প্রতিবেশী : কিষেনজির মৃত্যু-বহুজাতিক কম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন কি থেমে যাবে

নসংখ্যা ও সংসদীয় ভোট বিচারে ভারত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। দেশটি পৃথিবীর পরাশক্তি চীনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি আবার পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের কারণে আত্মহত্যা করে। ধনপতিদের সংখ্যা ভারতে যেমন বাড়ছে, তেমনি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষ এ দেশেই বাস করে। দেশটির কৃষি, শিল্প_সবখানেই বহুজাতিক পুঁজির আগ্রাসন। ফলে ধনি-দরিদ্রের পার্থক্য দিন দিন বাড়ছে সেখানে।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের বিশাল খনিজ সম্পদ বিদেশি করপোরেট কম্পানির দখলে নেওয়ার চেষ্টা। ভারতের খনিজ সম্পদের একটি বড় অংশ আদিবাসী অধ্যুষিত রাজ্যগুলোতে। ভিটেমাটি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ওই সব রাজ্যের জনগণ দেশটির নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওয়িস্ট) বা সংক্ষেপে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বহুজাতিক কম্পানির এ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছে। ভারত সরকার মাওবাদীদের হটানোর জন্য ওই সাতটি রাজ্যে রাষ্ট্রীয় অনুমতি সাপেক্ষে বেসরকারি সালামা জুডুম নামের এক ভয়ংকর গুণ্ডাবাহিনী হত্যা, ধর্ষণ ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এরপর আসে মাওবাদী নির্মূল করার জন্য 'গ্রিনহান্ট অপারেশন'। বহুজাতিক কম্পানির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে মাওবাদীরা হয়ে ওঠে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন। সেই সংগঠনের তৃতীয় শীর্ষ নেতা কিষেনজিকে গত ২৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের শালবিহারে পুলিশ ঠাণ্ডা মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করে। কিষেনজির নিহত হওয়ার পর ভারতের শাসকশ্রেণী ও করপোরেট মালিকরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন এ কারণে যে মাওবাদীদের দমনে এটাই বোধ হয় সবচেয়ে বড় সাফল্য। কিষেনজির হত্যার মধ্য দিয়ে কি মাওবাদীদের আন্দোলন দমাতে পারবে ভারত? মাওবাদী আন্দোলনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেছেন আরিফুজ্জামান তুহিন

ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ অঞ্চলে মাওবাদীদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, রেড করিডর হিসেবে পরিচিত অঞ্চল ছত্তিশগড়, ওড়িষা, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের ৯২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে তাদের মুক্তাঞ্চল রয়েছে।
ভারতের সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) হিসাব ও তথ্য মতে, ২০ হাজারের অধিক সক্রিয় যোদ্ধা রয়েছে মাওবাদীদের। আরো ৫০ হাজারের মতো গ্রামপ্রতিরক্ষা বা প্যারা মিলিশিয়া বাহিনী রয়েছে সংগঠনটির। মাওবাদীদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে শঙ্কিত হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ মাওবাদীদের ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সর্বাপেক্ষা বৃহত্তর হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মাওবাদীদের এই রাজনৈতিক প্রভাব এক দিনে গড়ে ওঠেনি। ভারতের মাওবাদী আন্দোলনের পেছনে রয়েছে পতন ও বিকাশের এক দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাস।
১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক মহাবিতর্কের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলন ভাঙনের মধ্যে পড়ে, ভারতেও এর ধাক্কা লাগে। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার নকশালবাড়িতে জোতদারদের সশস্ত্র প্রতিরোধ করে কৃষকরা। কানু স্যানাল ও চারু মজুমদার নকশালবাড়ির কৃষকদের সশস্ত্র এ ধারাকে ভারতের কমিউনিস্ট বিপ্লবের পথ হিসেবে গ্রহণ করেন, যা পরবর্তী সময়ে নকশাল নামে পরিচিতি পায়। নকশাল আন্দোলন ভারতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)। ১৯৭২ সালে পুলিশ হেফাজতে চারু মজুমদারের মৃত্যু হলে ভারতের মাওবাদী আন্দোলনের প্রথম পর্ব শেষ হয়। চারু মজুমদারের পার্টি ভেঙে একাধিক দল-উপদলে বিভক্ত হয় মাওপন্থীরা। নব্বইয়ে এসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে সমাজতন্ত্রীদের অনেকে হতাশ হয়ে রণে ভঙ্গ দেয়। তবে মাওপন্থীরা মাওবাদী নামে ক্রমেই জোরদার হতে থাকে। মাও সে তুংয়ের চিন্তাধারা মাওবাদে উন্নীত হয় আশির দশকে। এ তত্ত্বায়নে প্রধান ভূমিকা রাখেন পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান ড. আবিমিয়েল গুজমান (গনজালো)। দুই দশক ধরে তিনি পেরুর জেলে আটক আছেন।
