ধান ভানতে শিবের গীত গাইলেন যোগাযোগমন্ত্রী by মশিউল আলম

কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড যদি বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, তবে তা পেশাদারি সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। এ সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া—সমস্ত কিছুই সংবাদমূল্য বহন করে। ৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘৬১ ভাগ সড়কই নাজুক’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি ছিল তেমনই সংবাদমূল্যবাহী একটি সাংবাদিকী রচনা। একই দিনের প্রথম আলোর ১৪ ও ১৫ পৃষ্ঠায় সারা দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার দুর্দশা সম্পর্কে যেসব সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, সেগুলোও সমানভাবে সংবাদমূল্যবাহী এবং প্রথম পাতার প্রধান প্রতিবেদনটির পরিপূরক।
যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রথম পাতায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটির প্রতিবাদ পাঠিয়েছেন। প্রথম আলোর সম্পাদককে সম্বোধন করে লেখা মন্ত্রীর দীর্ঘ প্রতিবাদপত্রের বক্তব্য সংবাদ আকারে গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়েছে ৭ ফেব্রুয়ারির প্রথম আলোর প্রথম পাতায়, সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক ও কার্টুনিস্টের বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। মন্ত্রীর মূল চিঠিটি অনেক দীর্ঘ, দেড় হাজার শব্দেরও বেশি। সেই চিঠিটির ভিত্তিতে পেশাদারি সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।
সারা পৃথিবীতেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ করার প্রচলন আছে। সাধারণত প্রতিবাদ করা হয় প্রকাশিত সংবাদের কোনো তথ্য-উপাত্ত ভুল, ভিত্তিহীন, মিথ্যা বা বানোয়াট হলে। প্রতিবাদকারী তথ্যপ্রমাণসহ দেখিয়ে দেন প্রকাশিত কোন তথ্য-উপাত্তগুলো ভুল বা ভিত্তিহীন। যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন তাঁর প্রতিবাদপত্রের শুরুর দিকে লিখেছেন: ‘প্রথম আলোতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কে একটি কার্টুন, খবর ও রাস্তার ছবি দেখে আমি হতবাক হয়েছি। বিস্মিত হয়েছি।’
কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় তাঁর দীর্ঘ পত্রের কোথাও উল্লেখ করেননি প্রকাশিত প্রতিবেদনের কোন সংবাদ ‘ভিত্তিহীন’। ভাঙাচোরা, চলাচলের অযোগ্য রাস্তার ছবি দেখে তিনি কেন হতবাক হয়েছেন, তা বোঝা কঠিন। ছবিগুলোও কি ভিত্তিহীন? নাকি দেশের রাস্তাঘাটের দুর্দশা কখনো তাঁর নজরে পড়েনি, তাই প্রথম আলোয় প্রকাশিত ছবি দেখে তিনি হতবাক হয়ে গেছেন এই ভেবে যে তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়কগুলোর এহেন দুর্দশা কী করে হলো? ‘হতবাক’ বা ‘বিস্মিত’ হয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ করার চল সভ্য দুনিয়ায় আছে বলে শুনিনি, প্রতিবাদ করা হয় ভিত্তিহীন বা ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে। কিন্তু মন্ত্রী প্রথম আলোয় প্রকাশিত কোনো তথ্যেরই ভিত্তিহীনতা চিহ্নিত করেননি।
মন্ত্রী তাঁর চিঠিতে আরও লিখেছেন, ‘...প্রথম আলোতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কে ভিত্তিহীন কার্টুন ও সংবাদ অন্যান্য পাঠকের ন্যায় আমাকেও উদ্বিগ্ন করেছে। দেশের একটি লিড পত্রিকা কীভাবে এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করে—বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে।’
ওই প্রতিবেদন কোনো পাঠককে উদ্বিগ্ন করেছে কি না, তা জানা যায়নি। মন্ত্রীকে উদ্বিগ্ন করেছে এটা জানা গেল। কিন্তু তাঁর উদ্বেগের কারণ, তাঁকে ভাবিয়ে তোলার কারণ যদি এই হয় যে প্রথম আলোর মতো ‘লিড পত্রিকা’ তা প্রকাশ করেছে, তবে তাঁর উদ্বেগ ও ভাবনা অমূলক। সব দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমেরই এমন জনগুরুত্বসম্পন্ন তথ্য প্রকাশ করা কর্তব্য। দেশের মোট ৯০ হাজার ২১০ কিলোমিটার পাকা সড়কের মধ্যে ৫৫ হাজার কিলোমিটার, অর্থাৎ ৬১ শতাংশই যদি নাজুক হয়ে পড়ে, যদি তিন হাজার কিলোমিটার সড়কের এমনই দুরবস্থা হয় যে সেগুলো আবার নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে, তা হলে দেশজুড়ে জনজীবনে সীমাহীন দুর্ভোগ দেখা দেয়। দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কর্তব্য সেই জনদুর্ভোগের চিত্র যতটা বিশদভাবে সম্ভব জনসমক্ষে তুলে ধরা। প্রথম আলো সেই কাজটিই করার চেষ্টা করেছে। প্রধান প্রতিবেদনটিতে যেসব তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর উৎ স সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সওজ যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন, এর নেতৃত্বে আছেন মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। মন্ত্রী মহোদয়ের যদি তাঁর নিজের মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়কগুলোর দুর্দশার সম্পূর্ণ চিত্র জানা না থাকে, তবে প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি তাঁর জন্য কিছুটা সহায়ক হতে পারে।
যোগাযোগমন্ত্রী আরও লিখেছেন, ‘...সব খারাপ রাস্তার জন্য শুধু যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ওপর দোষ চাপানো সমীচীন নয়।’ কিন্তু তিনি হয়তো লক্ষ করেননি, প্রকাশিত প্রতিবেদনের কোথাও শুধু যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ওপর দোষ চাপানো হয়নি। বস্তুত, দোষ চাপানোর কোনো ব্যাপারই ওই প্রতিবেদনে ছিল না। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন সওজ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন এলজিইডি ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের সড়কগুলো সম্পর্কে ওই সব কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তই প্রকাশ করা হয়েছে। স্বয়ং যোগাযোগমন্ত্রীর উদ্ধৃতিও প্রতিবেদনের শিরোনামের নিচেই বড় বড় হরফে ছাপা হয়েছে: ‘আমার এলাকার রাস্তাও খারাপ। আমরা পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাইনি। তবে ছয় মাসের মধ্যে সব রাস্তা মেরামত হয়ে যাবে।’ অর্থাৎ , যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে দোষারোপ করা নয়, তার সীমাবদ্ধতার কথাও মন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেই তুলে ধরা হয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে লক্ষ করা গেল, ৭ ফেব্রুয়ারি সোমবার জাতীয় সংসদে যোগাযোগমন্ত্রী সম্পর্কে সাংসদ রাশেদ খান মেননের সমালোচনামূলক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মন্ত্রীর সমালোচনা করবেন, এটা সাংবিধানিক অধিকার, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পত্রিকাগুলো যখন মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন করে, তখন এর প্রতিকার কী হবে?’ কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেননি, কোন পত্রিকা কী মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন করেছে। এতে সংবাদমাধ্যমের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে, কিন্তু সে ক্ষোভের ভিত্তি কী তা স্পষ্ট করা হয়নি। প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদাধিকারী ব্যক্তির কণ্ঠে যখন সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে এ রকম ঢালাও অভিযোগ উচ্চারিত হয়, তখন অধস্তন ক্ষমতাধরেরা সংবাদমাধ্যমের প্রতি অন্যায্যভাবে বিষোদগার করতে উৎ সাহিত হতে পারেন। তাতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সরকারের আন্তরিক অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সরকারের দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডে ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য-উপাত্তনির্ভর প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিরূপ প্রতিক্রিয়া করে। ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কেউ কেউ ক্রুদ্ধ হন, সংবাদমাধ্যমকে অন্যায্যভাবে দোষারোপ করার চেষ্টা করেন। এতে গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন ঘটে না। যোগাযোগমন্ত্রী লক্ষ করে দেখবেন, তাঁর মন্ত্রণালয় ও স্বয়ং তাঁর কর্মসম্পাদনের সমালোচনা উচ্চারিত হচ্ছে খোদ জাতীয় সংসদেই। সরকারি দলের এক সাংসদ গত রোববার সংসদে বলেছেন, ‘যোগাযোগমন্ত্রী আশ্বাস দেন, কিন্তু তাতে কাজ হয় না।’ একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বলেছেন, ‘যোগাযোগমন্ত্রী চমৎ কার উত্তর দেন, কিন্তু কাজ শুরু হয় না।’ পরদিন রোববারও বেশ কয়েকজন সাংসদ যোগাযোগমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন; সংবাদমাধ্যমের প্রতি তাঁর বিষোদগারের সমালোচনা করেছেন সাংসদ রাশেদ খান মেনন, সরকারি দলের সাংসদেরা টেবিল চাপড়ে মেননের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন।
যোগাযোগমন্ত্রী নিশ্চয়ই জানেন, সাতটি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎ পাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল আগামী মার্চ থেকে। কিন্তু তা হতে পারছে না, কারণ ওই সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহের জন্য রেললাইন স্থাপন, লোকোমোটিভ ও ওয়াগন সংগ্রহের কাজ যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পন্ন করতে পারেনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়নে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এই ব্যর্থতার ফলে নতুন সাতটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎ পাদন শুরু পিছিয়ে যাচ্ছে। যোগাযোগমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কথা তুলেছেন, কিন্তু তাঁর নিজের মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার ফলে যে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কাজও ব্যাহত হচ্ছে, তার জবাব কী?
প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনের লেখক তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন, যোগাযোগমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সংবাদপত্রে রিপোর্টিংয়ের সাধারণ সনাতনী রীতি মেনে তিনি নিজের মন্তব্য, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। এখন যোগাযোগমন্ত্রীর প্রতিবাদপত্রের সুবাদে সেই প্রতিবেদনটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করে দেখি, তাহলে মোটা দাগে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠবে—যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সড়ক সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে অর্ধেক বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মানে, সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখার জন্য সেগুলোর সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ যে একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়, এই খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা যে সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—মন্ত্রী এটা সরকারকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন, অথবা সে চেষ্টা করেননি। তিনি তাঁর চিঠিতে পদ্মা সেতু ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে—এই দুটি বৃহৎ বাজেটসহ আরও কতকগুলো বড় প্রকল্পের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন; এসবের পেছনে তাঁকে হয়তো প্রচুর সময় ও শ্রম দিতে হচ্ছে। কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখার জন্য বিদ্যমান সড়কব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কোনোভাবেই গৌণ বিষয় নয়, যা নিয়ে অবহেলা করা যায়।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ছবিগুলো, সম্পাদকীয় নিবন্ধ, যোগাযোগমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের বক্তব্য এবং এই লেখা যদি দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার করুণ দুর্দশা এবং সে কারণে জনজীবনে ব্যাপক দুর্ভোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের চিত্র তুলে ধরতে পারে এবং যোগাযোগমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারক মহল বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিকারের উদ্যোগ নেন, তাহলে দেশবাসী, সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী—সবারই মঙ্গল হবে।
মশিউল আলম: সাংবাদিক
mashiul.alam@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.