্তু সেই কালো অধ্যায়গুলো তো দেশের ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। মুছে ফেলা যাবেও না।
তাহলে সরল সমীকরণে এটা বুঝতে পারা যাচ্ছে যে গণতন্ত্র হচ্ছে ক্ষমতায় আসা ও যাওয়ার একটা মোক্ষম মাধ্যম। 'সপ্তম স্বর্গের অষ্টম দরজা'র মতো ক্ষমতায় আসা কিংবা যাওয়ার দরজা হচ্ছে গণতন্ত্র। গুড! কিন্তু ক্ষমতা জিনিসটা কী? ক্ষমতার স্বাদ কেমন? ক্ষমতা কি শুধুই একটা শব্দ? ক্ষমতার কি মোহিনী শক্তি আছে? ক্ষমতার বদল কি মানুষকে বদলে দেয়? অনেক কিছুই তো বদলে গেল আমাদের জীবন থেকে। ক্ষমতার বদল কি বদলে দিতে পারে আমাদের জীবনধারা? ক্ষমতাও কি বদলে যায়? তার আগে জানা দরকার, আমাদের জীবন থেকে কী কী বদলে গেল। তবে ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করতে হয়। কেউ কেউ আবার ক্ষমতার রাজনীতিতে অভ্যস্ত। ক্ষমতা যখন যে রাজনীতির সঙ্গে থাকে, তখন সেই রাজনীতির লেজুড় ধরতে পারঙ্গম রাজনীতিকের অভাব নেই। অন্তত আমাদের দেশে এমন রাজনীতিকের অভাব নেই।
একটা সময় ছিল যখন স্বাধীনতা শব্দটির অর্থ অনেক বড় ছিল আমাদের কাছে। এই শব্দটির অর্থ কি আগের মতো আছে? এককালে রাজনীতি অনেক বড় ব্যাপার ছিল। যাঁরা রাজনীতি করতেন, তাঁদের অন্য চোখে দেখা হতো। এককালে রাজনীতি করা ছেলে মানেই মনে করা হতো আলোকিত একটি ছেলে। রাজনীতি করা ছেলে মানে ধরেই নেওয়া হতো, সেই ছেলেটি দেশের উন্নতির জন্য তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতিকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। কিন্তু আজ? আজ ধরেই নেওয়া হয়, রাজনীতি মানেই ধান্দাবাজি। রাজনীতি এখন চাকরি বা ব্যবসাপাতির মতো একটা পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতির মতো সহজে ব্যক্তিগত উন্নতির পথকে সুগম করতে নাকি আর কোনো পেশাই পারে না। আজকের দিনে তাই সবাইকে ছুটতে দেখা যাচ্ছে রাজনীতির দিকে। এখন পলিটিকসই নাকি আসল দুনিয়াদারি। সম্মান, অর্থ, ক্ষমতা_মানুষের যা চাওয়া আছে, রাজনীতিতে সব পাওয়া যায়।
রাজনীতির কথাই যখন এল, তখন জনগণের কথা তো আসবেই। একসময় 'জনগণ' শব্দটি কত শ্রদ্ধার সঙ্গে ব্যবহার করা হতো। এখন ব্যঙ্গ করা হয় জনগণকে নিয়ে। জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত জনসভা। সেই জনসভা কোথায় গেল? আগে জনসভার যে ব্যাপ্তি ও মহত্ত্ব ছিল, ওজন ছিল_এখন কি তা আছে? আগে জনসভার মধ্যে ইন্দ্রজাল ছিল। ছিল স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞা। আজ আর তা খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন হরতালে খুঁজে পাওয়া যায় না আগের সেই তাল। এককালের দাবি আদায়ের মোক্ষম অস্ত্র হরতাল এখন নিতান্তই বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। অথচ এই সেদিনও দেশপ্রেম, জনগণ, দেশ-উদ্ধার নিয়ে কী তুমুল আলোচনা হতো। আজ যেন এসব হালকা হতে হতে মিলিয়ে গেল হাওয়ায়।
সব এখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক। যেদিকে ক্ষমতা, সেদিকেই দৃষ্টি সবার। এখন ক্ষমতার ভার বেশি। ক্ষমতা ক্ষমতা দেখে, ক্ষমতা লেখে। ক্ষমতা দেখায়, ক্ষমতা লেখায়। ক্ষমতার লেখা এবং ক্ষমতার দেখা_এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রশ্ন করা যেতে পারে, কিভাবে দেখে ক্ষমতা? আসলে কি ক্ষমতা দেখতে পায়? শুনতে পায়? মানুষের মনের কথা কি ক্ষমতার কানে পেঁৗছতে পারে? মানুষের মনের কথা, মনের ভাষা কি বুঝতে পারে ক্ষমতা? পড়তে পারে?