নব্বই-পরবর্তী সময়ে ভারতের একাধিক নকশালপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি, যারা একে অপরকে শত্রু মনে করত_তারা নিজেদের মধ্যে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ শুরু করে। এ ধারার মধ্যে প্রধানত দুটি গ্রুপ কাজ করে। একটি হলো গধড়ঁরংঃ ঈড়সসঁহরংঃ ঈবহঃবৎ (গঈঈ) আর অন্যটি চবড়ঢ়ষবং ডধৎ ৎেড়ঁঢ়। ২০০৪ সালে এই দুটি পার্টি ঐক্যবদ্ধ পার্টির ঘোষণা দেয়, যা ঈড়সসঁহরংঃ চধৎঃু ড়ভ ওহফরধ (গধড়রংঃ) নামে পরিচিত। এই ঐক্য আলোচনায় সদ্য নিহত কিষেনজির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।
এর পর থেকেই পাল্টে যায় ভারতের কমিউনিস্ট রাজনীতির হিসাব-নিকাশ। ভারতের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি বা নকশাল আন্দোলন আরো গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে ভারতের একের পর এক রাজ্যে।
ভারত সরকার মাওবাদীদের দমানোর জন্য একের পর এক বিশেষ বাহিনীর জন্ম দিয়ে আরো বিতর্কের জন্ম দেয়। শুরু হয় এনকাউন্টার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, যা ভারতে 'ভুয়া হত্যা' নামে পরিচিত। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ৫
আগস্ট ভারতের পার্লামেন্ট মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে।
আতঙ্কিত ভারত সরকার
সামরিক ব্যয় বাড়ছে
ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত সাত-আট বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭-৯ শতাংশে পেঁৗছলেও নিচের দিকের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবনমানের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়ছে না। গত ৫৮ বছরে ভারতের জিডিপি ৮ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশে পেঁৗছলেও দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষের সংখ্যা একই আছে। মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ৭০৮ রুপি থেকে বেড়ে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৪৯৪ রুপি হলেও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমছে না। প্রায় ৪০ কোটি মানুষের ভাগ্য বলতে গেলে আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। ভারতের অর্ধেক গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ পেঁৗছেনি। গ্রামে শিক্ষক-চিকিৎসক পাওয়া যায় না। মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এসব দরিদ্র মানুষের দৈনিক গড় আয় ৯০ রুপিরও কম। ভারতের রাজনীতির পুরোটাই দখল করেছেন পুঁজিপতি ধনিকশ্রেণীর ব্যবসায়ীরা। তাঁরা শুধু ব্যবসা নয়; খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
গত লোকসভায় কোটিপতি ছিলেন ১৫০ জন। আর চলতি লোকসভায় এই সংখ্যা সেফ্র দ্বিগুণ হয়ে তিন শতে পরিণত হয়েছে। কোটিপতিদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে দাগি আসামি ও সন্ত্রাসীদের কোটাও লোকসভায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সংখ্যা গতবার ছিল ১২৮, আর এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০। লোকসভায় নির্বাচিত এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও অগি্নসংযোগের মতো অভিযোগ রয়েছে। এর বিপরীতে ভারতের অর্ধেক মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আবাসন নেই বললেই চলে। ভারতীয় সমাজের এহেন শ্রেণীশোষণের হালই মাওবাদীদের জনপ্রিয় হতে সহায়তা করেছে।
