তেজগাঁও-শিল্পাঞ্চল থেকে বাণিজ্যিক অঞ্চল by পান্না লাল দত্ত

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলকে বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। যেমন- ১. বর্তমানে লিংক রোডসংলগ্ন পল্গটগুলো বাণিজ্যিকীকরণ চলছে তা সম্পূর্ণকরণ; ২. দ্বিতীয় ধাপে লিংক রোডের সঙ্গে সংযুক্ত প্রশস্ত রাস্তাসংলগ্ন পল্গটগুলো বাণিজ্যিকীকরণ


ঢাকা শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমলে ঢাকা শহরের উত্তর প্রান্তের শেষ সীমায় অবস্থিত ছিল। তৎকালীন কর্তৃপক্ষ এ অঞ্চলকে শিল্পাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে শিল্প স্থাপনে উদ্যোগী হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪১ বছর অতিক্রান্ত, জনসংখ্যা ও বাসস্থানের সংকট বৃদ্ধির কারণে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। নিকেতন-গুলশান-বারিধারা-বনানীসহ ডিওএইচএসে অসংখ্য আবাসিক ভবন গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বহু অধিবাসী এ অঞ্চলে বসবাস করছেন। সরকার ইতিমধ্যেই তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডসংলগ্ন পল্গটগুলো বাণিজ্যিকীকরণের আওতায় এনে বহু পল্গট ইতিমধ্যে বাণিজ্যিকীকরণ করেছে এবং লিংক রোডসংলগ্ন আরও কিছু এলাকা বাণিজ্যিকীকরণের আওতায় নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। জনস্বার্থেই পুরো তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল অনতিবিলম্বে বাণিজ্যিক অঞ্চলে রূপান্তর হওয়া যে বিশেষভাবে প্রয়োজন, তা একবাক্যে সবাই স্বীকার করবেন। কারণ শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন আবাসিক এলাকা বসবাসের জন্য অনুকূল হতে পারে না, কারণ_ ১. যে কোনো শিল্পই পরিবেশ দূষণে কমবেশি সহায়ক। ফলে নানা ধরনের রোগ-ব্যাধিতে বাসিন্দাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে; ২. শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে এ শিল্পাঞ্চল অবস্থিত হওয়ায় পরিবেশ দূষণ ব্যতীত বর্তমানে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হচ্ছে।
ক. শিল্পাঞ্চলের শিল্প বর্জ্য নিষ্কাশনের কোনো সুব্যবস্থা নেই। পরিকল্পিত ড্রেনেজ না থাকায় সহজে পানি নিষ্কাশন হতে পারে না। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। খ. বিদ্যুৎ স্বল্পতার কারণে সব কারখানাই দৈনিক বেশ কয়েক ঘণ্টা নিজস্ব জেনারেটর দ্বারা চালু রাখার কারণে শরীরের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হয় যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে শিশুদের। গ. শিল্পাঞ্চলে কাঁচামাল আনা ও প্রস্তুতকৃত মালপত্র বহির্গমনের জন্য দিনরাত কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ট্রাক শিল্পাঞ্চলে যাতায়াত করে, যা ঢাকা শহরের বর্তমান ট্রাফিক ব্যবস্থা বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। ঘ. প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের কারণে শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন আবাসিক এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই রান্নার গ্যাস স্বল্পতার সৃষ্টি হচ্ছে। ঙ. বর্তমানে ঢাকা শহরে সব ধরনের বাসা ভাড়া বৃদ্ধির কারণে স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য, বিশেষ করে এ শিল্পাঞ্চলে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীসহ শ্রমিকরা বসবাসে বিভিন্ন সমস্যায় পতিত হচ্ছেন। ফলে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকিস্বরূপ।
