সম্রাট শাজাহানের ঢাকা দর্শন by শরিফুজ্জামান শরিফ

রেখে যাওয়া তল্লাট নিয়ে গত কয়েক বছর যেসব নেতিবাচক কথাবার্তা হচ্ছে তার সত্যতা যাচাই করতে পিতা জাহাঙ্গীরের নির্দেশে সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসেছিলেন সম্রাট শাজাহান। নানা ব্যস্ততার কারণে ঈদের ছুটির সময়টা বেছে নেন। সফর শেষে ফিরে গিয়ে পিতার হাতে একটি প্রতিবেদন তুলে দেন।


সেখানে লিখেছেন, 'আমি ২০ আগস্ট ঈদের দিন সকাল ৯টায় গাবতলী বাস টার্মিনালে নেমেই তাজ্জব। এতদিন শহরে প্রবেশের এই পথটি সম্পর্কে যা শুনেছি দেখলাম তার পুরোটাই মিথ্যা। এখানে কয়েকটা পাবলিক বাস দেখলাম সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। চালকদের ব্যবহারে মনে হলো আমি তাদের পরিবারের কেউ। একটা বাসে উঠে বসলাম, চালক আমার বাক্স-পেটরা নিজেই তুলে নিল। গাবতলী থেকে ৭ মিনিটে মতিঝিল। আমাদের সময়কার মতির ঝিল ভরাট করে ওরা বিরাট শহর গড়ে তুলেছে। তবে লোকসংখ্যা খুবই কম। রাস্তাগুলো পরিষ্কার_ প্রায় জনশূন্য। দু'চারটা রিকশা, প্রচুর ব্যক্তিগত গাড়ি চোখে পড়ল। দেখলাম সারিবদ্ধভাবে কিছু পাবলিক বাস চলছে।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে অটোরিকশার চালকরা দল বেঁধে বসে। যাত্রী দেখলেই 'আসেন ভাই, আসেন ভাই' বলে ডাকছে। যাত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে আসছে। বিস্তৃত-পরিচ্ছন্ন ফুটপাত। কিছু এলাকা দিয়ে দিনে হাঁটলেও গা ছমছম করে। কোনো কোলাহল নেই_ মাঝে মধ্যে পাখির ডাক শোনা যায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব কড়া। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশের তল্লাশি।
কথা বলে জানলাম, রাস্তায় যে গাড়ি চলছে তার চালকরা খুব করিতকর্মা। তারা গাড়ি চালানোর সনদপত্রের জন্য রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে না_ নিজেরাই সনদপত্র বানিয়ে নেয়। শুনলাম, দুই ধরনের উজির আছে_ উজিরে খাস ও সাধারণ উজির। উজিরে খাস_ তারা উঁচুমানের উজির। প্রজাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কম। তারা কেবল রাজা-রানীকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সাধারণ উজিররা প্রজাদের কখন বাজারে যেতে হবে, কখন খেতে হবে, কতটুকু খেতে হবে, কোন প্রাণী থেকে কতটুকু দূরত্ব রেখে চলতে হবে তাও বলে দেয়। প্রজারা তা খুব মেনে চলে। দেখলাম বাজারগুলোতে ব্যবসায়ীরা পণ্য সাজিয়ে বসে আছে, কিন্তু প্রজারা তা কিনতে যায় না। কারণ উজিররা বলে দিয়েছে, কম খাবা_ বাজারে কম যাবা। দোকানে দেখলাম প্রচুর দেশি-বিদেশি ফল-মাছ-মাংস-সবজি। এগুলোর বিক্রেতারা নাকি মিসর থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের দোকানের এসব পণ্য মাসের পর মাস রাস্তায় ফেলে রাখলেও নাকি পচে না! মাছ-মাংসের মমি আর কি! শহরে পানি, বিদ্যুতের সমস্যা নেই।
শুনলাম, প্রভাবশালীরা অপচয় একদম পছন্দ করেন না। সে জন্য তারা শহরের খাল, লেক বা পাশের নদীর জায়গা ফেলে না রেখে সেগুলো ভরাট করে বড় বড় ভবন বানিয়েছে। মানুষগুলো খুব শান্তিপ্রিয়। বাজারের জিনিসপত্রের দাম নির্ধারণের বিষয়ে রাজরানীরা নাক গলান না। এটা ব্যবসায়ীদের মর্জির ওপর ছেড়ে দেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সব বন্ধ, কারণ সবাই লেখাপড়া শেখা শেষ করে ফেলেছে। শুনলাম, শহরে খেলার মাঠ বা পার্কের চেয়ে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বেশি। তবে তার সংখ্যা কত তা কেউ কেউ গুনে বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি। দু'দিন টিভি দেখলাম বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে প্রচারিত বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলো ভালোই লাগল।
এই কয়দিনে দেশের কোনো দৈনিক পত্রিকা পড়ার আমার সুযোগ হয়নি। কারণ সব পত্রিকার অফিস বন্ধ। শুনলাম এখানে বছরে দুই ঈদে তারা কয়েকদিনের জন্য পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ রাখেন। পৃথিবীর অন্য কোথাও এই ঘটনা ঘটে বলে আমার জানা নেই। শুনলাম, বর্তমান রানী-উজিরদের কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত সাবেক রানী-উজিররা মানতে চান না, বিরোধিতা করেন। তবে বর্তমানের একজন আধা-উজিরের নেতৃত্বে যে চাঁদ দর্শন কমিটি রয়েছে সে কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে সাবেক রানী বা সাবেক উজিররা কোনো প্রশ্ন তোলে না। কায়মনে মেনে নেন।
এক ফাঁকে তাদের হাসপাতালগুলো দেখতে গিয়েছিলাম। দেখলাম, ডাক্তারের সংখ্যা কম_ স্বাস্থ্য উজিরের নির্দেশ অমান্য করে অনেক ডাক্তার বাড়ি চলে গেছেন_ কী করবে বসে থেকে? এখানের মানুষের কোনো অসুখই হয় না।
দেখলাম, দিনের বেলায়ও শহরের অনেক রাস্তায় লাইটপোস্টের বাতি জ্বলছে। দিনের বেলা সড়কে আলো কেন? এক প্রজা বললেন, এখানে যখন যারা রাজা-রানী ও উজির হন তখন তাদের চোখের সমস্যা নাকি বাড়ে, কোনো কিছুই ভালোভাবে দেখতে পারেন না, সঙ্গে তাদের কানেরও সমস্যা দেখা দেয়!'

শরিফুজ্জামান শরিফ :সাবেক ছাত্রনেতা; সাধারণ সম্পাদক নাগরিক সংহতি
 

No comments

Powered by Blogger.