প্রতিবছরই বাড়ছে ধনী ও গরিবের মধ্যে পার্থক্য। চলতি অর্থবছরের বাজেটে গত অর্থবছরের তুলনায় সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় ৪ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার বাজেটে সামরিক খাতে এক লাখ ৪৭ হাজার ৩৪৪ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪১ হাজার ৭০৩ কোটি রুপি। দেশটিতে অর্ধেক মানুষ তিন বেলা না খেতে পারলেও দেশটির পুঁজিপতিদের অবস্থা কিন্তু শীতেও বসন্তের মতোই। ভারতীয় পুঁজিপতিরা ১২২টি দেশে বিনিয়োগ করেছে। ভারত ছাড়িয়ে তারা আফ্রিকা, ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যেও বিনিয়োগ করছে। আর দক্ষিণ এশিয়ায় তো ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের একচেটিয়ে অবস্থান।
১৯৯১ সালের আগস্ট থেকে এপ্রিল ২০০৯ পর্যন্ত ভারতের বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৫ কোটি রুপি। ২০০৭ সালে ভারতের জিডিপি ছিল ১.২৩৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক অবয়বের দিক থেকে ১২তম অবস্থানে আছে।
এসব কারণে ভারতকে আগামীর সুপার পাওয়ার দেশের একটি মনে করা হচ্ছে। ভারত সম্পর্কে গোল্ডম্যান সার্চের ২০০৩ সালে করা এ রকমই একটি ভবিষ্যদ্বাণী। সেখানে বলা হয়েছিল, ভারতীয় অর্থনীতির অগ্রযাত্রা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০২০-এর মধ্যে ফ্রান্স ও ইতালিকে অতিক্রম করবে, ২০২৫ সালের মধ্যে জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়াকে দৌড়ে পেছনে ফেলে ভারত তার শক্ত ভিত গড়ে তুলবে। ২০৩৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরেই হবে ভারতের অবস্থান, যা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিশালী রাষ্ট্র হবে। তবে এত কিছু হয়ে গেলেও ভারতের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কিন্তু ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি, আগামী ৫০ বছরেও সে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এসবের বিপরীতে যদি দরিদ্র মানুষের অবস্থা পর্যালোচনা করা যায়, তাহলে দেখা যাবে_সামরিক খাতের ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের জন্য মাত্র ২২ হাজার ৬৪১ কোটি রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতের ৪৫ কোটি মানুষ দৈনিক ৯০ রুপিরও কম আয়ে জীবনযাপন করে। ইউএনডিপি প্রকাশিত দারিদ্র্য সূচকে ১৮২টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৩৪তম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যার রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে প্রতিবছর দূষিত পানি ও বাতাসের কারণে মারা যায় ৯ লাখ মানুষ। এ ধরনের প্রকট শ্রেণীবৈষম্যই দেশটিতে মাওবাদীদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে দাঁড় হতে সাহায্য করেছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম, যিনি নিজে একজন সাবেক করপোরেট খনি কম্পানির কেরানি, সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, 'এ দেশে সশস্ত্র বিপ্লবের তত্ত্বের কোনো জায়গা নেই, আমরা মাওবাদীদের এ গণমুক্তির তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করছি।' তিনি আরো জানান, 'প্রায় ২০টি রাজ্য মাওবাদী সমস্যায় আক্রান্ত।'

ইতিহাসের আগুন উসকে দিচ্ছে বিপ্লবীদের লাশ
'পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী জনসাধারণের কমিটি'র নেতা ছত্রধর মাহাতোর ভাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লালগড়ের মাওবাদী নেতা শশধর মাহাতোকে হত্যা করে। যথারীতি যৌথ বাহিনী এনকাউন্টারে নিহত হওয়ার গল্প প্রচার করেছে। এই হত্যার প্রতিবাদে সিপিআইর (মাওবাদী) ডাকে ঝাড়খণ্ড, ওড়িষা, পশ্চিমবঙ্গ_এই তিন রাজ্যে গত ১২ থেকে ১৪ মার্চ বনধ্ ডেকেছিল মাওবাদীরা। এর আগে অন্ধ্রপ্রদেশের পুলিশ সিপিআইর (মাওবাদী) কেন্দ্রীয় মুখপাত্র এবং পলিটব্যুরোর সদস্য চিমকুমারী আজাদকে নাগপুর থেকে গ্রেপ্তার করে বিমানে করে তেলেঙ্গানার জঙ্গলে নিয়ে হত্যা করে তারা সংঘর্ষে মৃত্যুর খবর প্রচার করেছিল। সর্বশেষ এই হত্যার নামের সঙ্গে যুক্ত হলো মাওবাদী পার্টির তৃতীয় শীর্ষনেতা কিষেনজি। এ পর্যন্ত মাওবাদীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এটাই সবচেয়ে বড় আঘাত বলে মনে করছেন ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, ৫০টি জেলার ৪১ শতাংশ মানুষ মাওবাদীদের সমর্থন করে। এর কারণ, আদিবাসী অধ্যুষিত ওই সব রাজ্যে বিপুল পরিমাণে লৌহ ও দস্তার খনি রয়েছে। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরাম ওই ধরনের একটি কম্পানির কেরানি হিসেবে আগে কর্মরত ছিলেন।