এ শিল্পাঞ্চল বাণিজ্যিক অঞ্চলে রূপান্তর হলে তাৎক্ষণিকভাবে নিম্নরূপ সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে। ১. সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে; ২. ট্রাফিক জ্যাম শিথিল হবে; ৩. গুলশান-বারিধারা-বনানী-নিকেতন-ডিওএইচএস-ধানমণ্ডিসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় অনুনমোদিতভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য ভাড়া দেওয়া অফিস ও অন্য যেসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলো সবই এ বাণিজ্যিক এলাকায় স্থানান্তরিত হবে। ফলে সংশ্লিষ্ট আবাসিক এলাকাগুলো ট্রাফিক জ্যাম হতে পরিত্রাণ পেয়ে আবাসিক এলাকায় রূপ লাভ করবে এবং বসবাসকারী জনগণের নিরাপত্তা অধিকতর নিশ্চিত হবে; ৪. ঢাকা শহরে বসবাসরত অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা গুলশান-বারিধারা-বনানী-নিকেতন-ডিওএইচএস ও ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন। সে কারণে মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় যেতে-আসতে প্রতিদিনই প্রায় ৪ ঘণ্টা কর্মসময় তাদের নষ্ট হয় এবং সে সঙ্গে ট্রাফিক জ্যামের কারণে সাধারণ মানুষরা ভোগান্তির শিকার হন, যা অনেকটা নিরসন হবে এবং কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানিকৃত গাড়ির অপচয় ও জ্বালানি তেল সাশ্রয়ে জাতীয় অর্থনীতি বেগবান হবে; ৫. ঢাকা শহরের সৌন্দর্য বর্ধনে বিশেষ অবদান রাখবে। কারণ, সংলগ্ন এলাকায় হাজার হাজার কোটি টাকা খরচে হাতিরঝিল নামে দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প সমাপ্ত হতে চলেছে। তার পাশের যে কোনো ধরনের শিল্পাঞ্চল বেমানান। বাণিজ্যিকীকরণ হলে আধুনিক স্থাপত্যে সহসাই এ অঞ্চল উন্নীত হবে এবং আধুনিক গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থাসহ নতুন ইমারত নির্মাণে এ অঞ্চলের শোভা বৃদ্ধি পাবে; ৬. সরকারের বিকেন্দ্রীকরণের নীতিও বিশেষভাবে কার্যকর হবে। বিদেশিসহ দেশি উদ্যোক্তারা বহুদিন ধরেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত একটি বাণিজ্যিক এলাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলকে বাণিজ্যিক অঞ্চলে রূপান্তরের মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণসহ ঢাকা শহর আন্তর্জাতিক মানের শহরে পরিণত হবে। বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তরের ফলে সরকারের মোটা অঙ্কের অর্থ আয় হবে, যা সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে সরকার ব্যয় করতে পারবে।
এ অঞ্চলে স্বল্প প্রস্থবিশিষ্ট যেসব রাস্তা আছে, সেসব রাস্তার প্রতি পাশে ১০ ফুট বৃদ্ধি করে সরকার এ শিল্পাঞ্চলকে আধুনিক বাণিজ্যিক অঞ্চলে রূপান্তর করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়সহ অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সমর্থ হবে। বিমানবন্দর তেজগাঁওর নিকট দূরত্বে হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা বাড়তি সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আইটি এবং কলসেন্টার ব্যবসায় বিনিয়োগে উদ্যোগী হবে যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
পাশের দেশ ভারত আইটি ও কলসেন্টার উন্নয়নে বেশ কিছু বিশেষ শহরের কেন্দ্রস্থলে আইটি সহায়ক অবকাঠামো সৃষ্টি করে বিদেশিদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলকে বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। যেমন_ ১. বর্তমানে লিংক রোডসংলগ্ন পল্গটগুলো বাণিজ্যিকীকরণ চলছে তা সম্পূর্ণকরণ; ২, দ্বিতীয় ধাপে লিংক রোডের সঙ্গে সংযুক্ত প্রশস্ত রাস্তাসংলগ্ন পল্গটগুলো বাণিজ্যিকীকরণ; ৩. পরে স্বল্প প্রশস্ত রাস্তাগুলো প্রশস্তকরণের পর বাণিজ্যিকীকরণের অনুমতি প্রদান।
অতএব, সর্বপ্রথম প্রয়োজন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ক্রমান্বয়ে তার বাস্তবায়ন। আশা রাখি, সরকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলকে অনতিবিলম্বে বাণিজ্যিক অঞ্চলে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেবে। এ সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী জনগণের নিরাপত্তাসহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ঢাকা শহরের সৌন্দর্য বর্ধনে অবদান রাখবে।

পান্না লাল দত্ত : প্রাক্তন অধ্যাপক
নটর ডেম কলেজ
pannalaldutta@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.