একটু পুরাণে যাওয়া যাক। রামায়ণের গল্প। লঙ্কা জয় করে ফিরেছেন রাম। নিয়েছেন রাজ্যভার। সীতার অগি্নপরীক্ষা হয়ে গেছে। পরীক্ষায় পাস করে সীতা মন দিয়েছেন সংসারধর্মে। তখন সন্তান-সম্ভবা তিনি। এক দিন রাম কয়েকজন সভাসদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি তাঁদের কাছে জানতে চাইলেন, রাজ্যে তাঁকে নিয়ে কোনো কথা হচ্ছে কি না? তাঁকে নিয়ে নগরে ও গ্রামে কোনো জল্পনা-কল্পনা আছে কি না? এক সভাসদ জানালেন, রাম সম্পর্কে কথা উঠলে মানুষ তো ভালো কথাই বলে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে সীতাকে নিয়ে। অমনি রামের মুখ কালো হয়ে গেল। তিনি তাঁর ভাইদের ডেকে পাঠালেন। এলেন লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন। রাম হুকুম দিলেন, পরদিনই সীতাকে তপোবনে পাঠিয়ে দিতে হবে। রামের কথা অনুযায়ী তৈরি হলো গাড়ি। সীতা ভেবেছিলেন, তিনি যাচ্ছেন সেখানকার ঋষিদের উপহার দিতে। কিন্তু রাম যে তাঁকে আবার এভাবে দূরে সরিয়ে দিতে পারেন_এমন কথা তাঁর মাথায়ই আসেনি। ক্ষমতায় ছিলেন রাম। সেই ক্ষমতা তাঁকে পড়তে দেয়নি সীতার মন। সীতার ভালোবাসা বুঝতে পারেননি তিনি।
ক্ষমতায় গেলে কি এভাবেই অন্ধ হয়ে যেতে হয়? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে একটা জোক পরিবেশন করা যাক। ব্যস্ত এয়ারপোর্টে একটা বিমানে যাত্রীরা বসা। অপেক্ষা পাইলটদের। পাইলটরা এলেই বিমান উড়বে আকাশে। দুই পাইলট এলেন। তাঁদের হাতে সাদা ছড়ি। ডানে-বাঁয়ে টাল খেতে খেতে তাঁরা ঢুকলেন ককপিটে। যাত্রীরা সিটবেল্ট বেঁধে নিলেন। হঠাৎ রানওয়েতে বিপজ্জনকভাবে চলতে শুরু করল বিমানটি। যাত্রীরা ভয়ে চিৎকার শুরু করে দিলেন। কিছুটা পথ দৌড়ে গিয়ে বিমানটি আকাশে উড়ল। বিমানের ভেতরে তখনো যাত্রীদের চিৎকার। ককপিটে এক পাইলট আরেক পাইলটকে বলছেন, যাত্রীরা চিৎকার না করলে কেমন করে বুঝব, কখন টেক-অফ করতে হবে। অর্থাৎ বিমানের পাইলটরা শুধু অন্ধ নন, বধিরও ছিলেন।
ক্ষমতা কি এভাবে অন্ধ ও বধির হয়ে যায়? সম্প্রতি প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে, জীবজন্তুরা মানুষের আগে ভূমিকম্প সম্পর্কে জানতে পারে। ক্ষমতা কি টের পায়
কোথায় ফাটল?
লেখক : সাংবাদিক
habib.alihabib@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.