এর সঙ্গে ভারতের বিশাল কৃষকশ্রেণীর যে নির্মম শোষণ-নির্যাতন তাও মাওবাদীদের পাল্লা ভারী করেছে। ভারতের জাতীয় মানবাধিকার সংস্থার মতে, গত ১৬ বছরে আড়াই লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন দেশটিতে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন করে কৃষক আত্মহত্যা করছেন। 'সেন্টার ফর হিউমেন রাইটস' এবং 'গ্লোবাল জাস্টিস অ্যাট এনওয়াইইউ ল স্কুল' সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, প্রতি ৩০ মিনিটে একজন ভারতীয় কৃষক আত্মহত্যা করেন। ঘধঃরড়হধষ ঈৎরসব জবপড়ৎফং ইঁৎবধঁ (ঘঈজই), ওহফরধ'র পরিসংখ্যান মতে, ২০০৮ সালে ভারতে কমপক্ষে ১৬ হাজার ১৯৬ জন কৃষক আত্মহত্যা করেন, যা ১৯৯৭ সাল থেকে হিসাব করলে এক লাখ ৯৯ হাজার ১৩২ জন হয়। ২০০৮ সালের পরিসংখ্যান মতে, কৃষক আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়, যা সর্বমোট মৃত্যুর প্রায় ৬৬.৬ শতাংশ। প্রতিদিন দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তির জন্য মৃত্যুকে যে কৃষক বেছে নেন, সেই মৃত্যুউপত্যকায় মাওবাদীরা কৃষকদের হাতে বন্দুক তুলে দিয়ে তাঁকে সশস্ত্র করেছে। এ কারণে কৃষক মৃত্যুর উপত্যাকা হিসেবে পরিচিত এসব রাজ্যে মাওবাদীদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে।
ভারতের কৃষির প্রায় পুরোটাই চলে গেছে বহুজাতিক কম্পানির হাতে। সেখানে সার, বীজ (জেনেটিক্যাল মডিফায়েড অর্গানিজম-জিএমও), পানি ও কৃষি উৎপাদন উপকরণের পুরোটাই চলে গেছে বহুজাতিক কম্পানির হাতে। এর পাশাপাশি খনিজ সম্পদ দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে বহুজাতিক কম্পানিগুলো। ভিটেমাটি উচ্ছেদ করে লোহা, দস্তার খনি থেকে আকরিক তুলতে চায় বহুজাতিক কম্পানি। আর মাওবাদীদের নেতৃত্বে আদিবাসীরা তাদের জীবন দিয়ে দিতেও প্রস্তুত, তবে ভিটেমাটি ছাড়বে না। আদিবাসীদের সঙ্গে মাওবাদীরা মিলে তৈরি করেছে প্রতিরোধ। মাওবাদীদের না হটাতে পারলে খনির ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব নয় কম্পানিগুলোর। এ কারণে সরকারের মদদে সেখানে শুরু হয়েছে সালামা জুডুম নামের মাওবাদবিরোধী সশস্ত্র সন্ত্রাস। মাওবাদীদের দমন করতে সরকার এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ জন্য নূ্যনতম আইন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোকে তারা পরোয়া করছে না।
কিন্তু কিষেনজির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র যতই উল্লাস প্রকাশ করুক, তাতে ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের সরাসরি সমর্থন ও অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এ আন্দোলন দমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। হয়তো আরো অনেক বড় মাওবাদী নেতা গ্রেপ্তার হবেন, হত্যার শিকারও হতে পারেন, কিন্তু বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিপীড়িত মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে যে সংগ্রাম_নেতা হত্যা করে তা সাময়িকভাবে ঠেকিয়ে হয়তো রাখা যাবে, কিন্তু ধ্বংস করা কঠিন। কারণ এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, ভারতের যে বিপুল না খাওয়া মানুষ, শিল্প, কৃষি ও জাতীয় সম্পদের ওপর যে বহুজাতিক কম্পানির আগ্রাসন_তা ভারতের শাসকশ্রেণী সমাধান করতে পারবে না। এ কারণে বিদ্রোহের জ্বালানি খোদ শাসকশ্রেণীই সরবরাহ করবে আরো দীর্ঘকাল।
কিষেনজি ২০০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (সেজ) গড়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন। ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের লালগড়ে গড়ে তোলেন আন্দোলন। ২০০৮ সালে তখনকার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে শালবনির সড়কে মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যার পরিকল্পনার পেছনে ছিলেন এই কিষেনজিই।
স.ধৎরভুঁুধসধহ০১_মসধরষ.পড়স

No comments

Powered by Blogger.